১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

বন্যা: জমানো টাকার ব্যাংক নিয়ে আসছে শিশুরাও

ত্রাণ সংগ্রহকারীরা বলছেন, অনেক রিকশাচালক এবং ভিক্ষুকও তাদের উপার্জনের অংশ দিচ্ছেন; নগদ টাকা না থাকায় এক নারী কানের দুলও খুলে দিয়ে গেছেন।

বন্যা: জমানো টাকার ব্যাংক নিয়ে আসছে শিশুরাও
টিএসসিতে রোববার বন্যার্তদের সহযোগিতায় জমানো টাকা নিয়ে আসে জারির কবির।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Aug 2024, 11:53 PM

Updated : 10 Sep 2026, 12:15 PM

নিজের খেলনা গাড়ি কেনার জন্য পাস্টিকের ব্যাংকে টাকা জমিয়েছিল জারির কবীর, রোববার দুপুরে বাবার সঙ্গে সেই ব্যাংক জমা দিয়ে গেল টিএসসিতে গণত্রাণ সংগ্রহের কেন্দ্রে।

দেশের কয়েকটি জেলায় ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য টেলিভিশনে গণত্রাণ সংগ্রহের খবর দেখে উদ্ধ্বুদ্ধ হয় মিরপুর ইংলিশ ভার্সন স্কুলের প্রথম শ্রেণির এ শিক্ষার্থী। শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ সবাইকে ত্রাণ দিতে দেখে নিজেও বাবার সঙ্গে চলে আসে টিএসসিতে।

জারিরের বাবা ব্যবসায়ী রেজা কবীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ছেলে টিভিতে দেখছিল আরও অনেক বাচ্চা এখানে কন্ট্রিবিউট করছে। এটা দেখে সেও অনুপ্রাণিত হয়েছে।

“বাচ্চাদের এই সেন্স দেখে আমি অবাক হয়েছি। ভাবছি আমাদের সন্তানরা সঠিক পথেই রয়েছে। তারা ভালো কিছু শিখছে।”

দেশের পূর্বাঞ্চলের বন্যাকবলিত মানুষকে সহযোগিতা করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে রোববার চতুর্থ দিনের মত গণত্রাণ সংগ্রহ করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

সেখানে নগদ অর্থসহ শুকনা খাবার, পানি, জামাকাপড়, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে আসছেন অসংখ্য মানুষ। সঙ্গে শিশুসহ অনককেই প্লাস্টিক ও মাটির ব্যাংকে জমানো টাকা নিয়ে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে।

রোববার এক ব্যাগ পয়সা নিয়ে মায়ের সঙ্গে টিএসসিতে এসেছিল উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিফ জিয়া ওয়াফি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে ওয়াফি বলে, “আমি চাই, আমার কয়েনগুলোর মাধ্যমে বন্যায় আক্রান্তদের হেল্প হোক। যাতে তারাও ভালোভাবে বাঁচতে পারে।”

ওয়াফির মা আফরোজা বেগমের ভাষ্য, “ও খেলনা কেনার জন্য টাকাগুলো জমাচ্ছিল। খেলনা তো যেকোনো সময় কেনা যাবে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষগুলোকে তো আগে বাঁচাতে হবে।

“এ দুর্যোগে পুরো বাংলাদেশ যেভাবে সাড়া দিয়েছে, এটা অভূতপূর্ব। এর থেকে শিশুরা যা শিখছে, এটা সারাজীবন থেকে যাবে।”

ত্রাণ সংগ্রহকারীরা জানান, শুধু শিশুরাই নয়, অনেক রিকশা চালক ও ভিক্ষুকও তাদের সারা দিনের উপার্জনের টাকা টিএসসিতে জমা দিয়েছেন। নগদ অর্থ না থাকায় রোববার এক নারী তার কানের দুল খুলে দিয়েও বন্যার্তদের সহযোগিতা করেন।

টিএসসিতে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া।

তিনি বলেন, “আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ বছর ধরে চাকরি করি। কখনও এমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেখিনি যে, মানুষ ত্রাণ নিয়ে জোয়ারের মত আসছে। এমন বাংলাদেশই চেয়েছিলাম আমরা।”

উজানের ঢল ও ভারি বর্ষণে গত কয়েকদিন ধরে ভাসছে ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার। এর মধ্যে ফেনীতে সবথেকে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বন্যার্তদের জন্য টিএসসিসহ সারা দেশেই বিভিন্ন উদ্যোগে ত্রাণ ও খাবার সংগ্রহ চলছে।

টিএসসিতে অর্থ সংগ্রহে যুক্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহ-সমন্বয়ক কুররাতুল আইন কানিজ বলেন, “আমরা কল্পনাও করেনি মানুষ এভাবে ত্রাণ নিয়ে আসবে। বাচ্চারা কেউ তাদের সাইকেল কেনার টাকা, খেলনা কেনার জমানো টাকা নিয়ে আসছে।

“গতকাল (শনিবার) আমরা দেখেছি, যারা ভিক্ষা করে টাকা জমা করেন, তারাও টাকা দিয়ে গেছে। একজন রিকশাচালক তার সারা দিনের উপার্জনের টাকা দিয়ে গেছেন।”

কানিজের ভাষ্য, “আজকে (রোববার) একজন আপু একটি টিস্যুতে মুড়িয়ে তার কানের স্বর্ণের দুল আমাদের এখানে দিয়ে গেছেন। তিনি নাম পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। আপুর কাছে টাকা ছিল না। কিন্তু, কানের দুল তিনি বন্যার্তদের জন্য দিয়ে গেছেন। কানের দুল ছোটটা না, ব্শে বড় কানের দুলগুলো। অ্যামাউন্ট অনেক হবে।

“আমরা আসলে এই দেশ নিয়ে খুবই আশাবাদী। বাচ্চারা তাদের মাটির ব্যাংক, প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা টাকা দিয়ে যাচ্ছে। এগুলো দেখে আমরা আবেগ ধরে রাখতে পারছি না। নিজের অজান্তে চোখের কোণায় পানি চলে এসেছে।”

টিএসসিতে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ত্রাণসামগ্রী জমা নেওয়া হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রে। তবে কেউ নগদ অর্থ ও জরুরি ওষুধ দিতে চাইলে তা দেওয়া যাবে টিএসসির ফটকে স্থাপিত বুথে। রাত ৮টা পর্যন্ত সেখানে ত্রাণ সংগ্রহ চলবে।

দেশের পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠায় বৃহস্পতিবার থেকে টিএসসিতে ত্রাণ সংগ্রহ করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এরপর এত মানুষ ত্রাণসামগ্রী নিয়ে এসেছিলেন যে, শনিবার সন্ধ্যার পর টিএসসিতে ত্রাণ রাখার আর জায়গা হচ্ছিল না। পরে রাতেই ত্রাণ সংগ্রহের ভেন্যু পরিবর্তন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রে নেওয়া হয়।

চার দিনে সংগ্রহ ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গণত্রাণ সংগ্রহ করছে বৃহস্পতিবার থেকে। আন্দোলনের মিডিয়া উইংয়ের সমন্বয়ক রেজওয়ান আহমেদ রিফাত জানান, রোববার বিকাল ৫টা পর্যন্ত তাদের মোট অর্থ সংগ্রহ হয়েছে ৫ কোটি ২৩ লাখ ৩ হাজার ৬ শত ৩ টাকা।

এর মধ্যে নগদ অর্থ ৪ কোটি ৩৯ লক্ষ ১ হাজার ৬ শত ৯০ টাকা, মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে ৬২ লাখ ৯৪ হাজার ১২০ টাকা। ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে ২১ লাখ ৭ হাজার ৭ শত ৯৩ টাকা।

সংগ্রহ করা অর্থ থেকে মোট ব্যয় হয়েছে ৩০ লাখ ১২ হাজার ৯শত ৭০টাকা। এর মধ্যে খেজুর বাবদ ১৫ লাখ ৭৮ হাজার ৯ শত টাকা, মুড়িবাবদ ৪ লাখ ৩০০ টাকা, বিস্কুট বাবদ ২ লাখ ১ হাজার ৫০ টাকা, গুড় বাবদ ২ লাখ ৫২ হাজার ৮৪০ টাকা, দুপুর ও রাতের খাবার বাবদ ৩৯ হাজার টাকা; দড়ি, কাটার ও কলম বাবদ ৭৩০ টাকা, গাড়ির সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক বাবদ ৮ হাজার টাকা, রিকশাভাড়া বাবদ ৬৫০ টাকা, পলিথিন বাবদ ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা, বস্তা বাবদ ৯ হাজার টাকা, নামসহ বস্তা বাবদ ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা ও চিনি বাবদ খরচ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

মালামাল ভরে মোট ৫০টি ট্রাকে ৪০ থেকে ৫০ হাজার ত্রাণ প্যাকেট বন্যার্ত অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ৩ হাজার প্যাকেট বাংলাদেশে বিমান বাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে হেলিকপ্টার যোগে বন্যাকবলিত দুর্গম অঞ্চলগুলোতে বণ্টন করা হয়েছে এবং ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।