Published : 24 Jul 2026, 11:48 PM
একটি ফেইসবুকের পোস্টের সূত্র ধরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে যে গুঞ্জন শুরু হয়েছিল, দুইদিনের মাথায় সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটল রাষ্ট্রপতির বিদায়ের মধ্য দিয়ে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার বিকালে পদত্যাগ করার পরে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করার কথা বলেছে নির্বাচন কমিশন।

শিগগির কমিশন সভায় এ বিষয়ে আলোচনা করে আনুষঙ্গিক আনুষ্ঠাকিতা সেরে তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নেবে নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক সংস্থাটি।
এদিন বিকালে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিডিনউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাষ্ট্রপতি সইসহ পদত্যাগপত্র দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়ে যাবে। স্পিকার এখন অ্যাক্টিং হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত।
“এক্ষেত্রে শূন্য পদ পূরণে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করবে। যে তারিখে পদত্যাগপত্র দেবেন তা থেকে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করবো আমরা। ”
বুধবার হঠাৎ করেই প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের এক ফেইসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন করে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হয়।
তিন সরকারের আমলে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করা সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে সায়ের ফেইসবুকে লেখেন, “আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এর চাইতেও বিস্ময়কর খবর হলো নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির কোনো শীর্ষ নেতার পরিবর্তে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।”
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এবং তার ঘনিষ্ঠ একজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তবে স্পিকার দেশে না থাকায় পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত হচ্ছে।
সে দিনই স্পিকারকে দেশে ফেরানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে। শুক্রবার দুপুরে থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আনুষ্ঠানিকতা সারা হবে বলে আভাস মেলে।
শুক্রবার বিকালে পদত্যাগ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আই অ্যাম সিক, সো ইট ইজ ডান।”
এর ঘণ্টাখানেক পর জাতীয় সংসদ ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এসে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, তিনি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র পেয়েছেন এবং তা গ্রহণ করেছেন।

স্পিকার পদত্যাগপত্র গ্রহণের পরই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়ে পড়ে; সাংবিধানিকভাবে এখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে রয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
এখন রাষ্ট্রপতির শূন্য পদে ভোটের আনুষ্ঠানিকতা শিগগির শুরু করবে এ এম এম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন ইসি। ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
মো. সাহাবুদ্দিন ছিলেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপ্রধান। একাধিক ব্যক্তি একাধিক মেয়াদে থাকায় সবশেষ বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ছিলেন অষ্টাদশ ব্যক্তি।
এবার ২৩ তম রাষ্ট্রপতির জন্য ভোটের অপেক্ষা। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নজির রয়েছে।
২০১৩ সালে ১১ মার্চে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পেয়েছিলেন তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ। ৯ এপ্রিল তফসিল ঘোষণার পর ২১ এপ্রিল বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তিনি।
২০১৮ সালে ১৪ মার্চ তফসিল ঘোষণা করা হয়, ভোটের আগেই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২২ এপ্রিল দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ।
সবশেষ ২০২৩ সালে ২৫ জানুয়ারি তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময় শেষে ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির গেজেট প্রকাশ করা হয়। বিনাভোটে নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কবে?
সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে নিজের স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র পাঠাতে হয় স্পিকারের কাছে; ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় নিজের কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ১২৩ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মেয়াদ অবসানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পূর্ববর্তী ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে তা পূরণের জন্য নির্বাচন করতে হবে।
সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে তা পূরণের জন্য নির্বাচন করতে হবে।
যেহেতু মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের কারণে শূন্য হল পদ, সেক্ষেত্রে আগামী তিন মাসের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।

নির্বাচন কমিশন এবার ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১’ অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি শুরু করবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার হন সংসদ সদস্যরা। এ লক্ষ্যে ভোটার তালিকা তৈরিসহ সার্বিক বিষয়ে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সিইসি থাকেন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনি কর্তা’।
রেওয়াজ অনুযায়ী, স্পিকারের সাক্ষাৎ চেয়ে কমিশন থেকে সংসদ সচিবালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এরপর জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে সংসদ সদস্যদের বিভক্তি সংখ্যা, নাম ও নির্বাচনি এলাকাগুলো তুলে ধরে চিঠিটি পাঠানো হয়।
স্পিকার ও সিইসির বৈঠকের পর তফসিল ঘোষণার আনুষ্ঠানিকতা সারে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ বলেন, “স্বাভাবিকভাবে আমরা কমিশন সভা করব। তাতে বিস্তারিত আলোচনা হবে, নির্বাচনি প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
“শিগগির এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
কোথায়, কীভাবে নির্বাচন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেবেন। ত্রয়োদশ সংসদে এবার সংসদ সদস্য রয়েছেন ৩৪৯ জন; একটি আসনের গেজেট প্রকাশ হয়নি।
নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করলে তাতে মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও ভোটের তারিখ ও স্থান থাকবে। ভোটের স্থান হবে সংসদ কক্ষ।
নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্যদের হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও প্রকাশ করবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাতে নির্বাচনি কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার কার্যালয়েই নির্ধারিত দিনে অফিস চলাকালে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে।

এ আইন অনুযায়ী, নির্বাচনি কর্মকর্তা নির্ধারিত দিন, সময় ও স্থানে মনোনয়নপত্র যাচাই করবেন। প্রার্থী একজন হলে এবং যাচাইয়ে তার মনোনয়নপত্র বৈধ বিবেচিত হলে কমিশন তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করবে। তবে একাধিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হলে নির্বাচনের জন্য তাদের নাম ঘোষণা করবে কমিশন।
রহমানেল মাছউদ বলেন, “সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীকে অন্তত ৩৫ বছর বয়সি এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে। সংবিধানের অধীনে অভিশংসনের মাধ্যমে আগে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকলে তিনি প্রার্থী হতে পারবেন না।”
প্রার্থীকে বর্তমান সংসদ সদস্য হতে হবে না, তবে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং আরেকজনকে সমর্থক হতে হবে। প্রার্থীর নিজেরও সম্মতিসূচক স্বাক্ষর থাকতে হবে।
সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর ১৯৯১ সালে একাধিক প্রার্থী হওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একবারই সংসদের কক্ষে ভোট করতে হয়েছিল। পরে প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দল মনোনীত প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
কীভাবে ভোট
পরোক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের ভোট দিয়ে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন করে থাকেন।
সংসদের অধিবেশন না থাকলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন হলে স্পিকার সাত দিন আগে বৈঠক আহ্বান করতে পারেন।
একাধিক প্রার্থী হলে সংসদের অধিবেশন কক্ষে নির্বাচনি কর্তা ভোটের আয়োজন করবেন। নির্ধারিত ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর নাম লিখে নিজের সই দিয়ে তা জমা দেবেন সংসদ সদস্যরা।
ভোটের দিন গ্যালারিসহ সংসদ কক্ষে প্রার্থী, ভোটার, ভোট নেওয়ায় সহায়তাকারী কর্মকর্তা ছাড়া সবার প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
ভোট শেষে নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যে ভোট গণনা করবেন। সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্তকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। আর সমান ভোট পেলে প্রার্থীদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণ করা হবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংখ্যা গরিষ্ঠ হলে সরকার দলীয় প্রার্থীরাই নির্বাচিত হয়ে থাকেন। সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনেই একমাত্র ভোটাভুটি হয়েছিল। বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
ত্রয়োদশ সংসদে বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসন পেয়ে বিরোধী দলে বসেছে। দলটির নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭ আসন। অন্যদিকে বিএনপির আসন ২১০টি। আনুপাতিক হারে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনেও বিএনপি ও মিত্রদের সদস্য বিরোধী দলের চেয়ে বেশি। ফলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
আরও পড়ুন:
'আই অ্যাম সিক, সো ইট ইজ ডান': পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন
পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন সাহাবুদ্দিন
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