১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কাঠগড়ায় ডনের ৫৫ মিনিট, ফাঁসির দাবিতে সালমান ভক্তদের স্লোগান

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এদিন ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

কাঠগড়ায় ডনের ৫৫ মিনিট, ফাঁসির দাবিতে সালমান ভক্তদের স্লোগান
আদালতে আশরাফুল হক ডন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Aug 2026, 06:48 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:01 PM

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে আদালত চত্বরে দেখে একদিকে তার ফাঁসির দাবিতে স্লোগান উঠল, অন্যদিকে দেখা গেল তার ছবি তোলার আগ্রহ। 

রিমান্ড শুনানির জন্য ডনকে বৃহস্পতিবার ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে দেখা যায় এমন দৃশ্য।  

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এদিন শুনানি শেষে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ড শুনানির জন্য ডনকে সকালেই আদালতে হাজির করা হয়। তাকে রাখা হয় ঢাকা সিএমএম আদালতের হাজতখানায়। দুপুর ১টার পর তাকে হাজতখানা থেকে বের করা হয় এজলাসে তোলার জন্য।

এসময় ডনের হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট আর বুকে ছিল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। সংবাদকর্মী আর সালমানভক্তদের ভিড় ঠেলে ১টা ১০ মিনিটের দিকে ডনকে নিয়ে এজলাসে পৌঁছান পুলিশ সদস্যরা।

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা তখন অন্য মামলার শুনানি করছিলেন। ডনকে আসামির কাঠগড়ায় রাখা হয়। তার মাথা থেকে হেলমেট, দুই হাতের হাতকড়া খুলে এক হাতে দিয়ে কাঠগড়ার সাথে আটকে রাখা হয়। 

তবে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট তখনো গায়ে ছিল। এজলাসের সামনে সালমান ভক্তরা তখন স্লোগান দিচ্ছিলেন–‘ডনের রিমান্ড চাই, ডনের ফাঁসি চাই’। পরে পুলিশ সদস্যরা তাদের নিবৃত্ত করেন।

কিছুক্ষণ পর বিচারক জুয়েল রানা বিরতিতে যান। এ সময় আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেন ডন। কয়েকজন আইনজীবীকে ডনের ছবি তুলতেও দেখা যায়। আদালতে থাকা আরো অনেকে চান ডনের ছবি তুলতে। তবে পুলিশের বাধায় তা আর হয়ে ওঠেনি।

কালো ছাপা শার্ট, সাদা পাজাম আর হলুদ জুতা পরিহিত ডন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন নিজস্ব স্টাইলে। এসময় তাকে ঘামতে দেখা যায়। ১টা ২০ মিনিটের দিকে বিচারক জুয়েল রানা এজলাসে ওঠেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। 

রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুকী ফারুকী সর্বোচ্চ রিমান্ডের প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, "সালমান শাহর মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। মামলা করায় সালমান শাহর পরিবারকে ভয়-ভীতি দেখানো হয়। এ ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা দায়ের করা হয়। 

“ওই মামলায় ফরহাদ ওরফে রেজভী নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। রেজভী ওই মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সেই স্বীকারোক্তিতে কীভাবে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়, কে কে হত্যায় অংশ নেয়, কত টাকায় হত্যা করা হয় তা উঠে আসে।”

পিপি ফারুকী বলেন, “দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এ আসামি গত ৯ অগাস্ট পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে গ্রেপ্তার হয়।"

রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, "৩০ বছর আগে একজন জনপ্রিয় নায়ককে হত্যা করা হয়। এরপর অনেক নায়ক, অভিনেতা আসছেন কিন্তু সালমান শাহর গান, সিনেমা এখনো এখনকার প্রজন্ম দেখে। যুগ যুগ ধরে এখনো মানুষের হৃদয়ে সালমান রয়েছে। মামলাটা নিয়ে জাতি উদ্ধিগ্ন, রহস্য বের হয়ে আসুক।"

এরপর বাদীপক্ষের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীনও রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

ডনের পক্ষে ঢাকা বারের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ ও অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন চান।

তিনি বলেন, "ডন ওমরাহ করার জন্য সৌদি আরবে যাচ্ছিলেন। বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে অবগত ছিলেন না। আর তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। 

“আর রেজভী যখন গ্রেপ্তার ছিল, তখন কিন্তু এই মামলা সিআইডি তদন্ত করেছিল। তখন সিআইডি জানিয়েছিল, রেজভী কিছু জানে না। বহু ঘটনা আছে। থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশ, সিআইডি পুলিশ, এমনকি বিচার বিভাগীয় তদন্তও হয়। সবশেষ তদন্ত করে পিবিআই। সবার প্রতিবেদনে উঠে আসে, ‘আত্মহত্যা’। তার (সালমান শাহ) গলায় অর্ধচন্দ্রাকার দাগ আছে। আঘাতের চিহ্ন নাই।"

অ্যাডভোকেট ফরিদুল বলেন, "ডন সালমান শাহর কাছের বন্ধু, সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। মামলার ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে কিন্তু তিনি পালিয়ে যেতেন। রিমান্ডের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। প্রয়োজনে তাকে জেলগেইটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক।"

ডনের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, "আলোচিত মামলা, আলোচিত নায়ক। ভিলেনও আলোচিত হতে হবে। এই ভিলেনের কারণেই কিন্তু তিনি সালমান শাহ হয়েছিলেন। ডন ভিলেনের রোল প্লে না করলে সালমান শাহ হতে পারত? 

“আর যদি হত্যাকান্ড হয়, তাহলে হত্যাকান্ডকে যারা আত্মহত্যা বলে চালিয়েছে তাদের সবাইকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। তারপর ডনকে রিমান্ডে নিতে হবে। এই অবস্থায় আসামির রিমান্ড আবেদন নাকচ করে তাকে জেলগেইটে জিজ্ঞাসাবাদের প্রার্থনা করছি।"

উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে বিচারক বলেন, "একটা মানুষ মারা গেল, একটা মার্ডার কেস রেকর্ড হতে পারে না?"

পরে তিনি ডনকে ৫ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। 

এরপর ডনকে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথেও সালমানভক্তরা তার ফাঁসির দাবি জানান। 

তারা স্লোগান দেন–‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘ফাঁসি, ফাঁসি, ফাঁসি চাই, ডনের ফাঁসি চাই’।

পরে দ্রুততার সাথে ডনকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

গত ৯ অগাস্ট ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। এরপর তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। 

গত ১২ অগাস্ট ঢাকার সিএমএম আদালত তার জামিন আবেদন নাকচ করে দেয়। এরপর মঙ্গলবার মহানগর দায়রা জজ আদালতও তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে।

এরই মাঝে গত ২০ অগাস্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান তিন কারণ দেখিয়ে ডনের ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। বৃহস্পতিবার সেই শুনানি হল। 

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চিত্রনায়ক সালমান শাহ (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মারা যান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে সে সময় তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে।

ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কিন্তু পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অভিযোগটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করার আবেদন জানান তিনি।

তখন অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেয় আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে সিআইডি জানায়, সালমান শাহ ‘আত্মহত্যা’ করেন।

সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত।

দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক। তাতেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।

সালমান শাহের বাবার মৃত্যুর পর তার মা নীলা চৌধুরী মামলটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন। তিনি ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, এরা তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

মামলাটি এরপর তদন্ত করে র‌্যাব। তখন রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি তুললে ২০১৬ সালের ২১ অগাস্ট ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র‌্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন।

তখন তদন্তের দায়িত্বে আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

সেখানেও বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৫৪ জন সাক্ষীর জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে, জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি।

পিবিআই তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলে, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পারিবারিক কলহ আর স্ত্রী সামিরা হকের কারণে মা নিলুফা চৌধুরী ওরফে নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় ভুগেই অভিমানী সালমান শাহ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

ওই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট নন সালমানের মা নীলা চৌধুরী। ছেলের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, তা জানতে তিনি আরও তদন্ত চান।

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।

এরপর আবার সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েকটি বিষয় নিয়ে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়।

২০২২ সালের ১২ জুন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন গ্রহণ করেন। তবে বিভিন্ন কারণে আর রিভিশন শুনানি হয়নি।

পরে গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। 

এ বিষয়ে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে রমনা মডেল থানা পুলিশকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।

সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম এ মামলার বাদী। এজাহারনামীয় আসামিসহ অজ্ঞাতনামা পলাতক আসামিরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজসে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ্কে হত্যা করেন বলে মামলায় অভিযোগ করেছেন তিনি।