Published : 17 May 2026, 01:18 AM
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে পদ্মা নদীতে ব্যারেজ স্থাপন নিয়ে যে আলোচনা চলছে তা বাস্তবায়নে এ সংক্রান্ত প্রকল্প এগিয়ে নিতে সায় মিলেছে; যা হতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম মেগা প্রকল্প।
এ অনুমোদনের পরপরই প্রস্তাবিত ব্যারেজ কতটা কাজে দেবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সেই সঙ্গে ‘ক্ষতি’ ও ‘অপচয়ের’ আশঙ্কাতেও শোরগোলও পড়েছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) বুধবার সরকারের সবুজ সংকেত পায় পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ ব্যারেজের প্রস্তাবিত স্থান একদিকে রাজবাড়ীর পাংশা আরেকদিকে পাবনার সুজানগরের সাতবাড়িয়া।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, পদ্মা আন্তঃদেশীয় নদী হওয়ায় এ প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করছে ভারতের ভূমিকার ওপর। সেজন্য মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির আগে বিহিত হওয়া দরকার।
সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে এ নদী নির্ভর পাঁচটি নদী ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিতকরণ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা কমানো, স্বাদু পানির সরবরাহ নিশ্চিতের মাধ্যমে সুন্দরবন বাস্তুতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার, যশোরের ভবদহসহ অন্যান্য এলাকায় জলাবদ্ধতা কমানো, সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং পদ্মা নির্ভর এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।
প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ব্যয় হবে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। আগামী জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে সরকারি অর্থায়নে তা বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
প্রকল্প প্রস্তাবকারী পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর ৩৫-৪০ হাজার কিউসেক পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করার জন্য এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত কলকাতা বন্দরের নাব্য উন্নত করার জন্য সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করে ভারত। ওই ব্যারেজের উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে পদ্মার প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী ব্যবস্থা শুকিয়ে গেছে। ফলে এ অঞ্চলের কৃষি মৎস্য, বনায়ন, নৌচলাচল, গার্হস্থ্য পানির প্রাপ্যতা এবং বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তার ওপর স্বাদু পানির প্রবাহ কমায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও খালগুলোতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় জনসাধারণের জীবন ও জীবিকা গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে।
প্রকল্পের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এও বলেছে, রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশাল জেলার বিস্তৃত অঞ্চলের জন্য পদ্মা নদী একমাত্র ‘সুপেয়’ ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস হওয়ায় এসব অঞ্চলের কৃষি, বনজ ও মৎস্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ‘টেকসই পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা’ অত্যন্ত গুরুতপূর্ণ।
“প্রকল্প এলাকায় চ্যালেঞ্জিং পানি ব্যবস্থাপনা মোকাবেলায় পদ্মা নদীর উপর উপযুক্ত স্থানে একটি ব্যারেজ নির্মাণকে প্রধান উপায় হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে।”
এ প্রকল্প নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) উদ্বেগ জানিয়েছে। সংগঠনটি বলছে, সম্ভাব্য নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে প্রকল্প প্রস্তাবে কিছু বলা নেই কিংবা আলোচনাই দেখা যায় না।
“অথচ এই প্রকল্পের ফলে উজান এবং ভাটি উভয় এলাকায়ই গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

পদ্মা ব্যারেজ পরিকল্পনার ছয় দশক
দীর্ঘতম নদী পদ্মায় ব্যারেজ নির্মাণের আলোচনা শুরু হয় বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে। এ ব্যারেজের উপযুক্ত স্থান ঠিক করতে ২০০০ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে চারটি সমীক্ষা সম্পন্ন হয়৷ এরপর ২০০৫ সালে নেওয়া এক প্রকল্পের আওতায় সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় নামে চারটি দেশি ও তিনটি বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম। এর সঙ্গে পাঁচটি দেশি সহযোগী সংস্থা মিলে ২০১৩ সালে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে।
ড্যাম বা বাঁধের মাধ্যমে পানির প্রবাহ বন্ধ হলেও ব্যারেজের মাধ্যমে পানির প্রবাহকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় বা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ব্যারেজের কাঠামোতে বিপুল সংখ্যক গেইট থাকে, যেখানে বাঁধের ক্ষেত্রে পানি ছাড়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু গেইট থাকে। বাঁধের ক্ষেত্রে উজানে পানির উচ্চতা ও চাপ অনেক বেশি থাকলেও ব্যারেজে উজানে পানির উচ্চতা সামান্য বৃদ্ধি পায়। সাধারণত সেচ সুবিধার জন্য ব্যারেজ দেওয়া হয়।
প্রকল্পের নথি অনুসারে, এ সমীক্ষায় পদ্মা নির্ভর অঞ্চলের জটিল পানি ব্যবস্থাপনার টেকসই সমাধান, জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ, দারিদ্র হ্রাস এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ এবং প্রকল্প এলাকায় পরিকল্পিত পানি বণ্টনের লক্ষ্যে তিনটি অফটেক অবকাঠামো নির্মাণ; পদ্মা নির্ভর এলাকায় পাঁচটি নদী ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় নদী শাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, সমীক্ষার সুপারিশের আলোকে প্রণীত নকশা ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে সরেজমিন যাচাই-বাছাই করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিজাইন সার্কেল। এরপর উচ্চ পর্যায়ের কারিগরি কমিটিগুলোর পর্যালোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে পরিমার্জন শেষে নকশা চূড়ান্ত করা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবরে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ১৪ বছরের (২০১১-২০৫) স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ এবং প্রকল্প এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়।
“এতে প্রতীয়মান হয় যে, ব্যারেজ নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত স্থানের ব্যাংক লাইনে উল্লেখযোগ্য শিফটিং হয়নি; বরং উক্ত স্থানে চর ফরমেশনের ফলে ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে, যা পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের জন্য অনুকূল,” বলা হয়েছে একনেক সভায় উপস্থাপিত প্রকল্প নথিতে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে গত ২৯ জানুয়ারি রাজশাহীতে নির্বাচনি জনসভায় পদ্মায় ব্যারেজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সেই প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে একনেক সভা শেষে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, “সবদিক বিবেচনায় এই প্রকল্পকে আমরা বলছি যে মাস্টারমাইন্ড প্রকল্প, যেটা আমাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল, ইশতেহারে ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের পূর্বে রাজশাহীতে গিয়ে জনসাধারণের সামনে সেটা বক্তব্য রেখেছিলেন, প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেটা বাস্তবায়নের জন্য এই প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়েছে।”
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ২৪টি জেলার পানি সংকট নিরসন হবে এবং সাত কোটি মানুষ উপকার পাবে বলে ভাষ্য মন্ত্রীর।

কী আছে প্রকল্পে
একনেক সভায় উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা নদীর ওপর একটি ব্যারেজ নির্মাণ করে ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে।
শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি-মে) হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী ব্যবস্থায় অন্তত ২৩৯ কিউমেক (প্রতি সেকেন্ডে যত ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়), গড়াই-মধুমতি ব্যবস্থায় ২৩০, চন্দনা-বারাশিয়া ব্যবস্থায় ৮০, ইছামতি ব্যবস্থায় ২২ ও বড়াল নদী ব্যবস্থায় ২৫ কিউমেক পানি সরবরাহ করা হবে।
এছাড়া গোদাগাড়ী পাম্প হাউজ ৬৪ কিউমেক, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প ১৩৬ এবং রূপপুর পারমণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবে ৩ কিউমেক পানি।
কিউসেক পদ্ধতিতে পানির আয়তন মাপা হয় ঘনফুটে, আর কিউমেক পদ্ধতিতে মাপা হয় ঘনমিটারে। নদীর কোনো নির্দিষ্ট স্থান দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে যত ঘনফুট পানি প্রবাহিত হয়, তাকে কিউসেক বলে। আর নদীর নির্দিষ্ট স্থান দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে যত ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়, তাকে কিউমেক বলে।
বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের চাষযোগ্য ২৮ দশমিক ৮০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের পানি নিশ্চিত করাও এ প্রকল্পের লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে। তাতে প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান উৎপাদন বাড়বে; সেই সঙ্গে ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
এ প্রকল্পের মূল অংশ পদ্মা ব্যারেজের দৈর্ঘ্য হবে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। এতে থাকবে ৭৮টি পানি নির্গমন পথ (স্পিলওয়ে গেট), ১৮টি নিম্নস্রোত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো (আন্ডার স্লুইস গেট), মাছ চলাচলের বিশেষ পথ (ফিস পাস), নৌযান চলাচলের লক (নেভিগেশন লক) এবং নদীতীর রক্ষাবাঁধ।
এছাড়া গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর জন্য তিনটি পানি গ্রহণ কাঠামো (অফ-টেক) নির্মাণ করা হবে।
একই সঙ্গে ১১৩ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে প্রকল্প প্রস্তাবে। এর মধ্যে মূল ব্যারেজে ৭৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট এবং গড়াই অফ-টেটে ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় নদী ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে গড়াই-মধুমতী নদীতে ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার খনন এবং হিসনা নদী ব্যবস্থাপনায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ করা হবে। এ ছাড়া ১৮০ কিলোমিটার এফ্লাক্স (উজানে বিশেষ সুরক্ষামূলক) বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ব্যারেজের ওপর সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে এটিকে বহুমুখী করিডর হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ভূমি উন্নয়নের মাধ্যমে সাতটি স্যাটেলাইট শহর প্রতিষ্ঠার ভিত্তি দেওয়া হবে।
ব্যারেজের প্রকল্প এলাকা দেশের মোট এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ জানিয়ে প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এটি দেশের চারটি বিভাগের ২৬টি উপজেলার ১৬৩টি উপজেলায় বিস্তৃত। তবে প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা উপকৃত হবে।
এসব জেলা হল-কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

কতটা কাজে দেবে ব্যারেজ?
ভারতের সহযোগিতা ছাড়া এ প্রকল্পের সুফল মিলবে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল নেটওয়ার্কের (বেন) বৈশ্বিক সমন্বয়ক ড. মো. খালেকুজ্জামান।
সরকারের কাছে খোলা চিঠিতে তিনি বৃহস্পতিবার লিখেছেন, “প্রকৃতি ও পরিবেশ বিধ্বংসী পদ্মা ব্যারেজ না বানিয়ে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি কীভাবে গ্যারান্টি ক্লজসহ শুষ্ক মৌসুমে আরো বেশি পানি এবং পলি পাওয়া যাবে সেই লক্ষ্যে কাজ করুন।
“চুক্তি অনুযায়ী পানি না পেলে শক্তভাবে অভিযোগ করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাহায্য চাইতে পারবেন। আর পদ্মা ব্যারেজ করে শুকনো মৌসুমে ভারত পানি না ছাড়লে হাত-পা ধরেও পানি আনতে পারবেন না।”
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “দ্রুত জাতিসংঘের পানি প্রবাহ আইনটি পার্লামেন্টে অনুস্বাক্ষরের উদ্যোগ নিন। উজানের পানি ছাড়া পদ্মা ব্যারেজ একটি ধুধু বালুচর ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবে না। তিস্তা সেচ প্রকল্প থেকে শিক্ষা নিন।
“পদ্মা ব্যারেজ বঙ্গীয় বদ্বীপ গঠন এবং বৃহত্তর বরিশাল বিভাগে লবণাক্ততা আরো বাড়াবে। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং পরিবেশ সমীক্ষা বিষয়ে খোলামেলা জাতীয় সংলাপের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প সংশোধন করার এবং অপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলো বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিন।”
গঙ্গার পানি বণ্টনে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে ৩০ বছরের চুক্তি করে। সমঝোতা অনুযায়ী ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কা থেকে দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন করা হতে থাকে।
৪০ বছরের গড় মাত্রা অনুযায়ী ভারত পানির ভাগ পায়। যেকোন সংকটের সময় বাংলাদেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি সরবরাহ করার গ্যারান্টিও দেওয়া হয়।
এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালে। ফলে এরপর থেকে বাংলাদেশ কী হারে পানি পাবে, এ নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম মনে করেন, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ দেখে তারপর পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পে আগানো উচিত।
তিনি বলেন, “আসলে এটা (প্রকল্প) এত সিম্পল না। এটার মধ্যে একটা অ্যাজিউম করা হচ্ছে যে, আমাদের বর্ষাকালে পানি ধরে রাখবে এবং শীতকালে অবশ্যই কিছু প্রবাহ থাকতে হবে।
“এখন শীতকালে যদি এই গঙ্গা চুক্তি শেষ হওয়ার পরে যদি আমাদের পানি প্রবাহের নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে এই প্রকল্প বলা যায় যে হুমকির মুখে পড়বে।”
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “এরকম একটা সিচুয়েশন কিন্তু তিস্তায় দেখছি। তিস্তায় একটা ব্যারেজ আছে, আবার গজলডোবায় আরেকটা ব্যারেজ আছে। এখন ওখানে কিন্তু কোনো চুক্তি নাই।
“তার ফলে উনারা (ভারত) গজলডোবা থেকে তাদের মানে যতটুকু যখন তাদের মনে হয়—সেভাবে কিন্তু পানি প্রত্যাহার করে তিস্তা থেকে। এখন আমাদের গঙ্গাতেও যদি এই ট্রিটিটা এনশিউর না হয়, তাহলে কিন্তু আমাদের এই প্রকল্প একটা বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।”

অধ্যাপক সাইফুল মনে করেন, এই প্রকল্পে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও মধ্য অঞ্চলের নদ-নদী, বিশেষ করে আড়িয়াল খাঁ’র পানি প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, “ব্যারেজের কারণে নদীর নিম্নাঞ্চলে পানি কমে গেলে শুষ্ক মৌসুমে ওই এলাকায় লবণাক্ততা বেড়ে যেতে পারে, যা স্থানীয় পরিবেশের জন্য নতুন সংকট তৈরি করবে।”
নদীর পলি বা তলানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ বলেন, এই নদী শুধু পানি নয়, প্রচুর পলিও বহন করে। ব্যারেজের গেটগুলো বন্ধ থাকলে সামনে পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই পলি অপসারণ বা ‘ফ্লাশিং’ করার আধুনিক প্রযুক্তি নিশ্চিত করা না গেলে প্রকল্পের ব্যয় ও জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যাবে।
তার মতে, “একটি সঠিক ও উন্নত নকশা না থাকলে পলি জমার কারণে প্রতি পাঁচ বছর পরপর উজানে খনন কাজ চালাতে হবে, যা আমাদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।”
অধ্যাপক সাইফুল বলেন, ব্যারেজের ফলে উজানে পলি আটকে গেলে নদীর স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। পলিহীন পানি তখন তার ভারসাম্য বজায় রাখতে নদীর তীরের মাটি বা পাড় ভাঙতে শুরু করে।
“পলি আটকে যাওয়ার ফলে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে উজানে যেমন বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়, তেমনি নিম্নাঞ্চলে তীব্র নদী ভাঙন দেখা দিতে পারে।”
ফারাক্কা ও কোশী ব্যারেজের উদাহরণ টেনে তিনি সতর্ক করেন যে, এ ধরনের কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা বা ব্যারিয়ার স্ট্রাকচার শুধু নদীর গতিপথ নয়, বরং মৎস্য সম্পদ এবং সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের ওপরও দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না করে এবং পরিবেশগত প্রভাবগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ না করে এমন মেগা প্রকল্পে যাওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি থেকে যায়।
তিনি বলেন, এটির যেমন কিছু ইতিবাচক দিক আসবে বলে ধরা হচ্ছে, তেমনি আবার কিছু নেতিবাচক প্রভাবও আছে। এটি এখন সরকারকে চিন্তা করতে হবে। এর সঙ্গে বিষয় হল ভারতের সাথে পানি চুক্তির এবং ন্যায্য পানির প্রাপ্যতার বিষয়।
“সেইখানে কিন্তু এই একতরফাভাবে এখানে ব্যারেজ করলেই আমাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বা এটাকে দুই দেশের সম্মতি নেওয়াটাই বোধহয় অনেকটা যৌক্তিক বলে মনে হয়। তাহলে হয়তো ওই দরকষাকষিটা একটু বেটার হবে।
“এটা এমন না যে নদীটা (পদ্মা) পুরোটাই আমাদের দেশে। একটা অংশে বিশেষ শীতকালের প্রবাহ তাদের (ভারতের) ওপরে নির্ভর করে। তো সেই জায়গায় এইটা নিয়েও বোধহয় একটা আলাপ-আলোচনা করা দরকার এবং ট্রিটি (গঙ্গা চুক্তি) শেষ হওয়াটা—আমরা কী করব সেটাও এটার উপরে মানে এই ব্যারেজের কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করছে।”
সরকারকে আরও চিন্তাভাবনার পরামর্শ দিয়ে পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ সাইফুল ইসলাম বলেন, “তো এটা মানে খুব সহজ নয়।
“যদি নদীটা পুরোটাই বাংলাদেশের উপরে থাকত, তাহলে একরকম আসলে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম। এখন কিন্তু একটা অনিশ্চয়তা আছে এই ব্যারেজের কার্যকারিতায়।”
তবে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি এবং গঙ্গা চুক্তির পানির সঠিক সদ্ব্যবহারের জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে দেখছেন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস’র (সিইজিআইএস) নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে গড়াই, মাথাভাঙ্গা বা হিসনা নদী দিয়ে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহিত হতে পারে না, যার ফলে এই অঞ্চলে সেচ কাজ এবং সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই সমস্যা সমাধানে একটি প্রকৌশলগত অবকাঠামো বা ব্যারেজ নির্মাণ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।

এই প্রকল্পের বহুমুখী সুফলের কথা বলতে গিয়ে এই পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ বলেন, এর মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়িয়ে শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বোরো চাষ নিশ্চিত করা যাবে এবং সুন্দরবনের লবণাক্ততা কমিয়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। এছাড়া মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো আনুষঙ্গিক সুবিধাও পাওয়া যাবে।
আন্তর্জাতিক বা রাজনৈতিক জটিলতার কোনো শঙ্কা দেখছেন কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং ভাটির দেশ হিসেবে এতে ভারতের ক্ষতির কোনো কারণ নেই।
“২০১০ সালের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় সময় ভারত যে প্রশ্নগুলো করেছিল, তার যথার্থ কারিগরি উত্তর ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে।”
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ দেখছেন মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান। এর মধ্যে রয়েছে—প্রকল্পের পুরনো নকশা বর্তমান পরিবেশগত প্রেক্ষাপটে আধুনিকায়ন করা এবং পদ্মার মতো বিশাল নদীতে এই ধরনের স্থাপনা তৈরির অভিজ্ঞতা সম্পন্ন দেশীয় ঠিকাদার না থাকা।
এছাড়া প্রায় সাড়ে ৩৪ হাজার কোটি টাকার এ বৃহৎ প্রকল্পের অর্থায়নকেও তিনি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তার পরামর্শ, “যেহেতু এটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার একটি প্রকল্প, তাই আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।”
প্রকল্প বাস্তবায়ন পরবর্তী ব্যবস্থাপনাকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর চাপ না বাড়িয়ে ‘পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ’ এর মত একটি স্বতন্ত্র স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গঠন করা উচিত, যারা এই প্রকল্পের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে।
“স্বতন্ত্র একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করা হলে এই ধরনের বড় প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ অনেক বেশি কার্যকর হবে।”
‘পাউবোর শিক্ষা নেওয়া উচিত’
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের কারিগরি ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য আনু মুহাম্মদ।
তিনি মনে করেন, এই প্রকল্প নদীর পানি প্রবাহের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সমাধান না করে বরং পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
ফারাক্কা ব্যারেজের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “ভারত এই ব্যারেজের মাধ্যমে উজানে পানি নিয়ন্ত্রণ করার ফলে ভাটির দেশ হিসেবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, তেমনই খোদ ভারতের বিহারেও পলি জমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।”
জাতীয় বিভিন্ন বিষয়ে সোচ্চার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, “বাংলাদেশে এই ব্যারেজের ফলে পানি এক জায়গায় আটকে রাখার চেষ্টা করা হবে, যার ফলে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। উজানে ফারাক্কার কারণে যেখানে পানির প্রাপ্তিই অনিশ্চিত, সেখানে নতুন এই ব্যারেজ ফারাক্কা সমস্যার সমাধান তো করবেই না, বরং সংকটকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।”
প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, মেগা প্রকল্পের পেছনে জনস্বার্থের চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী যেমন পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরামর্শক সংস্থা ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক উৎসাহ কাজ করে বেশি।
তিনি বলেন, “এটা দুর্নীতি তো একটা বড় ক্ষেত্র, এটা আছেই; কিছু গোষ্ঠী সুবিধার ব্যাপার আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপদের বিষয় হলো যে আমাদের এই নদীর পানি প্রবাহটা আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এবং জলাবদ্ধতা বন্যা এগুলো আরও বাড়বে।”
তিনি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিবেশগত সমীক্ষার প্রতিবেদন জনগণের সামনে উন্মুক্ত করার দাবি জানান।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) প্রশ্ন তুলেছে, এই প্রকল্প যে বাংলাদেশের উপকারে আসবে তা কি প্রকল্প প্রস্তুতকারীরা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে? সে ধরনের সমীক্ষা আছে কি? থাকলে সেটা জনগণের কাছে প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন?
সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এস এম মিজানুর রহমান বুধবার এক বিবৃতিতে এসব প্রশ্ন তুলেছেন।
ভারতের ফারাক্কা বাঁধের উদাহরণ টেনে তারা বলেছেন, “ব্যারেজের উজানে নদীতে পলিপতনের ফলে তলদেশ ভরাট হয়ে যাবে এবং ব্যারেজের প্রস্তাবিত স্থান পাংশা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার নদীর দুই তীরে বন্যা এবং পাড় ভাঙ্গণ বৃদ্ধি পাবে।”
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে তারা আরও দুটি আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন।
বিবৃতি অনুযায়ী, “প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজের মাধ্যমে এই নদীর শুষ্ক মৌসুমের যতটুকু পানি দক্ষিণ-পশ্চিমে অপসারিত হবে, দেশের মধ্যাঞ্চল এবং মেঘনা মোহনার জন্য ঠিক ততটুকু পানিই হ্রাস পাবে। এর ফলে আড়িয়াল খাঁসহ অন্যান্য নদীর প্রবাহ কমে যাবে এবং মেঘনা মোহনা দিয়ে লবণাক্ততা দেশের আরও ভেতরে প্রবেশ করবে।”
এ প্রকল্পের ফলে ভারতের কাছ থেকে পদ্মার হিস্যা আদায়ের প্রচেষ্টার আর কোনো সুযোগ থাকবে না বলে মনে করে বাপা।
এর ব্যাখ্যায় বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “কারণ ভারত জানাবে যে, পদ্মা ব্যারেজের মাধ্যমে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।”
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই প্রকল্প ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলেও বিবৃতিতে বলা হয়।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পকে এগিয়ে নেওয়া একটি ‘হঠকারী পদক্ষেপ’ হবে মন্তব্য করে বিবৃতিতে বলা হয়, বাপা ও বেন মনে করে, আন্তর্জাতিক নদনদীর ব্যবহার বিষয়ক জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের চুক্তি সই করে ভারতের কাছ থেকে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার হিস্যা আদায়ের চেষ্টা করা উচিত। এই আলোকেই গঙ্গা চুক্তির নবায়ন করা দরকার।
এছাড়া গঙ্গার সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের সকল শাখানদীর সংযোগ অবারিত করা এবং এসব নদীর উপর নির্মিত প্রবাহ বিঘ্নকারী সব প্রতিবন্ধকতা দূর করার দাবি জানানো হয় বিবৃতিতে।
এক্ষেত্রে বড়াল নদীর অভিজ্ঞতা টেনে বলা হয়েছে, এ নদীর উৎসমুখ রাজশাহীর চারঘাটে ১৯৮৪ সালে পাউবো নির্মিত স্লুইসগেটের কারণে পদ্মার প্রবাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাপা ও বেনের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে গত বছর এই স্লুইসগেট আংশিকভাবে উন্মোচিত করার ফলেই প্রায় ৪০ বছর পর এই নদীতে পুনরায় পদ্মার পানি প্রবেশ করেছে।
“এই অভিজ্ঞতা থেকে পাউবোর শিক্ষা নেওয়া উচিত।”
বাপা বলছে, “বস্তুনিষ্ঠ সমীক্ষা ছাড়া প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হওয়া নবগঠিত বিএনপি সরকারের কোনোভাবেই উচিত হবে না। এত বড় বাজেটের এই প্রকল্পের ভালমন্দ নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।”

যা বলছে মন্ত্রণালয় ও পাউবো
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের সার্বিক দিক নিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ডিপিপি তৈরির পর তা অনুমোদন হয়েছে। এখন দরপত্র আহ্বানসহ অন্য যে প্রক্রিয়াগুলো আছে সেগুলো শুরু হবে।
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) মহাপরিচালক মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান বলেন, “এটার বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তো আসলে পানি উন্নয়ন বোর্ডই করবে।
“যদি আমাদের কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত বাস্তবায়ন পর্যায়ে চায়, তখন তা দিতে আমরা প্রস্তুত।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. এনায়েত উল্লাহকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া মেলেনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মোল্লা মিজানুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রকল্পের প্রস্তাব অনুযায়ী ধাপে-ধাপে কাজগুলো হবে। ওটা কেবল সভায় (একনেকে) অনুমোদন হয়েছে। বাকি আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রকল্প পরিচালককে দায়িত্ব দেওয়াসহ আস্তে আস্তে কার্যক্রম শুরু হবে।
এ প্রকল্প নিয়ে যেসব আশঙ্কার কথা আসছে, সেসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “শুকনো মৌসুমের পানি ব্যবস্থাপনার জন্যই তো এই ব্যারেজটা মূলত; ওটাই উদ্দেশ্য। যেমন পানি আসে, পানি নেমে যায়; আমাদের এদিকের পানি তো ঠেকায় রাখতে পারি না।
“এই ব্যারেজ দিলে তখন এটা নিয়ন্ত্রণ হবে। শুকনো মৌসুমে ব্যবহার হবে। ওই সব নদী-নালা চ্যানেল যেগুলো আছে—আমাদের পাশের যে জেলাগুলো, সব এলাকায় এগুলো যাবে।
“বর্ষার সময় তো পানির অভাব নাই। বর্ষার সময় তো পানি ওরা (ভারত) এমনি ছেড়ে দেয়। এই ব্যারেজটাই করা হচ্ছে যে, এই পানিটা আটকে রাখা হবে। যাতে শুকনো মৌসুমে পানি থাকে এবং এই পানি আমরা ব্যবহার করতে পারি।”

নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে মোল্লা মিজানুর বলেন, “ইতিবাচক-নেতিবাচক থাকতে পারে; এগুলো আসলে অনুমান। কিন্তু প্রধান বিষয়টা
হল যে, যখন এখানে ব্যারেজ এবং পানি আসবে…ওই দিকে আমাদের অনেক নদী আছে; মহানন্দা থেকে শুরু করে গড়াই, মধুমতী, নবগঙ্গা থেকে ওই অংশে বহু নদী আছে।
“যখন এখানে ব্যারেজ হবে, ওই চ্যানেলগুলো এখন যেমন বন্ধ হয়ে গেছে, ধরেন ভবদহ থেকে শুরু করে এই অঞ্চল গড়াই, সব তো শুকায় চর পড়ে গেছে- তাই না? ওই এলাকায় এখন পলি যেটা পড়ে, সেটাও তো ওইটার কারণে পানি নাই সেই কারণে।
“যখন এই এলাকাটা স্রোত বা পানি পর্যাপ্ত হয়ে যাবে, তখন বরং ওই নদীগুলো সচল হবে, আরও ভালো হবে। ওইখানে খারাপ হওয়ার মতো কোনো সুযোগ দেখি না। বরং আরও ভালো হবে পানি থাকলে। পরিবেশ ভালো থাকবে, পশুপাখি, গাছগাছালি, জলবায়ু পরিবর্তন–সবকিছুর জন্য ভালো সেটা।”