Published : 18 Aug 2026, 08:28 PM
মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অভিযান ঘিরে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আজিজ আহমেদকে গ্রেপ্তার করতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিস’ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোকে (এনসিবি) চিঠি দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, “শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ ও সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ রয়েছেন।
“বেনজীর আহমেদের বিষয়ে এর আগে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির জন্য আবেদন করা হয়েছে। আর আজিজ আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে নিশ্চিত হওয়ার পর সোমবার তাকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের সহায়তা চেয়ে এনসিবির কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।”
২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে অভিযানের সময় আজিজ আহমেদ ছিলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি), মহাপরিচালক। পরে তিনি ২০১৮ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২১ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, কোনো আসামি বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে অবস্থান করছেন বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে একইভাবে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হবে।
“যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে, সেসব দেশে কূটনৈতিক মাধ্যমে প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর যেসব দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি নেই, সেসব ক্ষেত্রে ইন্টারপোলের মাধ্যমে আসামিকে গ্রেপ্তারে সহায়তা চাওয়া হয়।”
এনসিবি ইন্টারপোলের কাছে সরাসরি আবেদন পাঠিয়েছে কি না জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম বলেন, “আজিজ আহমেদের বিষয়ে আবেদনটি সোমবার এনসিবির কাছে দেওয়া হয়েছে। এরপর এনসিবি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”
১৯৬ দেশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলে বাংলাদেশ যোগ দেয় ১৯৭৬ সালে। ইন্টারপোলের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বা তথ্য আদান-প্রদান হয় ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো–এনসিবি’র মাধ্যমে।
প্রত্যেক সদস্য দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যুক্ত থাকে এনসিবির মাধ্যমে। কোনো আসামির বিরুদ্ধে পরোয়ানা থাকলে সেই আসামিকে ধরতে এনসিবির মাধ্যমে রেডি নোটিস জারির অনুরোধ পাঠাতে হয়। প্রত্যেক সদস্য দেশেই এনসিবির দপ্তর রয়েছে। পদাধীকারবলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) এনসিবিরও প্রধান।
শাপলা চত্বরের মামলায় আজিজ
শাহবাগের আন্দোলনের বিপরীতে ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে সমাবেশ ডাকে হেফাজতে ইসলাম। সেদিন সেই সমাবেশ ঘিরে পুরো মতিঝিল এলাকায় ব্যাপক সহিংসতা আর তাণ্ডব চলে। পরে সেই রাতে যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের মতিঝিল থেকে সরানো হয়।
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২০ অগাস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্মমহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী। এর ভিত্তিতে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়।
হেফাজত নেতারা অভিযোগ করে আসছেন, ওই রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। তবে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি এসেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে ৫ ও ৬ মে ঢাকাসহ চার জেলায় ওই অভিযানকে কেন্দ্র করে ৫৮টি হত্যার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
গত ২৭ জুলাই এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে প্রসিকিউশন।
ট্রাইব্যুনাল সেদিন তা আমলে নিয়ে আসামিদের মধ্যে ‘পলাতক’ ৩১ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, তাদের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ একজন।
দুর্নীতির অভিযোগও তদন্তে
শাপলা চত্বরের মামলা ছাড়াও আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দুদক আজিজ আহমেদ এবং তার দুই ভাই হারিস আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ জোসেফের বিরুদ্ধে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগের মধ্যে ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার এবং ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়ম।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে তখন প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে সম্পদ অর্জন এবং মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে অর্থ ও সম্পদ রাখার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের মধ্যে বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পত্তিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের কথাও বলা হয়েছিল।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও আদালতে দেওয়া দুদকের আবেদনে আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে সম্পদ অর্জন এবং ব্যাংক ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে তদন্ত চলার কথা বলা হয়।
একই আবেদনে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে ব্যবসা ও সম্পত্তি কেনার অভিযোগের কথাও ছিল। ওই আবেদনের ভিত্তিতে তার ভাই আনিস আহমেদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বড় ধরনের পদক্ষেপ আসে ২০২৪ সালের মে মাসে।
২০ মে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তাকে ‘উল্লেখযোগ্য দুর্নীতিতে’ জড়িত থাকার অভিযোগে প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, আজিজ আহমেদ সরকারি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে তার এক ভাইকে অপরাধের দায় থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করেছেন।
এ ছাড়া সামরিক ক্রয়চুক্তি অনিয়মিতভাবে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করা এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য সরকারি পদে নিয়োগের বিনিময়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও তোলে যুক্তরাষ্ট্র। নিষেধাজ্ঞার আওতায় তার পরিবারের সদস্যরাও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে অযোগ্য হন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন আজিজ আহমেদ। নিষেধাজ্ঞার পর তিনি বলেছিলেন, তিনি কোনো রাজনীতি বা ব্যবসায় জড়িত নন এবং কেন তাকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে তিনি বিস্মিত।
আলজাজিরার তথ্যচিত্রে কী ছিল
আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বড় একটি অংশ জনসম্মুখে আসে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলজাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ প্রকাশিত হওয়ার পর।
প্রায় দুই বছর ধরে অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তৈরি ওই তথ্যচিত্রে আজিজ আহমেদ, তার কয়েকজন ভাই এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে নানা অভিযোগ তোলা হয়।
আলজাজিরার দাবি ছিল, আজিজের ভাই হারিস আহমেদ ও আনিস আহমেদ ১৯৯৬ সালের একটি হত্যা মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর বিদেশে অবস্থান করছিলেন এবং আজিজ তাদের সুরক্ষা দিতে নিজের প্রভাব খাটিয়েছেন।
তথ্যচিত্রে গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা কথোপকথন ও বিভিন্ন নথির ভিত্তিতে হারিস আহমেদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে অপহরণ এবং ঘুষের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে সামরিক ও সরকারি পদে নিয়োগ এবং ক্রয়চুক্তি ঘিরে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ আনা হয়।
আলজাজিরার অনুসন্ধানে আরও দাবি করা হয়, আজিজ আহমেদ তার এক দণ্ডিত ভাইকে বিচার এড়াতে সহায়তা করেছেন এবং বিদেশে সম্পত্তি ও ব্যবসা গড়ে তুলতে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা করেছেন।
তথ্যচিত্রটি প্রকাশের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘অপপ্রচার’ আখ্যায়িত করে। আজিজ আহমেদও অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা, সাজানো এবং স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ বলেছিলেন।
এনআইডি নিয়েও তদন্ত
আজিজ আহমেদের পরিবারের সদস্যদের পরিচয় ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিয়েও আলাদা তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের জুনে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল জানিয়েছিলেন, আজিজ আহমেদের দুই ভাই হারিস আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ভিন্ন নামে বা ভুল তথ্য দিয়ে এনআইডি নিয়েছেন—এমন অভিযোগ তদন্তে কমিটি করা হয়েছে।
তবে ওই তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে আর কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি নির্বাচন কমিশন।