১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ঢাকার আইসিইউতে ওষুধ প্রতিরোধী ‘সুপারবাগ’: আইসিডিডিআর’বি

গবেষণা বলছে, সরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের এ হার প্রায় ১৩ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে তা প্রায় ৪ শতাংশ।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Mar 2026, 10:05 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:04 PM

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ওষুধ প্রতিরোধী ছত্রাক ‘ক্যানডিডা অরিস’ ছড়িয়ে পড়ার তথ্য দিয়ে আইসিডিডিআর’বি বলছে, এ ‘সুপারবাগ’ শুধু নবজাতকের আইসিইউতে সীমাবদ্ধ নেই; প্রাপ্তবয়স্ক গুরুতর রোগীদের মধ্যেও সংক্রমণ ঘটাচ্ছে।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে পরিচালিত গবেষণায় পাওয়া ফলের ভিত্তিতে এসব তথ্য দেয়।

প্রতিষ্ঠানটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সাময়িকী মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম এ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।

ওষুধ প্রতিরোধী ছত্রাক ‘ক্যানডিডা অরিস’ গবেষকদের ভাষায় ‘সুপারবাগ’ হিসেবে পরিচিত।

গবেষণার বিষয়ে আইসিডিডিআর’বির ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের এএমআর রিসার্চ ইউনিটের প্রধান ও গবেষণার প্রধান গবেষক ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, “এই গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে ক্যানডিডা অরিস শুধু নবজাতকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সব ধরনের আইসিইউ পরিবেশের জন্যই বড় হুমকি। 

“হাসপাতালের ভেতর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছি এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ দেখতে পাচ্ছি।”

জরুরিভিত্তিতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার, নজরদারি উন্নত এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্কতার তাগিদ দেন তিনি।

এ গবেষণায় সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)।

বিজ্ঞপ্তিতে গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২০২১ সালের অগাস্ট থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৭২ জন আইসিইউ রোগীকে এ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রোগীদের ভর্তি হওয়ার সময় এবং আইসিইউতে অবস্থানকালীন বিভিন্ন পর্যায়ে ত্বক ও রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। সন্দেহজনক নমুনা ভিটেক-২ পদ্ধতিতে নিশ্চিত করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউতে থাকার কোনো এক পর্যায়ে প্রায় ৭ শতাংশ রোগীর শরীরে ক্যানডিডা অরিস পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি রোগী আইসিইউতে থাকার সময় সংক্রমিত হয়েছেন, যা হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়।

সরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের হার ছিল প্রায় ১৩ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে তা ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। 

গবেষকদের মতে, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পার্থক্য এ ব্যবধানের একটি কারণ হতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এ হারকে উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরে আইসিডিডিআর’বি বলছে, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে পরিচালিত গবেষণায় সাধারণত ০.৫ শতাংশেরও কম হারে এই ছত্রাকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ক্যানডিডা অরিস উপসর্গ ছাড়াই ত্বকে থাকতে পারে। তবে রক্তে প্রবেশ করলে এটি মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে। গুরুতর অসুস্থ ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন রোগীদের জন্য ঝুঁকি বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত রোগীরা সাধারণত দীর্ঘদিন আইসিইউতে ছিলেন এবং তাদের ক্ষেত্রে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন বা সেন্ট্রাল ও ইউরিনারি ক্যাথেটারের মতো ইনভেসিভ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব নমুনাই ফ্লুকোনাজলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী এবং একটি বাদে প্রায় সব নমুনা ভরিকোনাজলের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধী। কিছু নমুনা একাধিক অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ছিল। এতে চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে পড়ছে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্বাচিত নমুনার জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইসিইউতে পাওয়া ক্যানডিডা অরিস মূলত দক্ষিণ এশীয় ধরনভুক্ত, যা থেকে গবেষকদের ধারণা, এটি এখন এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে।

গবেষকরা হাসপাতালের পরিবেশ নিয়মিত ক্লোরিনভিত্তিক জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের হাত ধোয়ার অভ্যাস কঠোরভাবে নিশ্চিত করা এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ইউনিটে নিয়মিত স্ক্রিনিং চালুর সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের সংযত ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এই সমস্যার বিস্তৃতি বোঝার জন্য বৃহৎ পরিসরের আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরা হয়।