০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

শুনানিতে অনুপস্থিত লিগ্যাল এইডের আইনজীবী, একতরফা রায়ে বিপাকে নারী

ভুক্তভোগী ওই নারী বলেন, মামলা চলাকালে তার স্বামী সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। সেই রায় বহাল থাকলে অন্তত চাকরি রক্ষার প্রয়োজনেই তিনি সমঝোতার চেষ্টা করতেন।

ইমরান হোসাইন ইমরান হোসাইন

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Jul 2026, 10:50 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:44 PM

স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে মামলার আপিলের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে লড়াই চালাতে বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা (লিগ্যাল এইড) অধিদপ্তরের আইনজীবী পেয়েছিলেন পটুয়াখালীর রেশমা আক্তার নিপা। তবে হাই কোর্টে শুনানির দিনগুলোতে সেই আইনজীবী উপস্থিত হননি, বিষয়টি মক্কেলকেও জানাননি। ফলে একতরফা শুনানি শেষে রায় যায় তার বিপক্ষে।

নিম্ন আদালতের রায় আংশিক বদলে হাই কোর্ট যে রায় দেয় তাতে অসন্তুষ্টি নিয়ে সেই নারী এখন সঠিক বিচারের আশায় ঘুরছেন। এরই মধ্যে ১০ বছর বয়সি ছেলে মারা যাওয়ায় মানসিকভাবেও হয়ে পড়েছেন বিপর্যস্ত।

চলতি বছর ২০ জানুয়ারি হাই কোর্টের দেওয়া ওই রায়ে রেশমার স্বামী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. জোবায়েত হোসেনের সাত মাসের কারাদণ্ড বাতিল করে শুধু ১০ হাজার টাকা জরিমানার সাজা বহাল রাখা হয়।

আপিলের রায় জানতে পেরে রেশমা তার আইনজীবী নাসরিন বেগমের শুনানিতে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনগত সহায়তা দপ্তরে অভিযোগ করেন।

অভিযোগ পেয়ে রেশমার জন্য আরেক আইনজীবীকে দায়িত্ব দিয়ে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিলের উদ্যোগ নেওয়ার তথ্য দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসার (অতিরিক্ত জেলা জজ) ইমতেয়াজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, আগের আইনজীবী নাসরিনকে প্যানেল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

রেশমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শুনানির দিন আমার পক্ষে আদালতে (হাই কোর্টে) কেউ উপস্থিত ছিলেন না। বিষয়টি জানতামই না। পরে রায়ের কথা জানতে পেরে আইনি প্রতিকার চেয়ে লিগ্যাল এইড অফিসে যাই।”

এ রায়ের প্রভাবের বিষয়ে তিনি বলেন, মামলা চলাকালে তার স্বামী সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। সেই রায় বহাল থাকলে অন্তত চাকরি রক্ষার প্রয়োজনেই তিনি সমঝোতার চেষ্টা করতেন।

“বিশেষ করে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও পেনশনের একটি অংশ আমি ও আমার সন্তান পেতে পারতাম। এই অধিকার নিশ্চিত করতেই এত কষ্ট করে মামলা চালিয়ে এসেছি। হাই কোর্টের এই রায়ে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হলাম।”

২০১৯ সালে বিনা অনুমতিতে দ্বিতীয় বিয়ে করার অভিযোগে স্বামী জোবায়েতের বিরুদ্ধে মামলা করেন রেশমা। ২০২১ সালে পটুয়াখালীর বিচারিক আদালত জোবায়েতকে সাত মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল। ২০২২ সালে পটুয়াখালীর সিনিয়র দায়রা জজ আদালত ওই সাজা বহাল রাখে।

ওই বছরই জোবায়েত হাই কোর্টে আপিল করেন। দুটি বেঞ্চ ঘুরে বিচারপতি সাইয়েদ জাহেদ মনসুরের বেঞ্চ চলতি বছর ১৪ ও ১৮ জানুয়ারি শুনানির দিন ঠিক করেন। তবে সেদিন উপস্থিত হননি তার পক্ষে আইনি সহায়তা দেওয়ার দায়িত্ব পাওয়া সুপ্রিম কোর্টের আইনগত সহায়তা দপ্তরের আইনজীবী নাসরিন।

রায়ের নথিতে রেশমির আইনজীবীর উপস্থিতির জায়গায় লেখা হয়, বিবাদীর তরফে কেউ উপস্থিত ছিলেন না।

রেশমার পক্ষে লড়তে নাসরিনকে ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। অনুপস্থিতির বিষয়ে এই আইনজীবীর দাবি, গ্লুকোমা ধরা পড়ায় তার চোখে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছিল। বিশ্রামে থাকায় আদালতে উপস্থিত হতে পারেননি।

রেশমা আক্তার নিপা।

রেশমা আক্তার নিপা।

তবে মক্কেলরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য মামলাগুলো অন্য আইনজীবীদের দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন বলে দাবি তার।

রেশমার উদ্বেগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি নিজেই ওনার সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলব এবং আশ্বস্ত করার চেষ্টা করব, যাতে ওনার মনে কোনো ক্ষোভ না থাকে। আশা করি আপিল বিভাগে বিষয়টির ইতিবাচক সমাধান হবে।”

সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রায় হওয়ার পর আইনজীবী নাসরিন তার অস্ত্রোপচারের বিষয়টি অবহিত করেন। পরে রেশমাকে বিষয়টি জানাতে চাইলে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

আইনি সেবা নিশ্চিত করতে মামলাগুলোর নিয়মিত তদারকি বা ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা থাকার প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের লিগ্যাল এইড অফিসার ইমতেয়াজুল ইসলাম জনবল সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, “আমাদের এখানে হাজারের বেশি মামলা রয়েছে। এত স্বল্প জনবল নিয়ে প্রতিটি মামলা ধরে ধরে ট্র্যাক করা কঠিন।

“এই অফিসে লিগ্যাল এইড অফিসার আমি একা; সঙ্গে গুটিকয়েক কর্মী। তবে কোনো মামলা নিয়ে এ ধরনের অভিযোগ এলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, মুহুরি ও আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিই।”

আপিলের নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও রেশমার আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিলম্ব মার্জনার আবেদন করে লিভ টু আপিল করা হবে। লিগ্যাল এইডের মামলার ক্ষেত্রে আদালত সাধারণত বিষয়টি উদারভাবে বিবেচনা করেন।”

আইনি সহায়তা অধিদপ্তরের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবীর শুনানিতে অনুপস্থিত থাকাকে সরাসরি ‘পেশাগত অসদাচরণ’ বলে মন্তব্য করেন সাবেক লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা আজিজুর রহমান দুলু।

তিনি বলেন, “এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মক্কেল ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন অথবা আইনজীবীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে অভিযোগ করতে পারেন।”

অভিযোগ প্রমাণিত হলে বার কাউন্সিল তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে তুলে ধরেন তিনি।

মামলার পূর্বাপর

২০০৪ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জোবায়েতের সঙ্গে রেশমা আক্তারের বিয়ে হয়। 

রেশমার অভিযোগ, তাকে না জানিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করায় ২০১৯ সালে তিনি মামলা করেন। স্বামীর বিরুদ্ধে ভরণপোষণের মামলাও করেন তিনি। আদালত তার ও সন্তানদের জন্য মাসিক ভরণপোষণ নির্ধারণ করলেও পারিবারিক বিরোধের অবসান হয়নি।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের রোজার ঈদের সময় জোবায়েত তাদের ১০ বছর বয়সি ছেলেকে নিজের কাছে নিয়ে যান। পরদিন তিনি ছেলের মৃত্যুর খবর পান। তখন তাকে জানানো হয়, পানিতে পড়ে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।

এ ঘটনাকে স্বাভাবিক মৃত্যু মনে না করায় রেশমা তার স্বামী ও দ্বিতীয় স্ত্রী তামান্নার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। এখন মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে।