ভর্তি পরীক্ষা: বগুড়া থেকে বাইকে ছেলেকে নিয়ে বুয়েটে

বাস ধর্মঘট, কিন্তু বুয়েট ভর্তি পরীক্ষাও দিতে হবে ছেলের; অগত্যা মোটরবাইক চালিয়েই বগুড়া থেকে ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় চলে এলেন আইনুল হক।

রাসেল সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 Nov 2021, 08:42 AM
Updated : 6 Nov 2021, 08:42 AM

কয়েকশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসা আইনুলের সঙ্গে শনিবার বুয়েট পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে যখন কথা হল, তখনও তার ক্লান্তি ভাব কাটেনি।

বললেন, “এতদূর থেকে বাইকে আসা রিস্কি ছিল। তবে না এসে উপায় ছিল না, পরীক্ষা তো দেওয়া লাগবে।”

ডিজেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে শুক্রবার সকাল থেকে সারাদেশে বাস-ট্রাক চালানো বন্ধ রেখেছেন পরিবহন মালিকরা।

ভাড়া বাড়াতে তাদের দাবির মুখে রোববার বৈঠক ডেকেছে বিআরটিএ। তার আগে ধর্মঘট তুলে নিতে সরকারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হলেও তাতে সাড়া মেলেনি।

আইনুল জানান, শুক্রবার ঢাকায় রওনা হতে দুদিন আগেই শাহ ফতেহ আলী বাসের টিকেট কেটে রেখেছিলেন তিনি।

“কিন্তু ধর্মঘটের খবর শুনে বাস কাউন্টারে ফোন করে দেখি নম্বর বন্ধ, কাউন্টারে গিয়ে দেখি তালা। পরে শুক্রবার সকালে বাইকে করেই দুজন রওনা দিই। রাতে ঢাকায় একটি হোটেলে ছিলাম।”

আইনুল হকের ছেলে আশিক ইকবাল এবার বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তার ইচ্ছা প্রকৌশল নিয়ে পড়ালেখা করার।

তার বাবা আইনুল হক বলেন, “ছেলের স্বপ্ন পূরণ হলে এই কষ্ট আমার কাছে কিছুই না।”

পরিবহন ধর্মঘটের মধ্যে শুক্রবার বেশ কয়েকটি নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজে ভর্তি পরীক্ষাও নেওয়া হয়। বুয়েট কর্তৃপক্ষও ভর্তি পরীক্ষা পেছায়নি।

ফলে আইনুল হকের মতো অনেক অভিভাবকই পদে পদে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।

নাটোরের বঙ্গবন্ধু কলেজ থেকে পাস করা ছেলে আশীক আলীকে বুয়েটের পরীক্ষা কেন্দ্রে পাঠিয়ে কয়েকটি ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় অপেক্ষা করছিলেন মা আরিফা বেগম।

তিনি বলেন, “নাটোর থেকে ট্রেনে করে এসেছি। বাস না চলায় ব্যাগ-বোচকা নিয়ে আসাটা কষ্টের ছিল।”

এত ব্যাগ থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বুয়েট ছাড়াও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়হ কয়েকটা ভর্তি পরীক্ষা আছে। ঢাকায় কোথাও থেকে পরীক্ষাগুলো শেষ করে একবারে বাড়ি ফিরব। এতদূর থেকে তো প্রত্যেক দিন এভাবে কষ্ট করে আসা যাবে না।”

ছেলেকে পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢুকিয়ে বাইরে অপেক্ষায় আরিফা বেগম। শনিবার বুয়েটের এই ভর্তি পরীক্ষার জন্য নাটোর থেকে আসেন তিনি।

শনিবার বুয়েটের পরীক্ষায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শুক্রবার ঢাকায় আসার টিকেট কেটে রাখলে ধর্মঘটের খবর শুনে বৃহস্পতিবারই ঢাকায় আসতে হয়েছে অনেকের।

সাতক্ষীরা থেকে দুদিন আগেই মেয়ে মুনজেরিনকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন মাজেদুল হক।

তিনি বলেন, “অনেক স্ট্রাগল করে প্রাক নির্বাচনী পরীক্ষা দিয়ে মূল পর্বে ৬ হাজারের মধ্যে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে আমার মেয়ে। এটা যদি মিস হত, তাহলে তার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়ে যেত।”

ছেলে অনির্বাণ রায়কে নিয়ে ঝিনাইদহের শৈলকূপা থেকে পরীক্ষা দিতে বৃহস্পতিবারই ঢাকায় চলে আসেন অশোক  রায়।

তিনি বলেন, “অনেক ভোগান্তি সহ্য করে কয়েকবার গাড়ি পরিবর্তন করে ভেঙে ভেঙে ঢাকায় এসেছি। এখন কীভাবে বাড়ি ফিরব সেই চিন্তায় আছি।”

ঢাকায় এসেও ভোগান্তিতে পড়েছেন পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। অনেকে আত্মীয়-স্বজনের বাসায়, কেউ হোটেলে থেকে পরীক্ষা কেন্দ্রে আসতে হয়েছে সিএনজি, বাইক কিংবা রিকশায়।

চট্টাগ্রাম থেকে মেয়ে তাশফিয়া তাবাসসুমকে নিয়ে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার জন্য আসেন তার বাবা রফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “শুক্রবার রাতে মেয়েকে নিয়ে ঢাকা আসার টিকেট কেটেছিলাম। একদিন আগে অনলাইন মিডিয়ায় জানতে পারলাম, কাল থেকে গণপরিবহন ধর্মঘট। পরে অনেক চেষ্টা করে বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় দুটা টিকেট পেলাম, এও বাসের একদম পেছনে। আত্মীয়ের বাসায় থেকে সকালে সিএনজি করে পরীক্ষা কেন্দ্রে আসতে হয়েছে।”

বুয়েটের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক শ্রেণিতে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষার পর শনিবার সকাল ১০টায় চূড়ান্ত পর্বের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়।

মডিউল 'এ'-তে ‘ক’ গ্রুপ ও ‘খ’ গ্রুপে গণিত, পদার্থ, রসায়নের উপর ৪০০ নম্বরে দুই ঘণ্টার এই লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় দুপুর ১২টায়।

‘খ’ গ্রুপে আবেদনকারীদের মডিউল 'বি'- তে ২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত মুক্তহস্ত অঙ্কন, দৃষ্টিগত ও স্থানিক ধীশক্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এই প্রথম দুই ধাপে ভর্তি পরীক্ষা নিচ্ছে বুয়েট। গত ২০ ও ২১ অক্টোবর মহামারী পরিস্থিতি বিবেচনায় চার শিফটে ভাগ করে প্রাক-নির্ববাচনী পরীক্ষা নেওয়া হয়। সেখানে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ৬ হাজার পরীক্ষার্থীকে চূড়ান্ত পর্বের পরীক্ষার জন্য বাছাই করা হয়। চূড়ান্ত পর্বে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত ১ হাজার ২১৫ জনকে বুয়েটের ১২ টি বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

চূড়ান্ত পর্বের ভর্তি পরীক্ষা শুরুর পর কয়েকটি হল ঘুরে এসে বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টা অধ্যাপক মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ৬ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫ হাজার ৯৪৪ জন উপস্থিত হয়েছে। উপস্থিতির হার প্রায় ৯৯ শতাংশ। এটা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

পরিবহন ধর্মঘটের মধ্যে পরীক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা একটু দুঃশ্চিন্তার মধ্যে ছিলাম যে, গণপরিবহন ধর্মঘটে উপস্থিতির হার কেমন হয়। তারপরও উপস্থিতির হারে আমরা সন্তুষ্ট। যদিও যারা দূর থেকে এসেছে, তাদের অনেক ভোগান্তি হয়েছে। তাদেরকে অনেক কষ্ট করে আসতে হয়ছে। বিষয়টি আসলে আমাদের হাতে ছিল না।”

মহামারীর কারণে প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় পিছিয়ে যাওয়া এই শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও পাঠদান কীভাবে হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে তাদের ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।

“আমাদের একাডেমিক কাউন্সিলে এটা আলোচনা হয়েছে যে, এবার যারা ভর্তি হবে, মহামারীর কারণে তাদের অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। তাদের যাতে আর বেশি সময় নষ্ট না হয়, সেজন্য ভর্তি কার্যক্রম শেষ করে দ্রুত ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।”

সাত কলেজের ভর্তি পরীক্ষার দিনে ইডেন কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান।

সাত কলেজের ভর্তি পরীক্ষা

শনিবার সকাল ১০টায় শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা। এতে অংশগ্রহণের জন্য আবেদন করেছিল ৪১ হাজার ৯৪ জন শিক্ষার্থী।

সেখানেও পরীক্ষা দিতে এসে ভোগান্তিতে পড়ে পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। মীরপুর থেকে রিকশায় করে ইডেন কলেজ কেন্দ্রে মেয়েকে নিয়ে আসেন শরফুন নাহার।

তিনি বলেন, “আজকে এই সঙ্গে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা। এর মধ্যে এই ধর্মঘট। আসলে ভোগান্তির কোনো শেষ নেই। বাস না চলায় রিকশা আর সিএনজির ডিমান্ড বেড়ে গেছে। সকালে বের হয়ে অনেক্ষণ রাস্তায় অপেক্ষা করে রিকশায় করে কেন্দ্রে এসেছি।”

তবে ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান।

সকাল সোয়া ১০টার দিকে ইডেন মহিলা কলেজের পরীক্ষা কেন্দ্র ঘুরে আসার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “ভর্তি পরীক্ষায় যে রকম উপস্থিতি হয়, সেই রকমই উপস্থিতি হয়েছে। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললাম, পরীক্ষার প্রশ্নের মান ও সার্বিক পরিবেশ নিয়েও তারা  সন্তোষ প্রকাশ করেছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক