১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নগরজুড়ে পশু জবাই

ঢাকায় এ বছর প্রায় সাত লাখ পশু কোরবানি হতে পারে, তাতে ৫৫ হাজার টনের বেশি বর্জ্য তৈরি হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 May 2026, 01:01 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:19 PM

ঈদের সকালে রাজধানীতে বৃষ্টি বাধা হয়নি, নামাজ শেষে রোদেলা আবহাওয়ায় গরু-ছাগল জবাই, আর রান্না-খাওয়ায় উৎসবের আমেজে ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন মুসলমানরা।

রাজধানীতে ঈদের প্রধান জামাত হয় বৃহস্পাতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, বিচারপতি, কূটনীতিবিদসহ সর্বস্তরের মানুষ সেখানে ঈদের নামাজের পর দেশবাসীর কল্যাণ কামনায় মোনাজাতে হাত তোলেন। পাড়া-মহল্লার বেশিরভাগ মসজিদে ঈদের নামজ হয় সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে।

আবহাওয়া অফিস বলেছিল, এবার ঈদের দিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের পাঁচ বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে চার বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ হতে পারে।

ঈদের দিন সকাল ও বিকালের দিকে ঢাকায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন আবহাওয়াবিদরা।

সকালে শুরুর দিকে ঢাকার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও ঈদের নামাজের সময় বৃষ্টির বিড়ম্বনা পোহাতে হয়নি। বরং সকাল ৯টার পর রোদের দেখা মিলেছে। ঈদ জামাত শেষে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন পশু কোরবানির তোড়জোড়ে।

বৃষ্টি না থাকায় পশু জবাই ও মাংস ব্যবস্থাপনার কাজ বেশ সহজ হয়েছে নগরবাসীর জন্য। তবে আগের দিনের জমে থাকা বৃষ্টির পানির কারণে কোথাও কোথাও কিছুটা বিড়ম্বনা তৈরি করেছে।

সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থান থাকলেও প্রতিবারের মত এবারও রাজধানীর অলিগলি আর রাস্তার ওপর পশু কোরবানি দিচ্ছেন বেশিরভাগ মানুষ।

মালিবাগ, কাকরাইল, পল্টন, মগবাজার, শান্তিবাগ, মৌচাকসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাসার সামনে, গলির ভেতরে বা খোলা জায়গায় চলছে পশু জবাই ও মাংস কাটাকাটির কাজ। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যস্ততা আরও বাড়ে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নাগরিকদের নির্দিষ্ট স্থানে আনার চেষ্টা হিসেবে ৭৫টি ওয়ার্ডে ৩৫৭টি সুনির্দিষ্ট কোরবানির স্থান নির্ধারণ করে অস্থায়ী শেড ও পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তবে বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের বাসার নিচে বা রাস্তায় কোরবানি দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

ঢাকায় এ বছর প্রায় সাত লাখ পশু কোরবানি হতে পারে, তাতে ৫৫ হাজার টনের বেশি বর্জ্য তৈরি হবে। এই বিপুল বর্জ্য দ্রুততম সময়ে সরাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।

এ কাজে নিয়োজিত থাকবেন প্রায় ৪০ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ইতোমধ্যে তাদের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ে বর্জ্য অপসারণে দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ১৭ লাখের বেশি চটের ব্যাগ, পলিব্যাগ ও বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে।

কোরবানির পর দ্রুত জীবাণুমুক্ত ও দুর্গন্ধমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরবরাহ করা হয়েছে ব্লিচিং পাউডার ও স্যাভলন।

কোরবানির বর্জ্য অপসারণসংক্রান্ত নাগরিক অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দুটি হটলাইন নম্বর চালু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। নম্বর দুটি হলো— ০১৭০৯৯০০৮৮৮ এবং ০২২২৩৩৮৬০১৪।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কর্মী দিয়ে তিনদিনে প্রায় ৩৪ হাজার টন বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য নেওয়ার কথা বলেছেন প্রশাসক আবদুস সালাম।

দুপুর দেড়টায় কলাবাগানে বর্জ্যের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) থেকে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে কোরবানির বর্জ্য পরিবহন শুরু হবে। পরের ৮ ঘণ্টার মধ্যে, অর্থাৎ রাত সাড়ে ৯টার মধ্যে ঈদের প্রথম দিনের বর্জ্য অপসারণ করা হবে।

প্রশাসক বলেছিলেন, “ঈদের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ যানবাহন এবং তিনগুণ শ্রমিক মাঠে কাজ করবে। এবার লক্ষাধিকের বেশি গবাদিপশু জবাই হবে ধরে নিয়ে এবং গতবারের তুলনায় বেশি বর্জ্য হবে ধরে নিয়েই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।”

প্রথম দিনে প্রায় ১৫ হাজার ৯৩৫ টন, দ্বিতীয় দিনে প্রায় ১১ হাজার ৭৭৬ টন এবং তৃতীয় দিনে প্রায় ৬ হাজার ২৩১ টন বর্জ্য অপসারণের পরিকল্পনা রয়েছে উত্তর সিটির কর্মীদের।

নগরবাসীকে কোরবানির পশুবর্জ্য নালা-নর্দমায় না ফেলার অনুরোধ জানিয়ে প্রশাসক বলেছেন, “কোনোভাবেই কোরবানির বর্জ্য কোনো ড্রেনের মধ্যে ফেলবেন না। দেখেন বৃষ্টি যে কোনো সময় হতে পারে, কোরবানির আবর্জনা যদি আপনি ড্রেনের মধ্যে ফেলেন, তাহলে পানি আটকে যাবে, পানি রাস্তায় চলে আসবে। তখন আপনারাই বলবেন যে সিটি করপোরেশন পরিষ্কার করে নাই।”

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ১২ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২০ হাজার ৮৮৯ টন বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দিয়েছে।

বিশাল এ কর্মযজ্ঞ সফল করতে সাড়ে ৭০০ গাড়ি আর ১৬ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত করার কথা বলেছেন উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান।

বর্জ্য ডাম্পিং নির্বিঘ্ন করতে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নতুন সংযোগ সড়ক, প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেঞ্চ নির্মাণ করেছে ডিএনসিসি। এছাড়া ডিজিটাল ওয়েব্রিজের মাধ্যমে বর্জ্যবাহী গাড়ির কার্যক্রম সার্বক্ষণিক রিয়েল-টাইম তদারকি করা হবে।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিএনসিসি বলেছে, বর্জ্য সরানোর কাজ সহজ করতে ১৬ লাখ ৩০ হাজার পলিব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে। কোরবানির পর দ্রুত জীবাণুমুক্ত ও দুর্গন্ধমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে ৩ হাজার ৬০০ বস্তা ব্লিচিং পাউডার, ১ হাজার ৩৪৮ ক্যান ফিনাইল এবং ৩ হাজার ৯০০ ক্যান স্যাভলন বিতরণ করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা হলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখতে নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করেছেন। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে শহরজুড়ে মাইকিং, ডিজিটাল বিলবোর্ডে প্রচারণা, ৫০ হাজার লিফলেট বিতরণ এবং মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে প্রচার চালানো হয়েছে।

আগের টানা দুই দিনের বৃষ্টির পর ঈদের সকালে রোদ ওঠায় অনেকটাই স্বস্তিতে রয়েছেন নগরবাসী। তবে স্বস্তির পাশাপাশি নতুন করে বৃষ্টির শঙ্কা এবং কোথাও কোথাও জমে থাকা পানি নিয়ে কিছুটা বিড়ম্বনার কথাও জানিয়েছেন তারা।

মালিবাগ এলাকার বাসিন্দা আব্দুল লতিফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "কয়েক দিনের বৃষ্টি দেখে দুশ্চিন্তায় ছিলাম যে ঈদের দিন কী হবে! আলহামদুলিল্লাহ, আজ সকাল থেকে কোনো বৃষ্টি হয়নি। আমরা আরামে কোরবানির কাজ শুরু করতে পেরেছি।"

শান্তিনগরের বাসিন্দা শহিদুর রহমান সিকদার জমে থাকা পানির বিড়ম্বনা নিয়ে বলেন, "আগের দিনের বৃষ্টির পানির কারণে কিছু সমস্যা তো হচ্ছেই। নতুন করে আর বৃষ্টি না হলেই ভালো। বৃষ্টি হলে কোরবানির রক্ত ও ময়লা একেবারে ছড়িয়ে পড়বে। অল্প বৃষ্টিতেই এখানে পানি জমে যায়, তাই বৃষ্টিতে সব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে— এমন আশা করতে পারছি না।"

কাকরাইলের তরুণ সাদিদ মাহমুদ কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, "এখন পর্যন্ত তো সবই ভালো গেল। তবে ঈদের দিন আবহাওয়া সাধারণত যে 'ক্লাসিক নাটক' দেখায়, সেই ভয় পুরোপুরি উড়িয়ে দিতে পারছি না।"

মগবাজারের নূরে আলম সিদ্দিক বলেন, "সকাল থেকে তো আবহাওয়া ভালোই দেখছি। এখন ভালোভাবে কাজ সারতে পারলেই হয়। তবে আবহাওয়ার মতিগতি তো বলা যায় না। বাকিটা আল্লাহ তালা জানেন।"

ঢাকায় সকালে বৃষ্টি না হলেও বিকালের ভাগে বৃষ্টি হলে তা রাস্তা পরিষ্কারের কাজ অনেকটা সহজ করে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।