১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

জুলাই সনদ সামনে রেখে পুরো সংবিধান পর্যালোচনা করবে বিশেষ কমিটি

জুলাই জাতীয় সনদ তৈরিতে যারা কাজ করেছেন, তাদের কাছ থেকেও মতামত নেবে কমিটি।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 04 Aug 2026, 06:10 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

জুলাই জাতীয় সনদকে ভিত্তি ধরে পুরো সংবিধান পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে সংশোধনী সুপারিশ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।

কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৈঠকের কার্যক্রম শুরু করেন। কিছুক্ষণ বৈঠকে থাকার পর তিনি বেরিয়ে যান।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মণি।

প্রথম বৈঠকে কমিটির কাজের পদ্ধতি এবং কাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে, সে বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়।

ঠিক হয়, শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাই যোদ্ধা এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মতামত নেবে কমিটি।

এ ছাড়া সাংবাদিক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, জাতীয় প্রেস ক্লাব এবং বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

জুলাই জাতীয় সনদ তৈরিতে যারা কাজ করেছেন, তাদের কাছ থেকেও মতামত নেবে কমিটি।

‘সবার কথা শুনব’

বৈঠক থেকে বেরিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কমিটি শুধু নিজেদের আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করবে না। সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা সংশোধনী প্রস্তাবও প্রতিবেদনে রাখার চেষ্টা করবে।

“যেহেতু আমরা উদার এবং ওপেন আমরা সবার কথা শুনব। সর্বত্র যা যা সংশোধনের প্রয়োজন সে সমস্ত সংশোধনীগুলো আমরা ধারণ করে সেভাবে আমরা রিপোর্ট প্রণয়ন করব।”

কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে আসবে জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, “তারপরে বিল যখন আসবে সংবিধান সংশোধনী বিল পার্লামেন্টে আলোচনা করে আমরা সমযোতার ভিত্তিতে সেই সংশোধনীটা গ্রহণ করতে চাই। যেই সংশোধনী জনপ্রত্যাশা পূরণ করবে।”

রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো সংশোধনী প্রস্তাবে রাখা হবে বলে জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশের এই নবযাত্রা এবং রাষ্ট্র কাঠামোর যে আমরা বিবর্তনমূলক কার্যে যাচ্ছি এবং রাষ্ট্র কাঠামোর যে গণতান্ত্রিক সংস্কার আমরা করতে চাই, সেগুলো সবগুলো আমরা এখানে অ্যাড্রেস করব, ধারণ করব, যেটা আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল আছে।”

কমিটির কাজকে কোনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, “কমিটির সামনে চ্যালেঞ্জ নেই। আমাদের প্রত্যাশা আছে। আমরা সবার সাথে আলোচনা করতে চাই। এটাকে আমি চ্যালেঞ্জ বলতে চাই না।”

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আকাঙ্ক্ষাও সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় রাখার কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “এত বড় একটা ছাত্র গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হল। জাতির প্রত্যাশা অনেক। শহীদের আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই প্রত্যাশা এবং আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আমাদেরকে এই বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে।”

‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো’ সংবিধানে রাখার ওপর জোর দেন কমিটির সভাপতি।

তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হবে সংশোধনী তৈরির মূল ভিত্তি। যেসব প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো সংশোধনীতে নেওয়া হবে।

যেসব বিষয়ে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা লিখিত ভিন্নমত রয়েছে, সেগুলো ভিন্নমত হিসেবেই বিবেচনায় রাখা হবে বলে সালাহউদ্দিনের ভাষ্য।

তিনি বলেন, “৪৮টার মধ্যে অনেক কিছু আছে। আমরা সম্মত হয়েছি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদে। সেগুলো তো আমরা নেবই। আর যেগুলোতে আমরা নোট অফ ডিসেন্ট দিয়েছি সেগুলো নোট অফ ডিসেন্ড আকারে নেব।”

জুলাই সনদে প্রতিফলিত হয়নি, কিন্তু বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে, এমন প্রস্তাবও আলোচনায় আসবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সংবিধান পর্যালোচনার জন্য ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি করার পরিকল্পনা ছিল সরকারের, সেখানে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ রাখার কথা বলা হয়েছিল। তবে বিরোধী দল এখনও কোনো সদস্যের নাম দেয়নি বলে জানান সালাহউদ্দিন।

তিনি বলেন, “সেই নামগুলো আমরা এখনো পাইনি। আমি আশা করি তারা হয়ত অনুধাবন করবেন, এক পর্যায়ে তারা হয়তো তাদের নাম দেবেন, তাদের সাথেও আমরা আলোচনা করব।”

বিরোধী দল কমিটিতে সদস্য না দিলেও তাদের মতামত নেওয়া হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “তারা যদি মিটিংয়ে এসে দেয় ভালো, মিটিং এর বাইরে দিলেও আমরা সেটা গ্রহণ করব। লিখিতভাবে যদি দেয়।”

সব পক্ষের মতামত নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিবেদন তৈরির পরিকল্পনা জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, “এইভাবে আমরা একটা গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনতে চাই। এবং জনপ্রত্যাশার সবকিছু আমরা ধারণ করতে চাই। সবার সাথে আলাপ আলোচনা করে আমরা সেই রিপোর্টটা প্রণয়ন করতে চাই।”

