বে টার্মিনালে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায় সিঙ্গাপুরি কোম্পানি
“বে টার্মিনাল চালু হলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় নিশ্চিত হবে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের নির্মিতব্য বে টার্মিনালের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে ফের আগ্রহ প্রকাশ করে সিঙ্গাপুর বলেছে, তারা সেখানকার অবকাঠামো নির্মাণে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়।
এ বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আরও বিদেশি বিনিয়োগ ‘আকর্ষণে সহায়ক হবে’ বলে মন্তব্য করেছেন সিঙ্গাপুরের অনাবাসিক হাই কমিশনার ডেরেক লো।
তিনি মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
ডেরেক লো বলেন, সিঙ্গাপুর বাংলাদেশে আরও বেশি ব্যবসা ও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
বে টার্মিনাল প্রকল্পকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ও ‘দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ’ বর্ণনা করে তিনি বলেন, “প্রায় ৮০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এ বিনিয়োগ বাংলাদেশের বাণিজ্য অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং ভবিষ্যতে আরও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।”
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের চট্টগ্রাম ইপিজেডের পেছনের অংশ থেকে রাণী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত প্রায় সোয়া ৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে হওয়ার কথা এ বে-টার্মিনাল প্রকল্প। এতে ১২ মিটার ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশের গভীরতা) এবং ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে।
কয়েক বছর আগেও চট্টগ্রাম বন্দরে নানা কারণে জাহাজজট এবং অপেক্ষমাণ সময় বেশি ছিল। বন্দরের বিদ্যমান টার্মিনালগুলোতে ১০ মিটারের বেশি ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশের গভীরতা) জাহাজ প্রবেশ করতে পারত না।
ডেরেক লো বলেন, “বে টার্মিনাল চালু হলে বন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, ডেমারেজ বা বিলম্বজনিত খরচ কমবে এবং বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক সাশ্রয় নিশ্চিত হবে।”
এ ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন বাণিজ্য ও শিল্প খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আঞ্চলিক ভৌগোলিক দিক থেকে ‘গুরুত্বপূর্ণ জায়গা’ হওয়ায় এবং অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় ২০২৫ সালের এপ্রিলে বে টার্মিনাল অবকাঠামো উন্নয়নে সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে অন্তর্বর্তী সরকার।
বে টার্মিনালের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্ব ব্যাংক দেবে ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি এবং সরকারি তহবিল থেকে খরচ হবে ৪ হাজার ১৯২ কোটি টাকা।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) এর মাধ্যমে আরও একটি প্রকল্প নেওয়া হবে জানিয়ে ওইদিন একনেক বৈঠকের পর তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছিলেন, সব মিলিয়ে এখানে চারটি টার্মিনাল হবে এবং এটি মেগাপ্রকল্প হবে। প্রকল্পটি যাতে দ্রুত শেষ হয়, সেজন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে প্রথম টার্মিনাল নির্মাণে যুক্ত হতে কয়েক বছর ধরেই চেষ্টা চালিয়ে আসছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি পোর্ট অব সিঙ্গাপুর অথরিটি (পিএসএ) ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি।
এ টার্মিনালের অপারেটরের দায়িত্বও তাদের হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষে সায় ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। তবে একের পর এক বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দর তুলে দেওয়া নিয়ে তুমুল সমালোচনার মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার পিছু হটে।
একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের পরে ২০২৫ সালের মে মাসে পতেঙ্গায় প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল এলাকা পরিদর্শন করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছিলেন, বে টার্মিনাল প্রকল্পের দুটি টার্মিনালে বিদেশি দুটি কোম্পানি মোট ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ (এফডিআই) করবে।
তার ভাষ্যে, “এখানে যেই দুইটি পোর্ট অপারেটরের কথা বলা হচ্ছে, পিএসএ সিঙ্গাপুর, পিএসএ’র খুবই ভালো এক্সপেরিয়েন্স। তারা ওই এক্সপেরিয়েন্সটা নিয়ে আসবে, আমাদের সাথে বেস্ট প্র্যাকটিসগুলা নিয়ে আসবে এবং আমরা এস্টিমেট করছি যে, এই পিএসএ এবং ডিপি ওয়ার্ল্ড রাফলি এক বিলিয়ন ডলার করে এই প্রজেক্টে ইনভেস্ট করবে।
“এক বিলিয়ন, এক বিলিয়ন করলে প্রথম দুইটা টার্মিনালেই আমরা প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার এর মতো একটা ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্টের চেহারা দেখতে পাব। অভিয়াসলি এটা কিন্তু ওভার টাইম হবে। তাই আমরা যদি মনে করি যে, ২০২৬ সালে হঠাৎ করে ১০ বিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট, এভাবে হয় না জিনিসটা। একটু গ্রাজুয়ালি আসবে।”
আশিক চৌধুরী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিডার প্রধানের দায়িত্ব পেলেও তাকে পদে বহাল রেখেছে বিএনপি সরকার।
এর মধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সিঙ্গাপুরের তরফে বে টার্মিনালে যুক্ত হওয়ার আগ্রহের তথ্য মিলল।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, কৃষিপণ্য রপ্তানি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী মুক্তাদীর বলেন, বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আগ্রহী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, উন্নত অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন
