Published : 08 May 2026, 10:07 PM
অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা স্ট্রিমের’ কর্মী স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের আত্মহত্যার ‘কারণ স্পষ্ট’ জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার পর তারই এক সহকর্মীর বিরুদ্ধে ওঠা ‘যৌন নিপীড়নের অভিযোগ’ নিয়ে ব্যপক আলোচনা হলেও পুলিশ বলছে, পরিবারের সঙ্গে ‘গভীর অভিমান করে’ আত্মহত্যা করেছেন স্বর্ণময়ী।
এ বিষয়ে তার স্বজনদের ‘কোনো সন্দেহ না থাকায়’ অন্য কোনো বিষয় তদন্ত করার প্রয়োজন মনে করেননি তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. সাইফুল ইসলাম।
স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর ঘটনায় গেল বছরের ১৯ অক্টোবর ওই থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছিল, যার তদন্ত শেষে গত ১৪ এপ্রিল ‘চূড়ান্ত প্রতিবেদন’ দেওয়া হয়।
এসআই সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমরা তার একটা চিরকুট পেয়েছি। স্পষ্টভাবেই বলা চলে ফ্যামিলির প্রতি অভিমান থেকে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।”
তাছাড়া পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ঘটনার পর ব্যপক আলোচনা চললেও পরিবারের তরফে ‘আত্মহত্যার প্ররোচনার’ অভিযোগ আনা হয়নি।
তদন্ত কর্মকর্তা সাইফুল বলেন, “আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা হলে বা কারো প্ররোচনা ছিল, এমন অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করতাম। এখানে আত্মহত্যার কারণটা স্পষ্ট।”
গতবছর ১৮ অক্টোবর রাতে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতাল থেকে স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের লাশ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল পুলিশ।
তখন প্রাথমিকভাবে ২৮ বছর বয়সী ওই তরুণী আত্মহত্যা করেছেন বলে স্বজন ও পুলিশের ধারণা করেছিলেন। প্রায় ৬ মাসের তদন্ত শেষে পুলিশ প্রতিবেদনে বলেছে, ‘পরিবারের সঙ্গে অভিমানের জেরে আত্মহত্যা করেছেন’ তিনি।
স্বর্ণময়ীর বড়ভাই সৌরভ বিশ্বাস থানায় গিয়ে ঘটনার খবর দেন। এরপর সে অনুযায়ী পরদিন তার সোবহানবাগের বাসা পরিদর্শন করে পুলিশ।
তখন ভাই সৌরভের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার আগের বিস্তারিত বিবরণের সঙ্গে পুলিশের তদন্তেও হুবহু ওঠে এসেছে।
দুই ভাই বোনের মধ্যে স্বর্ণময়ী বিশ্বাস ছিলেন ছোট। বড় ভাই সৌরভ বিশ্বাস ও তার স্ত্রী তটিনী চৌধুরীসহ বাবা-মায়ের সঙ্গে সোবহানবাগের বাসায় থাকতেন তিনি।
পুলিশ প্রতিবেদনে বলেছে, দুর্গা পূজা চলে আসায় স্বর্ণময়ীর বাবা-মা ২৫ সেপ্টেম্বর গ্রামের বাড়ি চলে যান। ঘটনার দিন সকাল থেকে স্বর্ণময়ী ‘অস্বাভাবিক আচরণ’ করলে তার ভাই তাদের বাবা মাকে জানিয়েছিলেন এবং ঢাকায় ফেরার কথা বলেছিলেন। কিন্তু স্বর্ণময়ী বাবা-মাকে বাসায় ফিরতে ‘নিষেধ করেন’।
ঘটনার দিন সকালে তিনি তার কক্ষে ‘সকলের অজান্তে’ ব্লেড দিয়ে নিজের বাম হাতের কনুই একাধিক জায়গায় কেটে জখম করেন। এর মধ্যে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তার জেঠিমা কল্পনা রানী সিকদার ও তার ছেলে দিব্য তাদের বাসায় যান।
“বাসার জেঠিমা চলে আসায় স্বর্ণময়ী রক্তাক্ত হাত কাপড় দিয়ে ঢেকে সবার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন এবং কতাবার্তা বলতে থাকেন। এক পর্যায়ে কল্পনা রানী সিকদার স্বর্ণময়ীর প্যান্টে রক্তের দাগ দেখতে পান।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে স্বর্ণময়ী তার পোশাক পরিবর্তন করার কথা বলে বিকেল ৫টার দিকে তার কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। এরপর নিজের ব্যবহৃত ওড়না দিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দেন তিনি।
দরজা অনেকক্ষণ বন্ধ থাকার পর সবার ডাকাডাকিতে ‘সাড়া না পেয়ে’ ভাই সৌরভ দ্বিতীয় চাবি এনে দরজা খুলে স্বর্ণময়ীকে ফাঁস দেওয়া অবস্থায় দেখতে পান।
“সবাই ধরাধরি করে তাকে বাসার নিচে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য পপুলার হাসপাতাল ধানমন্ডিতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।”
সেখানে যাওয়ার পর কর্তব্যরত ডাক্তার পৌনে ৮টার দিকে স্বর্ণময়ীকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর পুলিশ গিয়ে সুরতহাল রিপোর্ট করে রাত সাড়ে ৩টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঠায়।
পরদিন স্বর্ণময়ীর কক্ষ থেকে একটি রক্তমাখা ব্লেড, রক্তমাখা প্রিন্টের ওড়না, একটি নোট যুক এবং একটি ডায়েরি উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ।
নোটবুকের দ্বিতীয় পাতায় স্বর্ণময়ীর নিজের হাতের একটি লেখা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে পুলিশ।
যেখানে বলা হয়েছে, “সবাই এটাই ভাবছে, আমার হইতে এটা আশা করেনি, মজার ব্যাপার হল, আমি নিজেও আশা করিনি। কী লিখব বুঝতে পারছি না। মাথার মধ্যে শুধু অভিমান। আর অনেকগুলো প্রশ্ন, যার উত্তর কারো কাছে নেই। চলে যাওয়ার প্লান করেছি অনেক দিন আগে।
“মাঝে দাদা ভাইয়ের বিয়ে বেধে গেল। এতো বাধার মধ্যে আমি বাধা হইতে চাইলাম না। তাই শেষ বারের মত তোমাদেরকে একটু গুছিয়ে দিয়ে গেলাম। আমি না থাকলে তোমাদের এখন দিব্যি চলবে। বরং আমি থাকলেই জ্বালা। আমি যাদের উপর খুব ভরসা করেছিলাম, তারা খুব নড়বড়ে। কিন্তু আমি ভেবেছি শক্ত।”
সেখানে স্বর্ণময়ী লিখেছেন, “মা দাদা ভাই ছাড়া কোনোদিন কিছু চিনলই না। মা আমার মুখের উপরই বলে, তোমাকে নিয়ে আমি ভাবি না। আমার ছেলেকে নিয়ে যত চিন্তা। কেন? মা আমাকে নিয়ে শুধুমাত্র এটা ভাবে যে, আমার জন্য তার ঘাড়ে যেন কোনো দোষ না চাপে। মায়ের জগতে তার ছেলে বাপি আর মানুষ। ঐ জগতে আমি কোথাও ছিলাম না। ছিলাম শুধু দায়িত্ব হয়ে। সবার দায়িত্ব।”
প্রতিবেদনে পুলিশ বলছে, বিভিন্ন আলামতের পুলিশি পরীক্ষায় ‘সন্দেহজনক’ কিছু পাওয়া যায়নি। মামলাটি তদন্তকারী কর্মকর্তা ‘গোপনে, প্রকাশ্যে ও সরেজমিনে তথা সার্বিকভাবে নিবিড় ও ব্যপক তদন্ত’ করেছেন।
সে অনুযায়ী সুরতহাল রিপোর্ট, ভিসেরা রিপোর্ট, ডিএনএ রিপোর্ট ও ময়না তদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনায় এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় স্বর্ণময়ী বিশ্বাস ‘গভীর অভিমান করে’ আত্মহত্যা করেছেন বলেই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে পুলিশ।
তদন্তের ফলাফল স্বর্ণময়ীর পরিবারকে জানানোর পর তাদের তরফে কোন ‘সন্দেহ না থাকায়’ কর্মকর্তা প্রতিবেদনটি দাখিল করেছেন।