১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও মূল্যস্ফীতি তেমন বাড়বে না: সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী

মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানির ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 20 Apr 2026, 06:54 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:27 PM

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, সংসদে এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেছেন, এতে মূল্যস্ফীতি ‘সেভাবে বাড়বে না’।

তার ভাষ্য, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম হারে বাড়ানো হয়েছে; উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের হিসাবে এর প্রভাবও সীমিত।

সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়।

রুমিন ফারহানা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রসঙ্গ টেনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের করণীয় জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী মুক্তাদীর বলেন, “প্রথম কথা হলো মূল্যস্ফীতি সেভাবে বৃদ্ধি পাবে না কেন? এটা একটু বোঝা দরকার।”

তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম যে হারে বেড়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশের দাম বাড়ানো হয়েছে ‘নিতান্তই মডেস্ট’ পর্যায়ে।

মন্ত্রী সংসদে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যভেদে করের পার্থক্যের কারণে যুদ্ধ শুরুর আগে অনেক জায়গায় প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম ২ ডলার ৭০ থেকে ৮০ সেন্ট ছিল, তা পরে ৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

তিনি বলেন, “আশেপাশের যেকোনো দেশ অথবা বাংলাদেশের সাথে কম্পেয়ারেবল যেকোনো ইকোনমির তুলনা যদি করেন, তাহলে তুলনামূলকভাবে জ্বালানি পেট্রোলিয়াম পণ্যের মূল্য প্রত্যেকটা দেশে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।”

বাংলাদেশে ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, একটি শিল্পকারখানার মোট উৎপাদন ব্যয়ের ৭ থেকে ৮ শতাংশ জ্বালানির পেছনে যায়। সে হিসাবে ডিজেলের ১৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি মোট উৎপাদন ব্যয়ে সীমিত প্রভাব ফেলে।

পরিবহন ব্যয়ের উদাহরণ দিয়ে মুক্তাদীর বলেন, “২০০ কিলোমিটার একটা বাস রান করার জন্য তার কমবেশি ২৫-৩০ লিটার এর মত ডিজেল লাগে। এই ৩০ লিটার ডিজেলের ক্ষেত্রে ৪৫০ টাকার মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে।”

একইভাবে পণ্য পরিবহনে ৩০ লিটার ডিজেলের বাড়তি ব্যয় ১০ হাজার কেজি পণ্যের ওপর ভাগ হয়ে যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা যদি পরিবাহিত পণ্যের ইউনিটের ভিত্তিতে হিসাব করি, তাহলে সেই বৃদ্ধিটা মূল্যস্ফীতির জন্য ওইরকম উদ্দীপক কিছু না।”

তিনি এও বলেন, “পৃথিবীর সব দেশ যে নীতিটা নিয়েছে, আমরা সেই নীতি মডেস্টলি নিয়েছি এবং মূল্য বৃদ্ধি করেছি। খুবই একটা মডারেট মূল্য বৃদ্ধি করেছি।”

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে চাপ রপ্তানিতে

পাবনা-৫ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী মুক্তাদীর বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতায় বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে, পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে রেমিটেন্সেও প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সারা বিশ্ব যেহেতু এই সম্ভাব্য প্রভাবের আওতাধীন; বাংলাদেশ তো নিশ্চয়ই তার ব্যতিক্রম নয়।”

মন্ত্রী জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও ওমানের বাজারে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, ওষুধ, হিমায়িত খাদ্য ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়।

চলমান অস্থিরতার কারণে জ্বালানির দাম, আমদানি ব্যয়, শিপিং ও বীমা খরচ বেড়েছে জানিয়ে খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানির ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। 

“একইভাবে এটি যদি দীর্ঘদিন প্রলম্বিত হয়, তাহলে রেমিটেন্সের উপরও চাপ তৈরির সম্ভাবনা আছে।”

সংকট মোকাবেলায় সরকার নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, লজিস্টিক ব্যয় কমানো, বন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশে কাজ করা এবং যুদ্ধসংশ্লিষ্ট এলাকার বাইরে নতুন বাজার খোঁজার উদ্যোগ চলছে।

তিনি বলেন, বিশ্বে গড়ে লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির ১০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা ১৬ শতাংশ।

সার্কে বাণিজ্য ঘাটতি বেশি ভারতের সঙ্গে

ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর জানান, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ছাড়া অন্য সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ভারতের সঙ্গে এই ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, ৭ হাজার ৮৬০ মিলিয়ন ডলার।

এ ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে ৬৮১ মিলিয়ন, আফগানিস্তানের সঙ্গে ১০ দশমিক ৭১ মিলিয়ন এবং ভুটানের সঙ্গে ২৯ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে।

অন্যদিকে নেপালের সঙ্গে ২৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ও মালদ্বীপের সঙ্গে ২ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।

পাঁচ বছরে রপ্তানির ওঠানামার চিত্র

কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী মুক্তাদীর জানান, গত পাঁচ অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের তথ্যও সংসদে দেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ৪৫ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬০ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৩ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫১ দশমিক ১১ বিলিয়ন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৫ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার।

‘যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শ্রমবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে’

প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাব দেন।

কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০২৫ সালে কুড়িগ্রাম থেকে ৫ হাজার ৮৬২ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। উত্তরাঞ্চল বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়ে রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শ্রমবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুলের প্রশ্নের জবাবে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, যোগ্য প্রার্থীর নাম চাকরির তালিকায় ওঠার পর দুই বছরের মধ্যে চাকরি না হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। এ নিয়ম শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, আরও ১৬টি প্রতিযোগী দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

তিনি এও বলেন, সংঘাতের কারণে যেসব দেশে কর্মীরা যেতে পারেননি, সেসব দেশের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ করে অনেক ক্ষেত্রে ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য আফজাল হোসেনের প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশগামী কর্মীদের সঙ্গে প্রতারণা প্রমাণিত হলে এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের বিধান রয়েছে। 

তবে লিখিত অভিযোগ কম আসে বলেও তিনি খেদ প্রকাশ করেন।