পাতাল রেল উচ্চ ব্যয়নির্ভর, ঢাকা ‘প্রস্তুত নয়’: বিশেষজ্ঞ মত

পাতাল রেলের মত উচ্চ ব্যয়নির্ভর ও ‘উচ্চাভিলাষী’ প্রকল্পের জন্য ঢাকা ‘এখনও প্রস্তুত নয়’ মন্তব্য করে যানজট নিরসনে গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ানো ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 22 April 2022, 06:10 PM
Updated : 22 April 2022, 06:13 PM

শুক্রবার ‘ঢাকায় পাতাল রেল প্রকল্প: টেকসই পরিবহন পরিকল্পনার প্রাসঙ্গিকতায় উপযোগিতা বিশ্লেষণ’ শীর্ষক সংলাপে এমন মতামত উঠে আসে।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) এ সংলাপের আয়োজন করে। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী ড. আদিল মুহাম্মদ খান।

২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকায় ১১টি রুটে পাতাল রেল চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। এরমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে চারটি রুট চালুর সিদ্ধান্ত রয়েছে। মোট ২৫৮ কিলোমিটার পাতাল রেল নির্মাণ করতে চায় সরকার।

গত ২৯ মার্চ ঢাকা সাবওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পের প্রতিবেদন উপস্থাপন উপলক্ষে এক সেমিনারে ঢাকার যানজট নিরসনে সরকার চারটি রুটে ২০৩০ সালের মধ্যে পাতাল রেল চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান ওবায়দুল কাদের।

সাবওয়ে নির্মাণ ব্যয়বহুল হলেও ঢাকা শহরকে সচল রাখতে এর বিকল্প নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, “প্রথম পর্যায়ে নির্মান ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ৩০৬ মিলিয়ন ডলার। আর ২০৪০ সালের মধ্যে আরও চারটি এবং ২০৫০ সালের মধ্যে আরও পাঁচটি রুটে সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

শুক্রবার ভার্চুয়াল সংলাপে মূল প্রবন্ধে ড. আদিল বিভিন্ন দেশে পাতাল রেল নির্মাণের উচ্চ ব্যয়ের তথ্য তুলে বলেন, সিঙ্গাপুরে এক কিলোমিটার পাতাল রেল নির্মাণে ৪৯৩ মিলিয়ন এবং হংকংয়ে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।

তিনি বলেন, “ঢাকায় প্রাথমিকভাবে প্রতি কিলোমিটারে খরচ ধরা হয়েছে ২৭৫ মিলিয়ন ডলার; টাকার অংকে যা ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি। এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ব্যয় হবে ৩২০ কোটি টাকা।

“বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিবেচনায় অতি উচ্চ বিনিয়োগ ও পরিচালন ব্যয়ের কারণে এই প্রকল্প ঢাকা শহরের জন্য বাস্তবসম্মত নয়।”

পাতাল রেলের মত উচ্চ ব্যয়নির্ভর প্রকল্প বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থাপনায় কাঙ্খিত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে না বলে মনে করেন আইপিডির পরিচালক পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, পাতাল রেলের পরিবর্তে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পাশাপাশি ঢাকার আশেপাশে পরিকল্পিত নগর গড়ে রাজধানীর ওপর চাপ কমানো যায়।

“একইসাথে মানসম্মত বাস সার্ভিস গড়ে তোলার মাধ্যমে ঢাকার সাথে আঞ্চলিক যোগাযোগ টেকসই ও কার্যকর করতে হবে।”

ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনা এবং নগর পরিকল্পনার মূল দলিলগুলোতে পাতাল রেলের প্রস্তাব না থাকার পরও কিভাবে এ প্রকল্পের যাচাইয়ে এত টাকা ব্যয় করা হয়েছে সেই প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটের তুলনায় অতি ব্যয়বহুল এই প্রকল্প দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।”

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম সালেহউদ্দিন বলেন, ঢাকার মানুষ, অর্থনীতি, সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে পাতাল রেল প্রকল্প মানানসই নয়। এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বিপুল অর্থ দিয়ে উন্নত মানের বাস কেনার পরামর্শ দেন তিনি।

“সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য এই ৩২০ কোটি টাকা অপচয় না করে তা দিয়ে ঢাকা শহরে হাজারখানেক মানসম্মত বাস নামানো যায়। এটা ঢাকার ট্রাফিক সমস্যার সমাধানে কার্যকর হতে পারে। বাস রুট রেশনালাইজেশনে নেওয়া উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং পদচারীবান্ধব নগর তৈরি করতে হবে।”

রাজউকের ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ঢাকার কেন্দ্রীয় অঞ্চল পাতাল রেল নির্মাণের উপযুক্ত হলেও আশেপাশের অন্যান্য অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এর জন্য উপযুক্ত নয়। ফলে ঢাকার আশেপাশে পাতাল রেলের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ব্যয় হবে তুলনামূলক অনেক বেশি।

“ফলে রিং রোড, রেডিয়াল রোড, বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকার টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।”

আরও পড়ুন:

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক