Published : 08 Aug 2026, 11:59 PM
ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মিকে ব্যাভিচারের মামলা থেকে খালাস দেওয়ার রায়ে উঠে এসেছে নানা প্রসঙ্গ।
বিয়ে করে নাসির ও তামিমা কেন অপরাধ করেননি, কেন তামিমার আগের স্বামীকে তালাক দেওয়ার প্রক্রিয়া সঠিক ছিল, কেন নাসির-তামিমা দম্পতির সন্তান বৈধ— এ ধরনের নানা সিদ্ধান্তের পেছনে বিচারকের যুক্তি উঠে এসেছে পূর্ণাঙ্গ রায়ে।
ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম গেল ১০ জুন আলোচিত এ মামলার রায় দেন।
আইনগতভাবে বিচ্ছেদের আগেই নতুন করে বিয়ে করার অভিযোগে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর আগে মামলাটি করেছিলেন তামিমার সাবেক স্বামী রাকিব হোসেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারক বলেছেন, বাদী রাকিব ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মাত্র কয়েকবার দেখা হওয়ার দাবি তুলে ধরেছেন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে তামিমার ভরণপোষন দিয়েছেন কিনা বা স্বামী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন কিনা, সেই সাক্ষ্য-প্রমাণ রাকিব তুলে ধরতে পারেননি।
রায়ে বিচারক বলেছেন, ২০১৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ৮ মার্চ পর্যন্ত তামিমার সঙ্গে রাকিবের শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে, এমন কোনো আলামতও তদন্ত কর্মকর্তাকে বাদী দিতে পারেননি। ওই সময়কালের মধ্যে তামিমা অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন, এমন প্রমাণও নেই।
রাকিবকে তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্তও তামিমা আইনিভাবে নিয়েছিলেন বলে রায়ে বলা হয়েছে।
বিচারক বলেছেন, "বাদী তামিমাকে কাবিননামায় তালাকে-তফউইজের ক্ষমতা দিয়েছিলেন। সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে তামিমা রাকিবকে তালাক দেন। ডাক রশিদ জাল ছিল, সেটাও বাদী প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন।”
ব্যাভিচারের অভিযোগ প্রসঙ্গে রায়ে বলা হয়েছে, “তামিমা সুলতানার সঙ্গে নাসির হোসেন ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির আগে ব্যাভিচারে লিপ্ত ছিল বা তার সঙ্গে যৌন সঙ্গম করেছে, এমন অভিযোগ বাদী করেননি। মামলার ১০ সাক্ষীর কেউই বলেননি যে, তামিমার সঙ্গে নাসিরের বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে।
সন্তান প্রসঙ্গ
নাসির ও তামিমা দম্পতির একটি সন্তান রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ে সেই সন্তানের প্রসঙ্গও টেনেছেন বিচারক।
রায়ে বলা হয়, তামিমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে নাসির হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে অবৈধ গণ্য হতো। আর বিয়ে অবৈধ হলে তাদের সন্তানও অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে।
“যেহেতু আদালতের মাধ্যমে একটি শিশুকে অবৈধ ঘোষণার মতো কঠোর আদেশের সম্ভাবনা থেকে যায়, সেজন্য এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়া শুধুমাত্র আইনিভাবেই জরুরি নয়, বরং সামাজিকভাবেও এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।"
বিচারক বলেন, "তামিমার বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪৯৪ ধারার অপরাধ পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়ে বাদীপক্ষ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। নাসির হোসেনের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৪৯৭ ও ৪৯৮ ধারার অপরাধের কোনো সাক্ষী বা আলামত নেই।"
রায়ের দিন আপিলে যাওয়ার কথা বলেছিলেন বাদী রাকিব হোসেন। তবে এখন আর আপিলে আগ্রহ নেই তার। বরং শুভকামনা জানিয়েছেন নাসির ও তামিমার সন্তানের জন্য।
বিডিনিউজ টোয়েন্টেফোর ডটকমকে রাকিব বলেন, "আপিল করব কি না, নিশ্চিত না। আপিল করে কি সারাজীবন টানব। এমনিতেই পাঁচটা বছর গেছে মামলা নিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে। মামলায় নাসির জিতে গেছে। তাদের বাচ্চাটার ফেভারে গেছে। না হলে তো বাচ্চাটার দিকে মানুষ আঙ্গুল তুলতো। বাচ্চাটার তো আসলে কোনো দোষ নেই। এটা তো একটা ‘ন্যাশনাল ইস্যু’ ছিল। নাসিরের ফেভারে না গেলে ভাবমূর্তি নষ্ট হতো। আমি তো আর অত পরিচিত মানুষ না। হারলেও বাঁচি, জিতলেও বাঁচি। রায় অন্যকিছু হলে বিয়ে-বাচ্চা অবৈধ হয়ে যেত।"
তিনি বলেন, "একটা মানুষ বিয়ে করতে পারে। স্বামীকে ভালো নাও লাগতে পারে। অন্যকে বিয়ে করে বাচ্চা-স্বামী-সংসার নিয়ে ভালো থাক। অনেক হয়ছে। নাসিরের বাচ্চার জন্য শুভ কামনা। আমি হেরেও জিতে গেছি।”
রাকিবের মেয়েটা দাদা-দাদির সাথে ঝালকাঠীর নলছিটিতে থাকে। সেখানে একটি স্কুলে পড়ছে।
রাকিব বলেন, "আমার মা আমার মেয়েটাকে নিজের মেয়ের মতো করে মানুষ করছে। মেয়েটা আমার কাছে থাকুক, মা সেটাও চান না; তাকে এতোটা ভালোবাসে। স্কুল-কোচিংয়ে দিয়ে আসে, নিয়ে আসে। মেয়েটার দুঃখ, সবার মা তাদের স্কুলে দিয়ে আসে, নিয়ে আসে। কিন্তু সে তার মায়ের সঙ্গে যেতে-আসতে পারে না। সবাই মেয়েটার জন্য দোয়া করবেন, যেন ও মানুষের মতো মানুষ হয়। আর নাসির ভাইয়ের বাচ্চার জন্য দোয়া, শুভ কামনা রইল।”
মামলা বৃত্তান্ত
মামলায় বলা হয়, ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তামিমার সঙ্গে রাকিব হোসেনের বিয়ে হয়। তাদের আট বছরের একটি মেয়েও রয়েছে। কিন্তু রাকিবের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক চলমান থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা ও নাসির বিয়ে করেন।
২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা ও ক্রিকেটার নাসির হোসেনের বিয়ের ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে তা রাকিবের নজরে আসে। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তিনি এই মামলা দায়ের করেন।
সে বছর ৩০ সেপ্টেম্বর নাসির, তামিমা ও তার মা সুমি আক্তারকে আসামি করে আদালতে প্রতিবেদন দেন তদন্ত কর্মকর্তা শেখ মিজানুর রহমান।
২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে নাসির ও তামিমার বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। তবে নাসিরের শাশুড়ি সুমি আক্তারকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ওই বছরের ৬ মার্চ মহানগর দায়রা আদালতে নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন করেন তাদের আইনজীবী কাজী নজিবুল্লাহ হিরু।
অন্যদিকে সুমি আক্তারকে অব্যাহতির আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন দায়ের করেন বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশরাত হাসান।
২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দুটো আবেদনই আদালতে নাকচ হয়ে যায়। ফলে নাসির-তামিমার বিরুদ্ধে মামলা চলতে আইনি বাধা কাটে। সে বছর ২০ মার্চ বাদী রাকিবের সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু হয়।
২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। সব মিলিয়ে ১০ জনের সাক্ষ্য শোনে আদালত। এরপর গত ১০ মার্চ আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি হয়। শুনানিতে তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চান।
গত ৩০ মার্চ নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের সাবেক বিমানবালা তামিমা। তিনি দাবি করেন, ‘সাংসারিক এবং মানসিক বনিবনা’ না হওয়ায় আগের স্বামী রাকিবকে তালাক দিয়ে বৈধভাবেই তিনি ক্রিকেটার নাসিরকে বিয়ে করেন।
ক্রিকেটার নাসির হোসেনের বিরুদ্ধে পৃথক দুই ধারায় এবং তামিমার বিরুদ্ধে আলাদা তিন ধারায় অভিযোগ গঠন করে এ মামলার বিচার চলে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে নাসিরের সর্বোচ্চ সাত বছরের এবং তামিমার সর্বোচ্চ ২১ বছরের কারাদণ্ড হতে পারত। তবে আদালতের বিচারে তারা দুজনেই নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।
আরো পড়ুন
বিয়ে করে অপরাধ করেননি নাসির ও তামিমা, খালাসের রায়
নাসির-তামিমার রায় বুধবার, অভিযোগ প্রমাণ হলে কী সাজা?
নাসির-তামিমার মামলা: আসামি ও বাদীপক্ষের পাল্টাপাল্টি আবেদন, আদালত ‘বিব্রত’