২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ রাখায় ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে হট্টগোল, ২ কর্মীকে হেনস্তা

ইউপিএল বলেছে, “আমরা প্রায় সব সরকারের আমলেই কোনো না কোনো চাপের মুখে পড়েছি।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 29 Sep 2026, 12:59 PM

Updated : 29 Sep 2026, 12:59 PM

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রির জেরে প্রকাশনা সংস্থা ‘দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের-ইউপিএল’ বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রের দুই কর্মীকে ধরে পুলিশে দিয়েছে একদল মানুষ।

পুলিশ বলছে, তারা ‘স্থানীয় বিএনপির লোক’; পরে ওই দুই কর্মীকে ছেড়েও দেওয়া হয়েছে।

সূত্রাপুর থানার ওসি মতিউর রহমান জানিয়েছেন, সোমবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে এ ঘটনা ঘটে বলে জানান

ইউপিএল কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে দেওয়া বিবৃতিতে বলছে, তাদের বিক্রয়কেন্দ্রে দুই যুবক ঢুকে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ কিনতে চাইলে তাদের বইটি দেখানো হয়। এ সময় তারা বইটিকে ‘নিষিদ্ধ’ দাবি করে কেন বিক্রি করা হচ্ছে, তা জানতে চান।

এক পর্যায়ে তারা সেখানে ‘হট্টগোল শুরু করেন এবং আশপাশের লোকজন জড়ো করেন’। এরপর বিক্রয় কেন্দ্রের শাটার নামিয়ে দিয়ে দুই কর্মীকে ধরে নিয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়।

ওসি মতিউর রহমান বলেন, “ইউপিএলতো শেখ মুজিবের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি পাবলিশড করছে আগে থেকেই। তাদের কাছে হয়ত আগে ছাপানো পুরোনো বইয়ের কোনো কপি ছিল। এ কারণে কিছু লোকজন সেখানকার দুই কর্মীকে ধরে এনে পুলিশে দিয়েছিল।”

তবে ওই দুই কর্মীকে থানায় নেওয়া হয়নি, স্থানীয় ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকেই তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

মতিউর রহমান বলেন, “পুলিশ দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে, তারপর দুই কর্মীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”

পরে কোনো পক্ষের তরফেই এ বিষয়ে থানায় কোন অভিযোগ করা হয়নি বলেও জানিয়েছেন তিনি।

‘ইউপিএল’ এর বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রের প্রথমে যে দুইজন যুবক গিয়ে বইটির খোঁজ করেছিল, তারাসহ তাদের সঙ্গের লোকজনের রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, “তারা স্থানীয় বিএনপির লোক।”

ঘটেছিল যা

ইউপিএলের সম্পাদনা বিভাগের পরিচালক ফিরোজ আহমেদ বলেন, সোমবার বিকেলে বাংলাবাজার শোরুমে এসে কিছু ব্যক্তি ‘আক্রমণাত্মক আচরণ করে’।

তিনি বলেন, “তারা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে’ নিষিদ্ধ বই হিসেবে দাবি করে এবং এর বিপণন বন্ধ করার দাবি জানায়। তখনই আমাদের পক্ষ থেকে প্রশ্নকারীদের জানানো হয়েছে যে, বইটি নিষিদ্ধ নয়। এরপরেও তারা দোকানের শাটার লাগিয়ে দিয়ে আমাদের দুইজন বিক্রয়কর্মীকে প্রবল হয়রানি করেছে।”

ঘটনাটি জাতির জন্য ‘অত্যন্ত লজ্জার এবং দুর্ভাগ্যজনক’

এ বিষয়ে একটি লিখিত বক্তব্যে ঘটনাটিকে ‘অপ্রত্যাশিত’ মন্তব্য করে ইউপিএল বিবৃতিতে জানিয়েছে, কোনো বই নিষিদ্ধ করতে হলে একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সবাইকে অবগত করতে হয়, কিছু আইনি পদক্ষেপ নিতে হয়। এই বইয়ের ক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটেছে বলে তাদের জানা নেই বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, “সরকার বা আদালতের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিলে ইউপিএল সেই অনুযায়ী যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

ঘটনাটিকে জাতির জন্য ‘অত্যন্ত লজ্জার এবং দুর্ভাগ্যজনক’ মন্তব্য করে ইউপিএল বলেছে, “আমরা প্রায় সব সরকারের আমলেই কোনো না কোনো চাপের মুখে পড়েছি। সরকার কিংবা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হয়েছে অমুক বা তমুক বই নিয়ে তাদের আপত্তি আছে।”

বিবৃতিতে ইউপিএল দাবি করেছে, বিগত সরকারের আমলে আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডেকেট সভা থেকে ইউপিএলের প্রকাশিত একটি বইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলা হয়েছিল। কিছু পাণ্ডুলিপি প্রকাশে ইউপিএল অসম্মতি জানালে সরকারি হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। আরও কিছু বই নিয়েও বহু ক্ষমতাবান ব্যক্তি সেসব প্রকাশ না করার জন্য বিভিন্ন সময়ে চাপ প্রয়োগ করেছেন। মওদুদ আহমেদের গ্রন্থাবলি নিয়ে বহুবার ইউপিএলকে চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। অধ্যাপক আসিফ নজরুলের গঙ্গচুক্তি বিষয়ক গ্রন্থটিও রিভিউয়ারদের মতামততের ভিত্তিতে ‘অত্যন্ত প্রতিকূল সময়ে’ তারা প্রকাশ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটি আরো বলছে, “প্রকাশক হিসেবে আমরা যথাসম্ভব এই চাপগুলো উপেক্ষা করেছি। পেশাদারিত্বের এই নীতির কারণে ইউপিএল বহু সময় বাণিজ্যিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু কখনোই প্রকাশনার এই মৌলিক মানদণ্ড থেকে সরে আসেনি। আমাদের প্রকাশিত যে কোন গ্রন্থ সম্পর্কে এটিই আমাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।”

তারা বলেছে, “যে কোন গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে ইউপিএল একটা নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করে। আমাদের পাণ্ডুলিপির রিভিউয়াররা স্বাধীনভাবে প্রতিটি বই যাচাই করেন, তাদের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতেই ইউপিএল প্রতিটি বই প্রকাশ করে। আমাদের এই আত্মবিশ্বাস থেকেই সেই আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হয়, যার শক্তিতে কোন চাপের কারণেই ইউপিএল তার কোন বই সরিয়ে নেয় না।”

গত সরকারের আমলের মত এখনও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীর’ বিজ্ঞাপন ইউপিএলের পেইজ থেকে নিয়মিত দেওয়া হয় বলেও সেখানে বলা হয়েছে।

“আমরা মনে করি যে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ আমাদের এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বই, বাংলাদেশ সৃষ্টির ও মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাতের বহু প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট এই গ্রন্থে পাওয়া যায়। ইউপিএল তার প্রতিটি বই দায়িত্ব নিয়েই প্রকাশ করে। এই বইটি কোন দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যথানিয়মতে নিষিদ্ধ করলে ইউপিএল যথাযথ আইন অনুসারে কাজ করবে।”

তারা মনে করছে, কোন ফৌজদারী অপরাধের উস্কানি নেই, এমন কোন বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণনে হস্তক্ষেপ করাটা সংস্কৃতির ‘সার্বিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর’।

প্রকাশনা শিল্পে ‘গুণ্ডামির রাজত্ব’ প্রতিষ্ঠিত হবার বিপদ সকলে উপলব্ধি করে যে কোন অবৈধ তৎপরতাকে রাষ্ট্র, সমাজ ও জ্ঞানচর্চার স্বার্থে কঠোর হাতে দমনের আহ্বান জানিয়েছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি।