১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

পল্লবীতে বস্তায় করে ‘অপহরণকে’ যে কারণে নাটক বলছে পুলিশ

চট্টগ্রামে একটি মাছ ধরার জাহাজ থেকে নজরুল ও ভাতিজাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 14 Sep 2026, 11:57 PM

Updated : 17 Sep 2026, 03:00 AM

রাজধানীর পল্লবীতে সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় করে এক ব্যক্তিকে টেনে নেওয়ার সিসিটিভি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ‘অপহরণ আলোচনার’রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ।

ওই ঘটনায় আলোচিত নজরুল ইসলামকে সোমবার চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ বলছে, তিনি নিজেই সেই ‘অপহরণ নাটকের’ হোতা।

এ ‘অপহরণ নাটক’ কেন সাজানো হয়েছে? 

ভিডিওটিতে নজরুল ইসলামকে ‘আর্মি হাসপাতালের প্রকল্প ব্যবস্থাপক’ বলে প্রচার করা হলেও আদতে তিনি পল্লবীতে ‘দ্য স্যালভেশন আর্মির’ যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ ক্লিনিকের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক আহমেদ বলেন, পূর্ণাঙ্গ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে নজরুল ইসলামকে জোর করে তুলে নেওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর প্রেক্ষিতে তদন্তের ধারাবাহিকতায় নজরুলকে তার এক সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সোমবার সকালে কর্ণফুলী নদীতে ‘সি হাট-২’ নামের একটি মাছ ধরার জাহাজ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার আরেকজন ২৬ বছর বয়সি তারেক ওরফে রিপন সম্পর্কে নজরুলের ভাতিজা।

৫০ বছর বয়সি নজরুল ইসলাম টাঙ্গাইলের মধুপুর থানার শুকুর আলীর ছেলে। তিনি প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে রাজধানীর পল্লবীর ওই ক্লিনিকে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে চাকরি করছেন। তিনি রাতের বেলা ক্লিনিকের ফটকের পাশে একটি ছোট টেবিলে বসে দায়িত্ব পালন করেন।

পুলিশ বলছে, গেল বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে নজরুল রাতে নিরাপত্তার দায়িত্বে যোগ দিয়েছিলেন। শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে বদলি নিরাপত্তারক্ষী দানিয়েল সরকার এসে নজরুলকে দায়িত্বে না পেয়ে বিষয়টি প্রকল্প ব্যবস্থাপক বোস এলভিন অথিকে জানান।

পরে প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ভিডিও পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শুক্রবার ভোর ৪টা ৪৭ মিনিটের দিকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় করে কিছু একটা টেনে নিয়ে ক্লিনিকের ফটকের সামনে রাখেন। তখন বস্তার ভেতরে মানুষের নড়াচড়া দেখা যাওয়ায় ‘বস্তায় ভরে নজরুলকে অপহরণ’ বলে প্রচার করা হয়।

পুরো ভিডিও পর্যালোচনা করে পুলিশ বলেছে, প্রায় এক ঘণ্টা পর ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটের দিকে নজরুল নিজেই বস্তা থেকে বের হয়ে আসেন। এর কিছুক্ষণ পর অন্য একজন ব্যক্তির সঙ্গে রিকশায় ওঠে চলে যান।

এ নিয়ে আলোচনার বিষয়টি নজরে এলে নজরুলের খোঁজে নামে পুলিশ। এর প্রেক্ষিতে নজরুলকে তার সহযোগীসহ গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হল।

কেন এই ‘অপহরণ নাটক’?

গ্রেপ্তারদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক বলেছেন, নজরুল ইসলাম পারিবারিক ও আর্থিক সংকটে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। তার দুই স্ত্রী ও দুই ঘরে দুই সন্তান রয়েছে। দুই স্ত্রীই টাঙ্গাইলে বসবাস করে।

মাসে ১৭ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করা নজরুল দুই পরিবারে ৩ হাজার করে মোট ৬ হাজার টাকা দিতেন। আর বাকি টাকা থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেন।

পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, “ঘটনার কয়েক দিন আগে প্রথম স্ত্রী রোকেয়া বেগমের সঙ্গে পারিবারিক বিষয় নিয়ে নজরুলের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তুই কি চাস? আমি মইরা যাই?’ উত্তরে তার স্ত্রী বলেন, ‘হ্যাঁ, তুই মইরা গেলেই আমি বাঁচি।’ এতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং একপর্যায়ে আত্মহত্যার চিন্তা করেন নজরুল।”

পরে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে পরিবার ও আর্থিক সংকট থেকে দূরে থাকার জন্য আত্মগোপনের পরিকল্পনা করেন। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা নেন ঢাকাতেই থাকা তার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে রিপনের।

যেভাবে সাজানো হয় কথিত অপহরণ

পুলিশ বলছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী শুক্রবার ভোর আনুমানিক ৪টা ২১ মিনিটে রিপন সাদা বস্তায় নজরুল ইসলামের কাপড়চোপড়ের ব্যাগ নিয়ে ওই ভবনের গার্ড রুমে যান। পরে নজরুল নিজেই বস্তার মধ্যে ঢোকেন। এরপর রিপন তাকে বস্তাসহ মূল ফটকের কাছে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তারা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে গাবতলী বাস টার্মিনালে যায়।

সেখান থেকে তারা শ্যামলী পরিবহনের বাসে চট্টগ্রামের ‘এ কে খান’ এলাকায় যান। সেখানে রাসেল নামের এক পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্ণফুলীর ইছানগর এলাকায় অবস্থান করেন। রোববার বিকেলে রাসেল তাকে মাছ ধরার জাহাজে বাবুর্চির কাজের ব্যবস্থা করে দেয়। পরদিন ওই জাহাজ থেকে নজরুলকে তার ভাতিজাসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

উপকমিশনার মোস্তাক বলেন, “কিছুদিন আগে নজরুলের দ্বিতীয় ঘরের ছেলে মেরাজকে ঋণ করে বিয়ে দেওয়ায় তার ওপর আর্থিক চাপ আরও বৃদ্ধি পায়। ব্যুরো বাংলাদেশসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সুদে নেওয়া ঋণ মিলিয়ে তার প্রায় ৬-৭ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। তার ছেলে বলেছে নজরুল ব্যাংক থেকে আরও প্রায় ৩ লাখ টাকা নিয়েছেন।”