পুলিশ হেফাজতে জনির মৃত্যুর ৯ বছর: রায় বাস্তবায়ন চায় পরিবার
হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে প্রথম রায় বাস্তবায়ন ঝুলে আছে আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
ঢাকার মিরপুরের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ২০১৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি দুই ভাইকে ধরে নিয়ে এসেছিল মিরপুর থানা পুলিশের একটি দল। থানা হাজতে নির্যাতনে ৯ ফেব্রুয়ারি প্রাণ হারান বড় ভাই গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেন জনি।
জনিকে থানার ভেতর নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে আদালতে হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন ছোট ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি। সেই মামলার বিচার বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার দায়রা জজ আদালত তিন পুলিশ কর্মকর্তা ও দুই সোর্সকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেন।
সেটাই হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে প্রথম রায়। দণ্ডিত আসামিরা পরে হাই কোর্টে আপিল করেন। আপিল নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। জনি ও রকির মা খুরশীদা বেগম চান রায়ের পূর্ণ বাস্তবায়ন।
জনির ভাই মামলার বাদী রকি বলছেন, ২০১৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বরের ‘ইরানি ক্যাম্পে’ এক বিয়ের অনুষ্ঠানে আনন্দ করার সময় মাতাল অবস্থায় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করছিলেন পুলিশের সোর্স সুমন। জনি তাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দিলে ঝগড়া বেঁধে যায়।
এক পর্যায়ে সুমনকে চড় মারেন জনি, তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে সেখান থেকে চলে যান সুমন। আধঘণ্টা পর পল্লবী থানার তৎকালীন এসআই জাহিদুর রহমানসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসে ওই অনুষ্ঠান থেকে জনি ও রকি দুই ভাইকেই থানায় নিয়ে যান।
রকি বলেন, থানায় নিয়ে হাজতে ঢুকিয়ে একটি পিলারের সঙ্গে দুটি হাতকড়া দিয়ে দুই ভাইকে বাঁধা হয়। দুই ভাই দুই পাশে, মাঝে পিলার। রাত আড়াইটা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা মারধর করা হয় তাদের। তাদের মারতে মারতে বাসা থেকে টাকা আনতে বলছিলেন এসআই জাহিদ। এক পর্যায়ে হাতকড়ার জায়গা থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হলে তা খুলে দিলে দুই ভাইই মাটিতে পড়ে যান।
“ওই রাইতটা এহনো ক্লিয়ার মনে করতে পারি। আমার সামনেই ভাইয়ারে পিটায়া মারছে। ভাইয়া বাঁচলো না, আমি কেমনে যেনো টিক্কা গেলাম। তয় এহনো চান্দে চান্দে ব্যথা হয়।”
স্থানীয়রা বলছেন, জনির মৃত্যুর পর পরিবারটির পাশে দাঁড়ান স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দীন মোল্লাহ। পরে ওই বছরের অগাস্টে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন রকি।
আদালতের নির্দেশে ওই মামলার বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে ঢাকার মহানগর হাকিম মারুফ হোসেন ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেন। সেখানে তিন পুলিশ কর্মকর্তা ও দুই সোর্সের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়।
পাঁচ আসামি হলেন- পল্লবী থানার তৎকালীন এসআই জাহিদুর রহমান খান, এএসআই রাশেদুল ইসলাম ও এএসআই কামরুজ্জামান মিন্টু এবং পুলিশের সোর্স রাসেল ও সুমন।
২০২০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ রায়ে এই তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন এবং দুই সোর্সকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেন।
দণ্ডিতদের মধ্যে এসআই জাহিদ, এএসআই রাশেদুল ইসলাম ও সোর্স সুমন কারাগারে রয়েছেন। এএসআই মিন্টু সিঙ্গাপুরে পালিয়ে গেছেন বলে জানা যায়। আরেক সোর্স রাসেল দীর্ঘদিন পলাতক থেকে গত বছরের মার্চে লালবাগ থানায় ৭৫ গ্রাম হেরোইনসহ ধরা পড়েন।
মামলার বাদী রকি বলছেন, রাসেলের মাদকসহ ধরা পড়ার খবর বলে জানতে পেরে তিনি আদালতে আবেদন করলে তাকে (রাসেলকে) জনির মৃত্যুর অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তবে কিছুদিন পরেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান রাসেল, এখন আবার তাকে এলাকায় নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।
রকি বলেন, দায়রা জজ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে পরবর্তীকালে চারজন আসামি উচ্চ আদালতে আপিল করেন। সেটার নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। যে কারণে দায়রা জজ আদালত রায়ে জনির পরিবারকে যে ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে বলেছিলেন, তাও তারা পাচ্ছেন না।
