Published : 15 Jul 2025, 09:35 PM
গেল ছয় মাসে ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতায়’ হতাহতের যে তথ্য বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ও সংখ্যালঘু ঐক্য মোর্চা দিয়েছে, তার সঙ্গে দ্বিমত জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশ বলছে, একটি ঘটনাও ‘সাম্প্রদায়িক কারণে’ ঘটেনি।
সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে ‘রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে অস্বীকার করা’ এবং অপরাধীদের ‘দায়মুক্তির’ কথা বলা হলেও পুলিশ সদর দপ্তরের দাবি, প্রত্যেকটি ঘটনা ‘আন্তরিকতা ও গুরুত্বের’ সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এসে গত ছয় মাসে ‘সাম্প্রদায়িক কারণে’ ২৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য দেয় সংগঠন দুটি। গত ১১ মাসে ২ হাজার ৪৪২টি সাম্প্রদায়িক হামলা ও সহিংসতা ঘটেছে বলেও দাবি করে তারা।
তাদের এসব দাবির বিষয়ে মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তর এক বিবৃতিতে বলে, “২৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনার মধ্যে ২২টিতে হত্যা মামলা এবং ৫টিতে অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।”
হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে পুলিশ বলছে, জায়গাজমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুজন, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত ঘটনায় দুজন, ডাকাতি বা দস্যুতার ঘটনায় সাতজন, সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য ‘সন্দেহে’ প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের গুলিতে একজন, তরমুজ ক্রয়-বিক্রয়কে কেন্দ্র করে মারামারিতে একজন এবং গলায় ‘ফাঁস নিয়ে’ ৩ জন আত্মহত্যা করেছেন।
বাকি ১১ জনের মধ্যে কেউ ভবঘুরে, কেউ জুম চাষে গিয়ে, কেউ তামাক ক্ষেত থেকে পাতা কুড়াতে গিয়ে মারা গেছেন বলে পুলিশের পক্ষে থেকে বলা হয়েছে।
এসব হত্যাকাণ্ডে ৪৮ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়ে পুলিশ বলছে, ১৫ জন আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন এবং ১৮ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
“কোনো হত্যাকাণ্ডই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা সাম্প্রদায়িকতার কারণে সংঘটিত হয়নি বলে তদন্তে পাওয়া যাচ্ছে।”
সংগঠন দুটি যৌন হয়রানি, ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ২০টি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে।
পুলিশ বলছে, ২০টি ঘটনার মধ্যে ১৬টিতে মামলা এবং ২৫ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনটি ঘটনায় কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, “রাজশাহীর তানোরে আদিবাসী নারী ধর্ষণের সত্যতা পাওয়া যায়নি। অভিযুক্তের সঙ্গে ভুক্তভোগীর পারিবারিক দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানা গেছে।
“মাগুরার শ্রীপুর হরিনন্দীগ্রামে কিশোর কুমার রায়ের বাড়িতে ডাকাতির পর সহধর্মিণীকে গণধর্ষণের ঘটনায় কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি এবং ঘটনাটি পুলিশ তদন্ত করে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পায়নি।”
সংগঠন দুটির হিসাবে, গেল বছরের ৪ অগাস্ট থেকে ২০ অগাস্ট পর্যন্ত ‘সবচেয়ে বেশি’ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
তারা ২ হাজার ১০টির মধ্যে ১ হাজার ৭৬৯ টি ‘সাম্প্রদায়িক হামলা’ বলে যে দাবি করেছে, তার সঙ্গেও দ্বিমত জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
বার্তায় বলা হয়েছে, “পুলিশ ১ হাজার ৭৬৯ ঘটনা যাচাই-বাছাই করে ৫৬টি জেলায় ১ হাজার ৪৫৭টি ঘটনার সত্যতা পায়। এর মধ্যে মোট ৬২টি ঘটনায় মামলা হয় এবং ৯৫১ টি ঘটনায় জিডি হয়। ৬২ ঘটনায় ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
“তদন্তে দেখা যায়, ১ হাজার ৭৬৯ টি ঘটনার মধ্যে ১ হাজার ৪৫২ টি ঘটনা (৮২.৮ শতাংশ) ৫ অগাস্ট সংগঠিত হয়, যার ১ হাজার ২৩৪টি ঘটনা রাজনৈতিক বিরোধ সংক্রান্ত। ১৬১টি ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি।”
৫ অগাস্ট থেকে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত পূজা মণ্ডপ বা উপাসনালয়ে ১২৭টি সহিংসতার ঘটনার সংবাদ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৬৬টি ঘটনায় মামলা এবং ৬১টি ঘটনায় জিডি করা হয়। এসব মামলায় মোট ৬৪ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
সংবাদ সম্মেলনে মন্দির বা পারিবারিক মন্দিরে চুরি, প্রতিমা, মন্দির, পারিবারিক মন্দিরে ভাঙচুর, অগ্নি-সংযোগ, জমি দখল, উচ্ছেদ, উচ্ছেদের চেষ্টা সংক্রান্ত মোট ৬০টি ঘটনার অভিযোগ করা হয়।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, তারা ২০টি চুরির ঘটনার সংবাদ পেয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি নিয়মিত মামলা হয় এবং পাঁচটি ঘটনায় জিডি হয়।
পুলিশের বিবৃতির বিষয়ে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তারা বলতে চাচ্ছে ঘটনাগুলো অসত্য নয়, কিন্তু সেগুলো সাম্প্রদায়িক ঘটনা নয়, ন্যাচারাল ঘটনা। তবে আমরা দৃঢ়ভাবে বলছি, এসব সম্পূর্ণরূপে সাম্প্রদায়িক ঘটনা।”
তার মতে, এসব ঘটনায় সরকারের ‘দৃষ্টি’ দেওয়া দরকার। জড়িতদের বিচারের আওতায় ‘আনা উচিত’। অন্যথায় সংখ্যালঘুদের জনজীবন ‘বিপন্ন’ হবে।