প্রবীণ নিবাস: জীবন সায়াহ্নে কারো আশ্রয়, কারো স্বাধীনতা
“একটা জায়গায় আমরা কয়েকজন একসঙ্গে থাকি। আমাদের আর কেউ আছে? আমরাই তো একে অন্যের পরিবার। একে অন্যের খোঁজখবর রাখব না তো কার রাখব?”
“আমার আর যাওয়ার জায়গা নেই, কোথায় যাব? নিজের তো কোনো ঘরবাড়ি নেই। এটাই এখন আমার ঠিকানা। বুঝতে পারিনি শেষ বয়সে এসে যাওয়ার জায়গা থাকবে না। যদি জানতাম, হয়তো কিছু টাকা জমিয়ে রাখতাম। জীবনে যাদের একসময় বুকে আগলে রেখেছিলাম, তারা এখন আর খোঁজখবর রাখে না।”
চোখ মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন ৭০ বছর বয়সী নাদিরা বেগম। প্রায় ১১ বছর ধরে পরিবারের বাইরে তার ঠিকানা ঢাকার আগারগাঁওয়ের প্রবীণ নিবাস।
অনুমতি নিয়ে তার কক্ষে ঢুকতেই পাশে রাখা কেটে রাখা পাকা পেঁপে এগিয়ে দিলেন খাওয়ার জন্য। এরপর নিজেই বলতে শুরু করলেন জীবনের পাওয়া-না পাওয়ার গল্প।
বিয়ের ১০ বছর পর স্বামী সন্তানদের নিয়ে আলাদা হয়ে যান নাদিরা। প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর সন্তানদের থেকেও আলাদা হয়ে যান।
সে সময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে আবার বিয়ে করেন। তবে দ্বিতীয় স্বামী মারা যাওয়ার পর সেই ঘরেও তার আর ঠাঁই হয়নি।
“আমার ডিভোর্স হওয়ার পর আমি অনেকটা অস্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিলাম। আমার বাবা আমাকে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করেছেন। এর পর আবার এক ডাক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। উনি মারা যাওয়ার পর সেই ঘরের সন্তানেরা আমাকে আর ঘরে রাখতে চায়নি।”
এরপর বড় ভাইয়ের কাছে আশ্রয় নেন নাদিরা। সেখানেও অবহেলার মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত একা থাকার সিদ্ধান্ত নেন। কিছুদিন অন্য একটি নিবাসে থাকার পর পরিচিত এক বড় আপার মাধ্যমে খবর পেয়ে ২০১৫ সালে বর্তমান প্রবীণ নিবাসে আসেন তিনি।
“ঝগড়াঝাঁটি করে পরিবারে থাকার চেয়ে একা থাকাই ভালো। কী দরকার কারও সঙ্গে মনোমালিন্য করে থাকার? এর চেয়ে আলাদা থেকে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখা ভালো।”
দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন নাদিরা। পাশাপাশি সামাজিক কাজেও যুক্ত ছিলেন। কাউকে বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন, হাতের কাজ শিখিয়েছেন, এমনকি তাদের জন্য সেলাই মেশিনও কিনে দিয়েছেন বলে জানালেন।
তবে যাদের জন্য এত কিছু করেছেন, তাদের অনেকেই এখন আর তাকে মনে রাখেন না। কেউ কেউ দেখা করতে এলেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সেই যোগাযোগ অনেকটাই কমে গেছে।
পরিবার থাকলে ভালো লাগত কি না—এমন প্রশ্নে নাদিরার উত্তর, “ভাবলেই কি সব হয়? যা পাইনি তা নিয়ে আর ভাবি না। তবে পুরোনো কথা মনে পড়লে খুব কষ্ট হয়। তাই পুরোনো কথা ভাবতে চাই না।”
বয়সের কারণে এখন ঠিকমতো হাঁটাচলাও করতে পারেন না নাদিরা। তিনি জানালেন, সপ্তাহে একদিন চিকিৎসকেরা এসে তাদের দেখে যান।
যৌথ পরিবার ভেঙে পড়ছে, প্রবীণরা একা হচ্ছেন
প্রবীণদের জীবনযাত্রার এই পরিবর্তনকে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ এস এম আতিকুর রহমান।
তিনি বলেন, আগের মত এখন আর যৌথ পরিবার দেখা যায় না। সন্তানদের অনেকেই বড় হয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ফলে পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও অনেক প্রবীণ শেষ বয়সে একা হয়ে পড়ছেন। শেষ বয়সে থাকবার যায়গা খুঁজে না পেয়ে আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন প্রবীণ নিবাস।
“আগেকার মত এখন আর যৌথ পরিবার দেখা যায় না, যেখানে ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে প্রবীণরা বসবাস করতে পারেন। প্রবীণরা একা হয়ে পড়েছেন, এটি একটি বড় রকমের সমস্যা। স্বচ্ছল পরিবারেই এই সমস্যা রয়েছে, দরিদ্র পরিবারে এই সমস্যা হয় না।”
এই বিশেষজ্ঞের ভাষ্য, “অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছল পরিবারের প্রবীণদের এ পরিস্থিতির জন্য তারা নিজেরাও দায়ী। কারণ তিনি যখন সক্ষম ছিলেন, নিজের বার্ধক্যের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করে রাখার কথা তিনি মাথায় রাখেননি।”
প্রবীণদের সমস্যার কথা তুলে ধরে আতিকুর রহমান বলেন, দুই ধরনের প্রবীণরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
“প্রথমত, যাদের বয়স ৮০ বছর বা তার বেশি, এমন প্রবীণরা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছেন। কারণ এদের জন্য পরিবারে কিংবা হাসপাতালে কোথাও তেমন ব্যবস্থা নেই। এদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
“দ্বিতীয়ত, যারা প্রবীণ নারী, তারাও বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছেন। বার্ধক্যে পুরুষের চেয়ে প্রবীণ নারীদের বিশেষ সুবিধা প্রয়োজন হয়।”
প্রবীণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালের জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন অধ্যাপক আতিকুর রহমান।
স্বাধীনতার জন্যও প্রবীণ নিবাস
প্রবীণ নিবাসে থাকা সবার গল্প অবশ্য নাদিরার মতো নয়। অবসরপ্রাপ্ত ৬৮ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা মো. গোলাম রব্বানী এখানে এসেছেন নিজের ইচ্ছায়।
প্রবীণ নিবাসের কক্ষে খাওয়াদাওয়া সেরে টেবিলের সামনে বসেছিলেন তিনি। সামনে একটি পত্রিকা। কক্ষে বিছানা, বইয়ের তাক, টেবিল ও প্রয়োজনীয় আসবাব আছে। পাশাপাশি তার ঘরে রয়েছে একটি বারান্দা।
হাসিমুখে রব্বানী জানালেন, অসহায় হয়ে নয়, বরং স্বাধীনভাবে জীবন কাটাতেই প্রবীণ নিবাসকে বেছে নিয়েছেন তিনি।
“মেয়েদের কাছে গিয়ে দীর্ঘদিন নির্ভরশীল হয়ে থাকতে চাইনি। নিজের মত করে, স্বাচ্ছন্দ্যে এবং কারও ওপর নির্ভর না করে বাকি জীবনটা কাটাতে চেয়েছি। প্রবীণ নিবাসে এসেছি অসহায় বলে নয়। এখানে নিজের খরচ নিজেই বহন করি, নিজের মত থাকি এবং সমমনা মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাই, তাই এসেছি।”
এক কলেজবান্ধবীর কাছ থেকে এই প্রবীণ নিবাসের কথা জানতে পারেন রব্বানী। পরে প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন, খরচ ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি তিনি এখানে ওঠেন।
প্রথমে তার মেয়েরা সিদ্ধান্তটি সহজভাবে নিতে পারেননি। কেন তিনি তাদের সঙ্গে না থেকে প্রবীণ নিবাসে থাকতে চান, সে প্রশ্নও করেছিলেন তারা।
রব্বানী তাদের বোঝান, প্রবীণ নিবাস শুধু অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থল নয়। সন্তান বিদেশে থাকা, স্বামী বা স্ত্রী মারা যাওয়া কিংবা নিজের মত করে থাকার ইচ্ছা থেকেও কেউ এখানে আসতে পারেন।
মেয়েদের সঙ্গে এখনও তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তবে তাদের সংসারে স্থায়ীভাবে থাকার ইচ্ছা নেই।
“আমি তাদের বলেছি, আমার যখন খারাপ লাগবে, তখন আমি তাদের কাছে যাব। তাদেরও যদি আমাকে দেখতে ইচ্ছা হয়, তারাও আসতে পারে। তবে আমি চাই না, তারা নিয়মিত এখানে এসে আমার প্রতি অতিরিক্ত মায়া তৈরি করুক। কারণ শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের সংসার আছে, নিজেদের জীবন আছে।”
নতুন বন্ধুত্ব, আছে হারানোর বেদনাও
প্রবীণ নিবাসে নতুন বন্ধু পেয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে রব্বানী তার মোবাইল ফোনে একটি ছবি খুঁজতে শুরু করেন। ছবিটি দেখিয়ে জানান, মানুষটি তার বন্ধু ছিলেন। কিছুদিন আগে মারা গেছেন।
রব্বানীর ভাষ্য, ওই ব্যক্তি সমাজসেবা অধিদপ্তরে চাকরি করতেন। তার দুই সন্তানের একজন কানাডায় এবং অন্যজন যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন। ঢাকায় নিজেদের বাসাও ছিল। তবু সমবয়সীদের সঙ্গে সময় কাটাতে তিনি এই প্রবীণ নিবাসে উঠেছিলেন।
বন্ধুর কথা বলতে গিয়ে রব্বানীর কণ্ঠ কিছুটা ভারী হয়ে আসে।
প্রবীণ নিবাসের আরেক বাসিন্দা রফছন আরা বললেন অন্য কষ্টের কথা।
“তিন জন মরেছে, কয়েক মাস আগে মারা গেছেন এক আপা। খুবই কষ্ট পেয়েছি। উনার দুই সন্তানই বিদেশে থাকেন। তাই দেশে তিনি এই প্রবীণ নিবাসেই থাকতেন। আমি কতবার করে বললাম একটা শোকবার্তা লেখেন, লেখেনি। আগে ছবিসহ শোকবার্তা টানানো হত, এখন আর টানায় না।”
‘আমরাই তো একে অন্যের পরিবার’
পাশের একটি কক্ষে থাকেন ৮৬ বছর বয়সী এক নারী। দায়িত্বে থাকা সেবিকা জানান, তিনি একজন বীরাঙ্গনা।
দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। সেবিকার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২ বছর ধরে তিনি এই নিবাসে আছেন। এখানে সবাই তাকে চন্দনা শতাদ্রী নামে চেনেন।
পাশের কক্ষে থাকেন ৭০ বছর বয়সী মনোয়ারা। দেখা হওয়ার সময় কয়েকটি প্লাস্টিকের বক্স ধোয়ার জন্য বের হচ্ছিলেন তিনি। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে নিজে থেকেই কথা বলতে শুরু করলেন।
“আমরা পৃথিবীর বাইরের কেউ না, আর দশটা মানুষ যেভাবে জীবনযাপন করে আমরাও ঠিক সেভাবেই করি। বিশেষ কিছু নেই, আমরা এখানে ভালোই আছি। কোনো প্রকার পরাধীনতা নেই, নিজেরাই নিজেদের কাজ করি।”
কথা বলার মধ্যেই সেবিকা এসে জানালেন, চন্দনা খাবার খেতে চাইছেন না। মনোয়ারা তখন পাশের কক্ষে গিয়ে তাকে খাওয়ার জন্য বোঝাতে থাকেন।
চন্দনাকে তিনি বলেন, “ঠিক মত খাওয়াদাওয়া করেন, নাহলে সুস্থ হবেন কী করে।”
কক্ষের ভেতরে তখন টেবিলের সামনে বসে আছেন চন্দনা। পাশে বসে সেবিকা তাকে এক চামচ, দুই চামচ করে খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন।
প্রবীণ নিবাসের অন্য বাসিন্দাদের কথাতেও উঠে আসে একে অন্যের পাশে থাকার বিষয়টি।
রফছন আরা বলেন, “দেখুন, একটা জায়গায় আমরা কয়েকজন একসঙ্গে থাকি। আমাদের আর কেউ আছে? আমরাই তো একে অন্যের পরিবার। একে অন্যের খোঁজখবর রাখব না তো কার রাখব?”
আবাসন নিয়ে সন্তুষ্টি, আছে সীমাবদ্ধতাও
প্রবীণ নিবাসের জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানালেও কিছু অবকাঠামোগত সমস্যার কথা তুলে ধরেন রব্বানী।
তার ভাষ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোভাব সহযোগিতাপূর্ণ; তারা বাসিন্দাদের প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখেন। তবে প্রবীণদের বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনায় আবাসন ব্যবস্থায় আরও কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন।
বিশেষ করে ওয়াশরুমের দূরত্ব নিয়ে অসুবিধার কথা জানান রব্বানী। তিনি বলেন, চারজন প্রবীণের জন্য দুটি ওয়াশরুম থাকলেও সেগুলো তাদের থাকার জায়গা থেকে বেশ দূরে।
“একজন প্রবীণ মানুষের জন্য দূরে গিয়ে বাথরুম ব্যবহার করা অনেক সময় কষ্টকর হয়ে পড়ে। অসুস্থতা বা জরুরি প্রয়োজন হলে তো আরও সমস্যা হয়। তাই প্রবীণদের সুবিধা বিবেচনায় বাথরুমসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আরও কাছাকাছি ও সহজলভ্য হওয়া দরকার।”
আরেক বাসিন্দা স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিষ্ঠানের কিছু নিয়ম নিয়ে অসন্তোষের কথা বললেন। তার ভাষ্য, আগে প্রতিদিন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার কথা বলা হলেও এখন সপ্তাহে একদিন চিকিৎসকেরা আসেন।
“সেপ্টেম্বর মাসে একটা নীতিমালা তৈরি করেছে, কিন্তু একটি নীতিও আমাদের প্রবীণদের জন্য ছিল না। যত নিয়ম সব আমাদের মনে হয় আমাদের বিরুদ্ধে বানানো।”
কারা আসেন এই প্রবীণ নিবাসে
প্রবীণদের সেবা ও কল্যাণে ১৯৬০ সালে আগারগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (বাইগাম)। প্রবীণদের জন্য এই একটাই হাসপাতাল, সারাদেশে এর ৯২টি শাখা রয়েছে।
প্রবীণ নিবাসে সিট ভাড়া, খাবার খরচ ও নিরাপত্তা ব্যয় নির্বাহ করতে হয়। ফলে অবস্থাপন্ন বয়স্করাই সেখানে থাকতে পারেন, গরীব মানুষের সে সুযোগ হয় না।
বাইগামের মহাসচিব মো. ইন্তেজার রহমান জানান, বর্তমানে আগারগাঁওয়ের প্রবীণ নিবাসে ৩০ জন প্রবীণ বসবাস করছেন। আগে ছিলেন ৩২ জন; দুজন মারা গেছেন।
তার ভাষ্য, এখানে বসবাসকারীদের অনেকেই সচ্ছল ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সদস্য। তাদের সন্তানদের কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, আবার কেউ সেনাবাহিনী বা সরকারি প্রশাসনের উচ্চপদে কর্মরত।
“অনেকের সন্তান বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তারা বাবা-মাকে নিজেদের কাছে নিয়ে যেতে চাইলেও কেউ কেউ বিদেশের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না। ফলে দেশে থাকার জন্য প্রবীণ নিবাস বেছে নেন।”
আবার পারিবারিক অবহেলার কারণেও কেউ কেউ এখানে আসেন বলে জানান ইন্তেজার। তিনি বলেন, কোনো কোনো পরিবার প্রবীণ সদস্যকে ‘বোঝা’ মনে করে নিবাসে পাঠিয়ে দেয়।
ইন্তেজার রহমান বলেন, প্রবীণ নিবাসে বসবাসের জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে মাসে প্রায় ১১ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এর বাইরে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাসহ অন্যান্য খরচ নিজেদের বহন করতে হয়।
ফলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল প্রবীণদের পক্ষে এখানে থাকা যে কঠিন, সে কথা স্বীকার করেন মহাসচিব।
অসুস্থ হলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ সীমিত
প্রবীণ নিবাসে নিজের বড় ভাইকে ভর্তি করানোর জন্য তথ্য জানতে এসেছিলেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা মাজেদা শওকত।
৮০ বছর বয়সী ও অসুস্থ ব্যক্তির জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে, সেবিকার সুবিধা পাওয়া যাবে কি না এবং খরচ কত—এসব জানতে চান তিনি।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়, সাধারণত বেশি বয়সী বা অসুস্থ ব্যক্তিদের এখানে ভর্তি নেওয়া হয় না। ৫৫ বা ৬০ বছর বয়সী এবং মোটামুটি সুস্থ ব্যক্তিরাই মূলত ভর্তি হতে পারেন।
সেবিকার ব্যবস্থা রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে এখানে থাকা এবং পরে অসুস্থ হয়ে চলাফেরায় অক্ষম হয়ে পড়া বাসিন্দাদের জন্য। কেউ ব্যক্তিগত সেবিকা রাখতে চাইলে বিশেষ আবেদন করতে হয়।
ভাড়া সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে নতুন বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে মাসে প্রায় ৯ হাজার টাকা ভাড়া পড়ছে। আগে যারা এসেছেন, তারা তুলনামূলক কম ভাড়ায় থাকছেন।
এর কিছুক্ষণ পর অসুস্থতার কথা জানিয়ে আরেকজন প্রবীণ ভর্তি হতে চাইলে তাকে নিবাসে না নিয়ে প্রতিষ্ঠানের হাসপাতালে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অর্থাৎ প্রবীণ নিবাসে ভর্তি হতে গেলেই যোগ্যতা হিসেবে ব্যক্তিকে হতে হবে সুস্থসবল এবং নীতিমালা সাপেক্ষে পূরণ করতে হবে শর্ত, যেখানে রয়েছে থাকা-খাওয়াসহ ভর্তি ফি, উন্নয়ন ফি; সাথে বিভিন্ন নিয়ম ও নীতি। এসব মেনে নিলে তবেই প্রবীণ নিবাসের নিবাসী হওয়ার সুযোগ মেলে।
দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা
১ অক্টোবর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এ বছর এ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোকে নতুন করে ভাবা’।
জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে ১২০ কোটি থেকে বেড়ে ২১০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে, যা হবে তখনকার বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ।
বাংলাদেশে এখন প্রবীণের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। ষাটোর্ধ্ব বয়সী প্রবীণের হার জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ। ২০৫০ সাল নাগাদ প্রবীণের সংখ্যা চার কোটিতে পৌঁছাবে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ২০১৩ সালে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা করা হয়। পাশাপাশি বয়স্ক ভাতা কর্মসূচিও চালু রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতায় ৬১ লাখ উপকারভোগী জনপ্রতি মাসে ৬৫০ টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন।
প্রবীণ দিবস উপলক্ষে ৭ অক্টোবর প্রবীণ নিবাসে একটি অনুষ্ঠান হবে। সেখানে প্রবীণদের দীর্ঘ জীবনকে সুস্থ ও আনন্দময় করে তোলার ওপর আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ইন্তেজার রহমান বলেন, “শুধু বেশি দিন বেঁচে থাকার প্রত্যাশা করলেই হবে না, সেই জীবন সুস্থ ও সুন্দরভাবে কাটানোর বিষয়েও সচেতন হতে হবে।”
সেজন্য নিয়মিত ওষুধ সেবন, সময়মতো খাবার গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম ও হাঁটাচলার পাশাপাশি মানসিকভাবে ভালো থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
তার মতে, প্রবীণদের সুস্থ জীবনযাপনের জন্য বন্ধু ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং আনন্দময় পরিবেশে সময় কাটানোও গুরুত্বপূর্ণ।
