১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘সন্দেহজনক ঘোরাঘুরি’: বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সেই মার্কিন নাগরিক ২ দিনের রিমান্ডে

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, “প্রাথমিকভাবে তার ফোন বিশ্লেষণ করে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।”

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Sep 2025, 05:08 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:18 PM

রাজধানীর মিন্টো রোডে গাড়িতে করে ‘সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরির’ অভিযোগে রমনা থানার সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিককে ২ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।

তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের শুনানি নিয়ে ঢাকার মহানগর হাকিম আতিকুর রহমান এ আদেশ দেন।

প্রসিকিউশনের এসআই জিন্নাত আলী এ তথ্য জানিয়েছেন। 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের রমনা জোনাল টিমের ইন্সপেক্টর আক্তার মোর্শেদ,  এনায়েত করিম চৌধুরী নামের ৫৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার দেখানোসহ ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। 

তিনি বলেন, “ তিনি (এনায়েত করিম চৌধুরী) নিজেকে সিআইএ এর এজেন্ট দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি 'র' এর এজেন্ট। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র আমাদের বন্ধু না, সবচেয়ে বড় শত্রু। রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় রয়েছে তারা। দেশ যখন নির্বাচনমুখী, ন্যায়বিচার, আইনের শাসনের পথে হাঁটছিল, নির্বাচনের জন্য সবাই কাজ করছিল। কিন্তু একটা রাষ্ট্র এটা চায় না। বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার অঙ্গরাজ্যে পরিণত করতে চায়। এ এজেন্ট বাংলাদেশে এসে পরিবেশ নষ্টের চেষ্টা করছেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছে। তার ১০ দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করছি।”

এনায়েত করিম চৌধুরীর পক্ষে আইনজীবী ফারহান মো. আরাফ রিমান্ড বাতিল করে জামিনের প্রার্থনা করেন। 

তিনি বলেন, “প্রথমে তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। যখন গ্রেপ্তার দেখানোর কিছু পেল না, পরে মামলা করে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ড চাইল। গত ৬ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশে আসেন। ১৪ তারিখ ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। এরই মাঝে তো গ্রেপ্তার হলেন।”

তিনি আরও বলেন, “তিনি আটক কেন, গাড়ি নিয়ে ঘোরাফেরা করার কারণে। গাড়ি নিয়ে ঘোরাফেরা তো অবাস্তব। বলা হচ্ছে, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট। সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই, তিনি কোন দেশের এজেন্ট। বলা হচ্ছে, বর্তমান সরকারের পতনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এজাহার, রিমান্ড ফরোয়ার্ডিংয়ে বলা আছে, সরকারের বিভিন্ন লোকের সাথে মিটিং করেছেন। সরকার পতন করতে এসে সরকারের লোকজনের সাথে মিটিং করবেন? তাহলে কিভাবে সরকার পতন করবে।”

এ আইনজীবী দাবি করেন, এনায়েত করিম চৌধুরী ‘রাষ্ট্রবিরোধী কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত না’। রাষ্ট্রবিরোধী কাজে সম্পৃক্ত হলে দেশে আসার সাথে সাথেই তাকে গ্রেপ্তার করা হত। 

“সেই ট্যাগের প্রচলন রয়ে গেছে। ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হল। কোনোকিছু না পেয়ে মামলা দিল। তার রিমান্ড বাতিল করে জামিনের প্রার্থনা করছি। প্রয়োজনে তাকে জেলইগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।”

ঢাকার মহানগর হাকিম সাইফুজ্জামান সকালে তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। দুপুরে দুই পক্ষের শুনানি শেষে তার রিমান্ডের আদেশ হল।

শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এনায়েত করিমকে আটক করে রমনা মডেল থানা পুলিশ। বিকালে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন রমনা থানার এসআই আজিজুল হাকিম।

তবে ঢাকার মহানগর হাকিম দিলরুবা আফরোজ তিথি আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়ে সোমবার রিমান্ড শুনানির দিন ঠিক করে দেন। 

এরই মাঝে তার বিরুদ্ধে রমনা মডেল থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। এরপর তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিন্টো রোডের মন্ত্রীপাড়া এলাকায় এসইউভিতে করে ‘সন্দেহজনক’ চলাচল করতে দেখা যায় এনায়েত করিম চৌধুরীকে। এসময় তার গাড়ি থামানো হয় এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। 

“সেজন্য তাকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে দুটি আইফোন জব্দ করা হয়। প্রাথমিকভাবে তার ফোন বিশ্লেষণ করে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

“প্রাথমিক জিজ্ঞসাবাদে তদন্ত কর্মকর্তাকে এনায়েত করিম বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক। ৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে নিউ ইয়র্ক থেকে কাতার এয়ারওয়েজ করে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন। তিনি বিশেষ একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার চুক্তিভিত্তিক এজেন্ট। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকার খুব নাজুক অবস্থায় আছেন এবং সেনাবাহিনীর সাথে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তিনি বর্তমান সরকারকে পরিবর্তন করে নতুন জাতীয় সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে কাজ করার জন্য বাংলাদেশে এসেছেন।”

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, গত ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর সোনারগাঁও হোটেলে ছিলেন এনায়েত করিম চৌধুরী। পরে থাকেন গুলশানে। এর মধ্যে তিনি সরকারের নীতি নির্ধারক পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা, ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে ‘গোপনে’ বৈঠক করেন। 

“বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রতি আমেরিকান সরকার হতাশ। আগামী ২১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায় রহিত করবেন। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে সেনাবাহিনী সমর্থিত নতুন জাতীয় সরকার অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। নতুন এই সরকারে কারা অংশগ্রহণ করবেন এবং সরকার প্রধান কে হবেন তা একটি প্রভাবশালী দেশ নির্ধারণ করে দেবে। 

“বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটের আলোকে সরকারি ও বেসরকারি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বর্তমান অবস্থান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের তথ্য সংগ্রহ করে তিনি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতেন “

পুলিশের আবেদনে বলা হয়, “এ আসামিসহ অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিরা ৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা ৫০ মিনিটের পর থেকে শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার জন্য, জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে উচ্ছেদ করার জন্য বর্তমান সময়ে সুবিধাবঞ্চিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সাথে এবং সরকারি ও বেসরকারি উচ্চ পর্যায়ের লোকজন ও ব্যবসায়ী মহলের সাথে গোপনে সভা, পরামর্শ করে বিভিন্ন স্থানে গণবিক্ষোভের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের সম্পত্তির ক্ষতিসাধন করার জন্য ষড়যন্ত্র বা সহায়তা অথবা প্ররোচিত করার মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে উচ্ছেদের প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। 

“এ কারণে তার বিরুদ্ধে থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন। এ আসামি জিজ্ঞাসাবাদে মামলা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। তার দেওয়া তথ্য যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। ঘটনার সাথে জড়িত অজ্ঞাতনামা অপরাপর আসামিদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ ও গ্রেপ্তার, বিভিন্ন অরাজক পরিস্থিতি তৈরির সিন্ডিকেট চক্রের অনুসন্ধান, বাংলাদেশের অখণ্ডতা , সংহতি, জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার জন্য জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির এবং বর্তমান সরকারকে উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্রের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের প্রার্থনা করছি।”

'সন্দেহজনক ঘোরাঘুরি': গ্রেপ্তারের পর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন

'সন্দেহজনক ঘোরাঘুরি': বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সেই মার্কিন নাগরিককে