Published : 24 Nov 2025, 12:48 AM
অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, যিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে।
আর ওই থানার পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলী পিস্তল দিয়ে সাবেক এ সেনা কর্মকর্তার শরীরের ওপরের দিকে চারটি গুলি করেছেন বলে রায়ে বলা হয়েছে।
বাংলায় লেখা ৩৭৮ পৃষ্ঠার এ রায় রোববার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান। এতে একমত পোষণ করেছেন অপর বিচারপতি মো. সগীর হোসেন।
এ হত্যা মামলায় প্রদীপ কুমার দাশ ও মো. লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ছয় আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে গত ২ জুন রায় দেয় বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের হাই কোর্ট বেঞ্চ।
রায়ে বলা হয়, “সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি প্রদীপ কুমার দাশ আলোচ্য হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড, পরিকল্পনাকারী ও ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সে ভিকটিম মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের বুকের বাম পাঁজরে জুতা পরা পা দিয়ে জোরে আঘাত করে তার বুকের দুটি হাড় ভাঙাসহ ভিকটিমের গলার বাম পাশে জুতা পরা পা দিয়ে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে, যা প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যসহ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে প্রমাণিত।”

সাবেক পরিদর্শক লিয়াকত আলী পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তার হাতে থাকা সরকারি পিস্তল দিয়ে সিনহার শরীরের উপরের অংশে পরপর চারটি গুলি করেন বলেও রায়ে তুলে ধরা হয়।
রায়ে বলা হয়, প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষ্য, দণ্ডপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট আসামিদের অপরাধ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও শক্তিশালী পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য পর্যালোচনান্তে প্রমাণিত হয়েছে যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর আসামি লিয়াকত আলী পূর্বপরিকল্পনা মতে ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে নিরস্ত্র ভিকটিম সিনহা মো. রাশেদ খানকে হত্যার উদ্দেশে তার হাতে থাকা সরকারি পিস্তল দিয়ে ভিকটিমের শরীরের ঊর্ধ্বাংশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পরপর চারটি গুলি করেছে এবং ওই গুলির আঘাতে ভিকটিমের মৃত্যু হয়েছে বলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
“যেহেতু আসামি প্রদীপ কুমার দাশ আলোচ্য হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী এবং ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে ভিটকিম মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের বুকে আঘাত করে বুকের দুইটি হাড় ভাঙাসহ গলার বাম পার্শ্বে পা দিয়ে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে এবং অপর আসামি লিয়াকত আলী পূর্বপরিকল্পনা মতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে ভিকটিমের উপর পরপর চারটি গুলি করেছে এবং এই গুলির আঘাতেই মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের মৃত্যু হয়েছে বলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেহেতু আসামি প্রদীপ কুমার দাশ ও লিয়াকত আলীকে বিচারিক আদালত সঠিকভাবে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় উল্লেখিত সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন।”

হাই কোর্টের রায়ে ছয় আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। তারা হলেন- সাবেক এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল রুবেল শর্মা ও সাগর দেব, কক্সবাজারের বাহারছড়ার মারিশবুনিয়া গ্রামের মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আইয়াজ ও মো. নিজাম উদ্দিন।
তাদের বিষয়ে হাই কোর্টের রায়ে বলা হয়, “এই হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সাধারণ অভিপ্রায়ের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিচারিক আদালত তাদের কৃত অপরাধের ধরন বিচার-বিশ্লেষণ করে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় উল্লিখিত মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন, যা সঠিক ও যুক্তিযুক্ত বলে আমরা মনে করি। সে কারণে রায়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো অবকাশ নেই।”
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রে কর্মরত পরিদর্শক লিয়াকত আলীর গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা।
দেড় বছর পর ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালত এ মামলার রায় দেয়।
রায়ে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স ২০২২ সালে হাই কোর্টে আসে। দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আসামিরা পৃথক জেল আপিল ও আপিল করেন।
এছাড়া বিচারিক আদালতের রায়ে খালাসপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে এবং যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ছয়জনের সাজা বাড়াতে চেয়ে মামলার বাদী ও সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস হাই কোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন।
ডেথ রেফারেন্স গ্রহণ করে, দণ্ডিত আসামিদের জেল আপিল ও আপিল নামঞ্জুর করে এবং বাদীর রিভিশন আবেদনে জারি করা রুল খারিজ করে গত ২ জুন রায় ঘোষণা করে হাই কোর্ট।
মেজর সিনহা হত্যা: হাই কোর্টে আপিল শুনানি শুরু
সেই রাতে যেভাবে খুন হয়েছিলেন সিনহা
সিনহা হত্যায় কার কী দায়, কী সাজা
ওসি প্রদীপ: খুনের সঙ্গে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় ছিল যার ‘নেশা ও পেশা’
সিনহা মো. রাশেদ খান: একজন অভিযাত্রী, যার স্বপ্নের সমাপ্তি পুলিশের গুলিতে
সিনহা হত্যা: প্রদীপ ও লিয়াকতের ফাঁসি, ৬ জনের যাবজ্জীবন
দুর্নীতি: ওসি প্রদীপের ২০, চুমকির ২১ বছরের সাজা, সম্পদ বাজেয়াপ্ত