Published : 11 Apr 2026, 10:59 PM
রাজধানীর হাজারীবাগের এক মাদ্রাসায় এক ছাত্রকে ‘ধর্ষণের’ অভিযোগে তার শিক্ষক ও এক কিশোরের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পর এখন আর মামলা চালাতে চাইছে না পরিবার।
অভিযোগের সত্যতা পেয়ে পুলিশ ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে। মামলাটি এখন অভিযোগ গঠনের শুনানির পর্যায়ে রয়েছে।
কিন্তু শিশুটির বাবা এখন বলছেন, মাদ্রাসা শিক্ষক ওমর ফারুক তাদের কাছে কৃতকর্মের জন্য ‘ক্ষমা’ চেয়েছেন। তাই তারা ‘আপস’ এর মাধ্যমে আর মামলাটি তারা চালাতে চাচ্ছেন না, যদিও ধর্ষণের মামলা আপসযোগ্য নয়।
হাজারীবাগের নীলাম্বর সাহা রোডের মারকাযুদ্দিন ইনস্টিটিউট মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ওই ছাত্রকে ‘ধর্ষণের’ অভিযোগ এনে গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষক ওমর ফারুক এবং প্রতিষ্ঠানটির আরেক কিশোর শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেন শিশুটির বাবা।
অভিযোগ তদন্ত করে গত ২৮ মার্চ দুই আসামির বিরুদ্ধে পৃথক দুটি প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা হাজারীবাগ থানার এসআই মাসুদ রানা।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগের ‘সত্যতা পাওয়ায়’ প্রাপ্তবয়স্ক আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র এবং ১৮ বছরের কম বয়সী এক কিশোর আসামির বিরুদ্ধে দোষীপত্র দাখিল করেছেন তিনি।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ৯ বছরের শিশুটি হাজারীবাগের নীলাম্বর সাহা রোডের ওই মাদ্রাসায় অনাবাসিক ছাত্র হিসেবে পড়াশোনা করছিল। মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকে শিক্ষক ওমর ফারুক বিভিন্ন সময়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করেন। বিষয়টি জেনে ওমর ফারুকের অজান্তে ওই মাদ্রাসার ছাত্র আরেক কিশোরও একবার শিশুটিকে ধর্ষণ করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সর্বশেষ গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর সকালে ওমর ফারুক শিশুটিকে ধর্ষণ করেন। শিশুটি এ ঘটনা ৬ সেপ্টেম্বর তার পরিবারকে জানায়। পরদিন মাদ্রাসায় গিয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় শিক্ষক ওমর ফারুক ও ওই কিশোরকে আটক করে পরিবার। পরে তাদের পুলিশে সোপর্দ এবং মামলা করা হয়।
প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই ইলা মনি বলেন, গত মঙ্গলবার মামলার শুনানির ধার্য দিন ছিল। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ছিদ্দিক আজাদ প্রতিবেদন দুটি দেখেছেন। বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় ওমর ফারুকের মামলাটি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এ এবং কিশোর আসামির মামলাটি শিশু আদালতে পাঠিয়েছেন। সেখানে তাদের বিচার হবে।
এদিকে শিক্ষক ওমর ফারুক ক্ষমা চাইলেও ছেলের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনা এখনো মানতে পারছেন ভুক্তভোগী শিশুটির মা। তিনি বলছেন, মাদ্রাসা শিক্ষক ওমর ফারুক ক্ষমা চাওয়ায় তার কথা ফেলতে পারেননি। এ জন্য তিনি তাকে ক্ষমা করেছেন।
ভুক্তভোগী শিশুটির মা বলেন, “ওই ঘটনার পর থেকে আমার ছেলেটা কেমন যেন হয়ে গেছে। রুক্ষ ভাব। আমার সুন্দর ছেলেটা চিন্তায় চিন্তায় চোখের নিচে কালো করে ফেলেছে। মেয়েরা এমন নির্যাতনের শিকার হয় শুনেছি। কিন্তু আমার ছেলের সাথেই এটা ঘটে গেছে। আমি মা, বিষয়টা বুঝতেও পারিনি। ঘটনাটা শোনার পর আমার খুব আফসোস হয়।
“এ কারণে আমার ছেলেটা মাদ্রাসায় যেতে চাইত না। আমি জোর করে পাঠাতাম।”
তিনি বলেন, “আমরা গরীব মানুষ, মামলা মোকদ্দমা পছন্দ করি না। ঝামেলামুক্ত জীবন চাই। আমার ছেলের সাথে মাদ্রাসার যে শিক্ষক এমনটা করেছে, তার গোটা পরিবার এলাকার মাধ্যমে মাফ চাইছে। আমরা মাফ করে দিয়েছি।”
কিশোর আসামির বিষয়ে তার ভাষ্য, “ও বিষয়টা জানতো, কিন্তু আমাদের বলেনি। বরং সুযোগ নিয়ে ও আমার ছেলের সঙ্গে এমন কাজটা করেছে।”
শিশুটির মা আরো বলেন, “আমি কাজ করে খাই; কোর্টে দৌড়াতে ভালো লাগে না। আমরা দৌড়ালাম, অথচ দেখা যাবে টাকা খরচ করে ঠিকই আসামিরা কারাগার থেকে তারা বের হয়ে যাবে। উপরে তো আল্লাহ আছেন। তার কাছে তো জবাব দিতেই হবে।”
ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে আসামির ‘আপসের’ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাসুদ রানা বলেন, “আপস করলে কোর্টের মাধ্যমে করবে। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা তদন্ত করে প্রতিবেদন আদালতে দিয়েছি।”
আসামি ওমর ফারুকের আইনজীবী বশির উল্লাহ বলেন, “মানবিক গ্রাউন্ডে মামলাটার আপস চলমান। আসামি একজন হুজুর। দীর্ঘদিন বাচ্চাটাকে পড়িয়েছে। এ জন্য তার পরিবার আপস করতে রাজি হয়েছে। যদিও মামলা আপসযোগ্য না। দেখা যাক, কী হয়।”
কিশোর আসামির আইনজীবী কাউসার মিয়া বলেন, “ঈদের আগে সে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছে। প্রধান আসামির সঙ্গে বাদীর মামলার বিষয়ে আপোস চলছে। সে ক্ষেত্রে আমরাও সুবিধা পাব।”