বৈঠকের সিদ্ধান্ত তুলে ধরে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সংবিধান সংশোধনের আগে সমাজের বিভিন্ন অংশের মতামত নেওয়া হবে। আলোচনার পর সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোয় রূপ দিয়ে সংবিধান সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করা হবে।

জুলাই সনদের বাক্যগুলো হুবহু সংবিধানে বসানো হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, সনদের মূল বক্তব্য ও সিদ্ধান্তগুলো সাংবিধানিক আইনের উপযোগী শব্দে রূপ দিতে হবে।

তার ভাষ্য, “‘এজ ইট ইজ’ বলতে সনদের একই ভাষা ব্যবহার বোঝানো হচ্ছে না। এর অর্থ হল সনদের মূল বিষয় ও অঙ্গীকার ধারণ করা।”

পুরো সংবিধান পর্যালোচনা

আইনমন্ত্রী বলেন, শুধু জুলাই সনদের নির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলো আলাদাভাবে না দেখে একটি সংশোধনের কারণে সংবিধানের অন্য কোনো অনুচ্ছেদে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে কি না, তাও দেখতে হবে।

“পুরাটা পর্যালোচনা প্রয়োজন হবে। কারণ হারমোনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশন রাখতে হবে। একটার সাথে আরেকটা গাঁথুনি রাখতে হবে।”

‘হারমোনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশন’ বলতে একটি দলিলের সব অংশ মিলিয়ে ব্যাখ্যা করাকে বোঝায়। এতে একটি বিধানের সঙ্গে অন্য বিধানের বিরোধ এড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

সংবিধানের ‘বেসিক স্ট্রাকচার থিওরি’ বা মৌলিক কাঠামো তত্ত্বও বিবেচনায় রাখার কথা বলেন আইনমন্ত্রী।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করা গেলেও রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করা যায় না।

এ প্রসঙ্গে তিনি ভারতের কেশবানন্দ ভারতী মামলা এবং বাংলাদেশের অষ্টম সংশোধনী মামলার কথা তোলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, “কোনো রাজনৈতিক দল নিজেদের মতাদর্শ বা ইচ্ছা জুলাই সনদ এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে চাপিয়ে দিতে পারবে না। কোনো প্রস্তাব জুলাই সনদ বা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর বাইরে গেলে কমিটি সেই পথে যাবে না।”

তিনি বলেন, কোনো বিষয়ে একটি দলের ভিন্নমত থাকলে কোন প্রস্তাব কার্যকর হবে, তার ব্যাখ্যাও জুলাই সনদে দেওয়া আছে।

সনদের মূল প্রস্তাব, দলগুলোর সম্মতি এবং নোট অব ডিসেন্ট মিলিয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা তৈরি করা হবে বলে জানান তিনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, “জুলাই সনদ একটা ডকুমেন্ট, ওই ডকুমেন্টের হারমোনিয়াস ইন্টারপ্রিটেশনটা ওখানেই বলে দেওয়া আছে এখানে কোনো যদি বা কিন্তুর সুযোগ নাই। কোনরকম ভিন্ন ব্যাখ্যা করার সুযোগ নাই।”

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে আলোচনা হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই জুলাই সনদ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “সেটাকে সামনে রেখে আমরা করছি। এই দুইটার মধ্যে কোনো পার্থক্য এবং বিভেদের জায়গা আমি দেখি না।”

বিরোধী দল পরে নাম দিলে তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানান আইনমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিরোধী দল কমিটিতে না এলেও জুলাই সনদে তাদের সুপারিশ ও ভিন্নমত রয়েছে।

“কমিটির কাজ পর্যবেক্ষণ করে বিরোধী দল সমালোচনা করতে পারবে। যৌক্তিক কোনো সমালোচনা এলে তা সংশোধনী প্রস্তাবে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”

‘আগামী প্রজন্মের জন্য সংশোধন’

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বলেন, এ সংবিধান সংশোধন শুধু বর্তমান সরকার বা সংসদের মেয়াদের জন্য করা হচ্ছে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনও বিবেচনায় রাখতে হবে।

জনগণের চাহিদা ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে সংবিধান সংশোধন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বর্তমান সংসদের অধিকাংশ সদস্য যে প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছেন, সে কথা তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, “সংবিধানের জটিল বিষয়গুলো বুঝে মতামত দিতে তাদের সময় লাগতে পারে।”

বিরোধী দলের জন্য কমিটির দরজা ‘সব সময় খোলা থাকবে’ বলেও মন্তব্য করেন নূরুল ইসলাম মণি।

কমিটিতে যারা আছেন

সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

অন্য সদস্যরা হলেন বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মণি, ঝিনাইদহ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন।

কমিটিতে আরও আছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ভোলা-১ আসনের আন্দালীব রহমান, পটুয়াখালী-৩ আসনের নুরুল হক এবং চট্টগ্রাম-৫ আসনের মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।

বাকি সদস্যরা হলেন নাটোর-১ আসনের ফারজানা শারমিন, সংরক্ষিত মহিলা আসন-৮-এর শাকিলা ফারজানা, শেরপুর-৩ আসনের মাহমুদুল হক রুবেল এবং বরগুনা-১ আসনের মো. অলি উল্লাহ।

প্রথম বৈঠকে অলি উল্লাহ উপস্থিত ছিলেন না।

গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে ১২ সদস্যের এ বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটির কাজ হল সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়ে সুপারিশ তৈরি করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়া। তবে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

কমিটি গঠনের দিন বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।

তাদের দাবি, সাধারণ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংশোধন নয়, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হবে।