প্রধান বিচারপতির অভিশংসন চেয়ে বিচারপতি শামসুদ্দিনের চিঠি

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অভিশংসন চেয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Sept 2015, 01:32 PM
Updated : 13 Sept 2015, 01:32 PM

চিঠিতে দেখা যায়, সংবিধান লঙ্ঘন, শপথভঙ্গ ও অসদাচরণের অভিযোগ তুলে প্রধান বিচারপতির অভিশংসন চেয়েছেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী।

আপিল বিভাগের বিচারক শামসুদ্দিন চৌধুরী রোববার এই চিঠি রাষ্ট্রপতিকে পাঠান। তার অনুলিপি প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারকদের কাছেও পাঠান তিনি। 

চিঠির অনুলিপি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম হাতে পেয়েছে, যার একটিতে বঙ্গভবনের নিরাপত্তায় থাকা পুলিশ কর্তৃক তা গ্রহণের সিলমোহর দেখা যায়। আরেকটিতে আইন মন্ত্রণালয়ের সিলমোহর রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, “সন্ধ্যা ৬টা ২৫ (মিনিট) পর্যন্ত বঙ্গভবন এই ধরনের কোনো চিঠি পায়নি।”

সম্প্রতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আরেক বিচারকের কথোপকথনের একটি অডিও টেপ প্রকাশ হওয়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা উঠে। গণমাধ্যমে খবর আসে, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী ওই বিচারক।

যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপিলের রায়ের আগে জনকণ্ঠে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ নিয়ে এই বিষয়ে আলোচনা উঠলে তা আদালত পর্যন্তও গড়ায়। 

তার শুনানিতে গত ১১ অগাস্ট জনকণ্ঠের আইনজীবী অডিও রেকর্ডের শ্রুতিলিখনের অংশবিশেষ তুলে ধরেন, যাতে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে টেলিফোনের অন্য প্রান্তের বিচারপতির মতপার্থক্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

এরপর বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর অবসরে যাওয়ার আগে অস্বাক্ষরিত রায় নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তার কয়েকটি চিঠি চালাচালির ঘটনাও গণমাধ্যমে আসে।

এর মধ্যেই বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী প্রধান বিচারপতির অভিশংসন চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে তিনি দাবি করেছেন, আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর তার শেষ কর্মদিবস, কিন্তু তার পেনশন প্রক্রিয়া আটকে দেওয়া হয়েছিল।

বিচারপতি শামসুদ্দিন লিখেছেন, তিনি তার পেনশন কার্যক্রমের বিষয়ে প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করলে প্রধান বিচারপতির নির্দেশে রেজিস্ট্রার জেনারেলের স্বাক্ষরে গত ২৫ অগাস্ট এক চিঠিতে তাকে জানানো হয়- “সকল পেন্ডিং রায় না লেখা পর্যন্ত আমার পেনশন কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না”।

এরপর গত ১ সেপ্টেম্বর বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী পাল্টা চিঠি দেন প্রধান বিচারপতিকে, যাতে তিনি লিখেছেন- “মাননীয় প্রধান বিচারপতির উক্তরূপ আদেশ প্রদান করার কোনো আইনগত কর্তৃত্ব নাই এবং অতীতেও অবসরে যাওয়া সকল মাননীয় বিচারপতিগণই অবসরে যাওয়ার অনেক পরেও রায় লিখিয়াছেন এবং আমার প্রতি প্রধান বিচারপতির আচরণ বৈষম্যমূলক ও বিদ্বেষপূর্ণ”।

এরপর ২ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাঠানো একটি চিঠিতে পেনশন প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানান বলে রাষ্ট্রপতিকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী।

“উক্ত পত্রে আমার অবসরে যাওয়ার পূর্বে যে সমস্ত মামলার রায় লেখা সম্ভব হইবে না, সে সমস্ত মামলার নথি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করেন এবং বৃটিশ পাসপোর্টধারী হিসেবে মামলার রায় না লিখে বিদেশে চলে যেতে পারি মর্মে সংশয় প্রকাশ করেন।”

ওই চিঠি পাওয়ার পর গত ৮ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতিকে আবার জবাব পাঠান বলে রাষ্ট্রপতিকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী।

“আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করি যে ইতিপূর্বে অবসরে যাওয়া কোনো বিচারপতিকে নথি ফেরত দেওয়ার জন্য কখনোই বলা হয়নি। প্রধান বিচারপতি হিসেবে আমার প্রতি তাহার আচরণ বৈষম্য ও জিঘাংসামূলক। তাহার এই রকম আদেশ আমার স্বাধীন বিচারকার্যে হস্তক্ষেপের শামিল ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৪(৪) আর্টিকেল পরিপন্থি।”

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী দাবি করেছেন, ৮ সেপ্টেম্বর ওই চিঠি দেওয়ার পর থেকে তাকে বিচারিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

“মাননীয় প্রধান বিচারপতির এই রূপ আচরণ ভয়াবহভাবে বৈষম্যমূলক ও প্রতিহিংসামূলক। ব্যক্তিগত বিরাগের বশবর্তী হইয়ার তিনি কর্মরত বিচারক হিসেবে আমাকে বিচারকার্য থেকে বঞ্চিত করিয়া অসদাচরণ করিয়াছেন, যাহা অভিশংসন যোগ্য।”

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর দাবি, তাকে বিদায় সংবর্ধনা থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য থেকে বিচারিক কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

“আমি প্রধান বিচারপতি জনাব সুরেন্দ্র কুমার সিনহার একজন সহকর্মী। মাননীয় প্রধান বিচারপতি তাহার সহকর্মী বিচারপতি হিসেবে আমার প্রতি বিরাগের বশবর্তী হইয়া যেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছেন, তাহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে তিনি যে কোনো মামলায় অনুরাগ ও বিরাগের ঊর্ধ্বে থাকিয়া বিচারকার্য্য পরিচালনা করতে অক্ষম।”

 
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক