Published : 26 Jun 2025, 05:29 PM
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে এর জন্য সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নীলা ইসরাফিল নামের এক নারী।
নিজেকে এনসিপির সদস্য ও জাতীয় নাগরিক কমিটির ধানমন্ডি থানার প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে নীলা দলটির কাছে তার প্রত্যাশাও তুলে ধরেছেন।
বৃহস্পতিবার নিজের ফেইসবুকে একটি লিখিত অভিযোগ প্রকাশ করেন নীলা, যেখানে প্রাপক হিসেবে তদন্ত কমিটির পাশাপাশি এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনের নাম রয়েছে।
তবে এই চিঠি এনসিপির নেতাদের কাছে সরাসরি হস্তান্তর করা হয়েছিল কিনা তা জানা যায়নি।
তুষার, নীলা, এনসিপি নেত্রী সামান্তা শারমিনসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা ফোন না ধরায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম তাদের বক্তব্য পায়নি।
এর আগে ১৫ জুনও তুষারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাধ্যমে অভিযোগ তুলেছিলেন নীলা। অভিযোগের ভিত্তিতে তুষারকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়ার পাশাপাশি ও তাকে দলীয় কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে নীলা তার যে দলীয় পরিচয় দিয়েছেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা নিজাম উদ্দিন দাবি করেন, এনসিপির ধানমন্ডি থানায় কমিটি দেওয়া হয়নি। দলীয় ফর্ম পূরণ করলে তিনি দলের প্রাথমিক সদস্য হতে পারেন। এছাড়া জাতীয় নাগরিক কমিটির কোনো পদে থাকলে সেটা এনসিপির নয়।

নীলার অভিযোগ
নীলা তার ফেইসবুক পোস্টে এনসিপির ‘রাজনৈতিক লড়াইয়ে’ যুক্ত থাকার পাশাপাশি তুষারের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। এরপরই তুষারের সঙ্গে ফোনে কথোপকথন সামনে এনে তিনি এক এক করে অভিযোগের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
১. নৈশকালীন ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর আলাপ:
তিনি (তুষার) প্রায়ই রাতের বেলা কল করে বলেন, “রাজনীতি নিয়ে কথা ভালো লাগে না, তোমার কণ্ঠে ভালো লাগে প্রতিবাদের স্লোগান,” … “একটা সুন্দর ছবি পাঠাও” এই ধরনের মন্তব্য বারবার আমাকে অস্বস্তি ও অপমানের মধ্যে ফেলেছে।
২. ভিডিও কলে কথা বলার চাপ ও ব্যক্তিগত ছবি চাওয়া:
“আমি বারংবার অনুরোধ করেছি পেশাদার সীমা রক্ষা করতে। এরপরও তিনি বারবার ব্যক্তিগত আলাপের দিকে আলোকপাত করেন। ছবি চাইতেন এবং ভিডিও কলে কথা বলতে চাইতেন।”
৩. ডিবি অফিসারের কাছে মিথ্যা দাবি:
তিনি (তুষার) বলেন, “তোমার বিষয়ে ডিবি অফিসার আমাকে প্রশ্ন করলে আমি বলেছি, তুমি আমার গার্লফ্রেন্ড।” একজন রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে এ ধরনের ভ্রান্ত তথ্য প্রদান চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং আমার সামাজিক মর্যাদাকে হেয় করার শামিল।
৪. ফোনালাপ রেকর্ড ও প্রচারের ঘটনা:
নীলা লিখেছেন, “আমি যখন বুঝতে পারি, এই রাজনৈতিক সম্পর্ক আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ও মানসিকভাবে নিঃশেষ করছে, তখন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে তুষারের সঙ্গে কয়েকটি ফোনালাপ রেকর্ড করি। ১৬ জুন সেই রেকর্ডের একটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
“এরপর তুষার আমাকে চাপ দিতে থাকেন যেন আমি ফেসবুকে বলি, ‘তার বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই’। আমি তখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় ফোনালাপও রেকর্ড করি এবং এগুলো কিছু মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকের মাধ্যমে প্রচারে সম্মতি দিই।
“কেননা, সেইগুলো উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যৌন হয়রানিমূলক এবং যৌন হয়রানিমূলক অপরাধ করে তা প্রকাশ করা থেকে বিরত করবার চেষ্টাও হয়েছিল অবিরত।”

দাবি ও প্রত্যাশা
নীলা এনসিপি ও সংশ্লিষ্ট নেতাদের প্রতি তুষারের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবির পাশাপাশি কিছু প্রত্যাশা তুলে ধরেছে।
১. একটি নিরপেক্ষ, নারীবান্ধব এবং স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে সারোয়ার তুষারের বিরুদ্ধে যথাযথ সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
২. নারী কর্মীদের জন্য স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা অবিলম্বে চালু করা হোক।
৩. এনসিপি এই ঘটনায় দায় এড়িয়ে নয়, বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে সাহসী রাজনৈতিক অবস্থান নিক, যা দলকে আরও বিশ্বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নীতিনিষ্ঠ করে তুলবে।
সম্প্রতি প্রবাসী ফেইসবুকার জাওয়াদ নির্ঝরের পেইজে এক নারীর সঙ্গে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারের ব্যক্তিগত কথোপকথন ফাঁস হয়।
পরে সেই ফোনালাপের অডিও কপি করে আরেক যুগ্ম-আহ্বায়ক ডা. তাজনূভা জাবীনের ছবি বসিয়ে অনেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, ওই ফোনালাপ সারোয়ার ও তাজনূভার মধ্যে হয়েছে।
১৭ জুন তুষারকে দলের পক্ষ থেকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। ‘নৈতিক স্খলনের’ অভিযোগ এনে তাকে পাঁচদিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয় নোটিসে। বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে বলা হয়।
তুষারের এই ব্যক্তিগত ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনার সঙ্গে দলের আরেক নেত্রী তাজনূভা জাবীনকে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা শুরুর কথা তুলে ধরে এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে দলটি।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও ভাবছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
সারোয়ার তুষার স্বীকার করেছেন যে ওই টেলি কথোপকোথন তার। তবে এভাবে ব্যক্তিগত আলাপের অডিও ফেইসবুকে প্রকাশের নিন্দা জানিয়েছেন তিনি।
১৭ জুন এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, “দুই ব্যক্তির ব্যক্তিগত কথোপকথন বিনা অনুমতিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেয়া জঘন্য কাজ। আমি ভুলের ঊর্ধে না। কিন্তু আমার তিন মাস আগের ব্যক্তিগত কথোপকথন কাঁটছাঁট করে পরিপ্রেক্ষিহীনভাবে অনলাইনে ছেড়ে দিয়ে আমাকে অপদস্থ করার মধ্যে কোনো গৌরব নাই৷”
এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার নীলা ইসরাফিল ফেইসবুক পোস্টে তুষারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেন।
পুরনো খবর:
'নৈতিক স্খলনের' অভিযোগে তুষারকে কারণ দর্শানোর নোটিস এনসিপির
তাজনূভা জাবীনকে হয়রানির নিন্দায় এনসিপি, আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত