Published : 10 Aug 2026, 06:44 PM
মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত সারতে ভারতের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
একইসঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফিরিয়ে দিতেও আর্জি জানানো হয়েছে।
সোমবার সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকে এসব অনুরোধ জানানো হয় বলে জানিয়েছেন সরকারপ্রধানের উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বৈঠকে বাংলাদেশ আশা করে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে।
“একই সঙ্গে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হত্যাকারীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও ভারতের প্রতি অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।”
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমাতে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেয়।
ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ঢাকা বারবার তাকে দেশে ফেরত পাঠাতে নয়াদিল্লির প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে।
ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে ভারতে নির্বাসনে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা বলেছেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে।
ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সোমবার প্রথমবারের মত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন
আর গত বছরের ডিসেম্বরে গুলিতে ওসমান হাদি নিহত হওয়ার আড়াই মাস বাদ প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীর হোসেন ধরা পড়েন পশ্চিমবঙ্গে। এরপর থেকে তাদের ফিরিয়ে দিতে অনুরোধ জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ।
এদিন বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সাক্ষাতের সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।
উপ প্রেস সচিব স্বাধীন বলেন, “দুই দেশের দ্বি-পাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দুই দেশের এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।”
শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন জানান, ভারতের নতুন হাই কমিশনারকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী। ঢাকায় গেল দুই মাসের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন ত্রিবেদী।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফিং
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের হাই কমিশনারের বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান পরে মন্ত্রণালয়ে ব্রিফ করেন।
তিনি বলেন, “দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করার বিষয়ে বিষয়টি উঠে এসেছে এবং আমরা তাদেরকে বলেছি এই প্রত্যর্পণ প্রসেস ত্বরান্বিত করার জন্য। আমরা আশা করি ভারত এ ব্যাপারে পজিটিভ সাড়া দেবে।
“এছাড়া শহীদ হাদীর সাসপেক্টেড হত্যাকারীরা আপনারা জানেন ধরা পড়েছে। আমরা ভারত যে সমস্ত কাগজপত্র চেয়েছিল সবই তাদেরকে দিয়েছি। এই বিষয়টা এসেছে। আমাদের জন্য এটাও তো অত্যন্ত একটা সেনসিটিভ বিষয়। এবং আমরা বলেছি এই হত্যাকারীদেরকে যত দ্রুত সম্ভব আমাদের কাছে প্রত্যর্পণ করার জন্য।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট দরকার, সেই ধরনের পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারেও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।”
এক প্রশ্নে খলিলুর রহমান বলেন, “৫ অগাস্টের ব্যাপারে আমাদের যে পজিশন, আমরা ক্লিয়ারলি বলে দিয়েছি। এবং সেটা গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছেন ভারতের কর্তৃপক্ষ, সেটা আমাকে গতকালকেও তারা জানিয়েছেন, আজকেও তারা প্রধানমন্ত্রীকে সেটা বলেছেন।”
সেটা নিয়ে ভারত দুঃখপ্রকাশ করেছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “না দেখুন, এখানে দুঃখপ্রকাশ, সে ধরনের তো নয়। আপনাকে একটা জিনিস ভালো করে বুঝতে হবে—কী হয়েছে জিনিসটা।”
ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গেল ৫ অগাস্ট নয়া দিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে ঢাকা। তবে নয়া দিল্লি বলছে, ওই আয়োজনে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে যা কিছু বলা হয়েছে, তাও সমর্থন করে না সেদেশের সরকার।
ওই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন’ এবং ভারত সেটার ‘সুযোগ করে দিয়েছে’ বলে মনে করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “একটা রাষ্ট্রের তিনটা স্তম্ভ থাকে। নির্বাহী, আইন প্রণয়ন এবং বিচার বিভাগ। দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা, তার জায়গা হচ্ছে জুডিশিয়ারি। বাংলাদেশের একটা কম্পিটেন্ট কোর্ট তার বিচার করেছে, তাকে দণ্ড দিয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিষয়ে কী হয়? তাকে কাস্টডিতে নেওয়া হয় এবং তার যদি কিছু বক্তব্য থাকে, আত্মপক্ষ সমর্থনের কিছু থাকে, সেটা আদালতে বলবে।
"তো ৫ তারিখে হাসিনা যে কাজটি করেছে, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের জুডিশিয়ারির... রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভ, তার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছে। এবং সেই কাজটি ভারত সরকার করতে দিয়েছে।”
রোববার হাই কমিশনারের সঙ্গে নিজের বৈঠকেও এ বিষয়ে কথা হওয়ার কথা তুলে ধরে খলিলুর রহমান বলেন, “সুতরাং এই কথাটাই আমি গতকালকেও বলেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের পুরো কাঠামোর প্রতি আমরা চাই সারা বিশ্বের সকল দেশ শ্রদ্ধাশীল হোক। এবং আমরা আশা করব, আমাদের এই বিষয়টি ভারত সরকার অনুধাবন করবেন।
“আমার ধারণা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে তারা জিনিসটা বুঝতে পেরেছেন। এবং আশা করব যে আমাদের রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভকে আন্ডারমাইন করার কিছু তারা আর করবেন না। এটা আমাদের প্রত্যাশা এবং তাদের সঙ্গে আমার যা কথা হয়েছে, তাতে আমি কিছুটা হলেও আশ্বস্ত যে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।”
সীমান্ত হত্যা ও পুশ ইন নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এগুলো খুব সংক্ষেপে আমরা বলেছি। এগুলো তো প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার নয়, এগুলো আমি গতকালকেই তার সঙ্গে আলাপ করেছি। গতকালকেই তার সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে আলাপ হয়েছে।”