Published : 13 Dec 2025, 10:15 AM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন।
এ লক্ষ্যে প্রবাসে নিবন্ধিতদের জন্য আগামী সপ্তাহে পোস্টাল ব্যালট পেপার পাঠানো শুরু করতে পারে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
প্রবাসী ভোটারদের জন্য দুটি করে ব্যালট পেপার পাঠানো হবে। ভোট দিয়ে কাছের কোনো পোস্টবাক্সে ফেরত খাম দিতে বলেছে ইসি।
নিবন্ধনের মতো ফেরত খাম পোস্ট করারও একটা দিন নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা বলেছেন ইসি কর্মকর্তারা।
তারা বলছেন, ভোটের আগের দিন সব সামগ্রী কেন্দ্রে কেন্দ্রে যাবে। এর আগেই নির্ধারিত একটা সময়ে দেশে পৌঁছাতেই হবে। কারণ, ভোটের পরে এলে তা আর গণনার সুযোগ নেই।
নির্বাচন কমিশনের ‘আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন (ওসিভি–এসডিআই)’ প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যালট ফেরত পাঠানোর সময় ধার্য হতে পারে। হয়ত দুই-একদিন বাড়তে পারে।
আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণের দিন রেখে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোটের তফসিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ১২ থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত, তা বাছাই হবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। তার তিন সপ্তাহ পর হবে ভোটগ্রহণ।
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ হবে। সেক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র জমার জন্য ১৮ দিন সময় দেওয়া হয়েছে এবং প্রচারের জন্য ২০ দিন সময় রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে ১৮ ডিসেম্বরের দিকে নিবন্ধিত প্রবাসীদের ব্যালট পেপার ডাকযোগে পাঠাতে হবে, এমন ধারণা দিয়েছেন ইসি কর্মকর্তারা।
তফসিল ঘোষণাকালে পোস্টাল ভোটিংয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সিইসি নাসির উদ্দিন বলেছেন, “প্রায় অকার্যকর পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাকে পরিমার্জন করে এই নির্বাচনে একটি কার্যকরী রূপ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের অন্যতম চালিকাশক্তি আমাদের রেমিটেন্স যোদ্ধা তথা প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের প্রথমবারের মতো ভোটের আওতায় আনা হচ্ছে।
“একইভাবে প্রথমবারের মতো ভোটের আওতায় আসছেন আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারগণ। এছাড়াও নিজ নির্বাচনি এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মচারী এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিগণ পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে এবার ভোট দিবেন।”
শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩ লাখের বেশি প্রবাসী ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য নিবন্ধন করেছেন ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে।
‘আইটি সাপোর্টেড’ পোস্টাল ভোটিং চালু করায় প্রথমবারের মতো বিদেশে থেকে জাতীয় নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের এই সুযোগ তৈরি হয়েছে।
১৮ নভেম্বর অ্যাপটি উদ্বোধন করা হয়। পরদিন ১৯ নভেম্বর ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধনের সুযোগ পাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটাররা।
এ ছাড়া দেশের ভেতরে আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তি, ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং নিজ এলাকার বাইরে থাকা সরকারি কর্মকর্তা-তিন ধরনের ব্যক্তি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবেন।
তারা ১৭ ডিসেম্বর থেকে পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে পারবেন। ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের নিবন্ধন চলবে। তবে তফসিল ঘোষণার পরদিন থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা নিবন্ধন করতে পারছেন।
এ সময়ে বাদ পড়া প্রবাসীরাও নিবন্ধন সারতে পারবেন।
ব্যালট ধাপে ধাপে নিবন্ধিত ভোটারদের কাছে যাবে। তবে প্রতীক বরাদ্দের আগে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকছে না। অর্থাৎ ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ হওয়ার পরই যার যার আসনের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন নিবন্ধিত ভোটারা। আর দ্রুত সময়ে ভোট দিয়ে ব্যালট ফেরত পাঠাতে হবে। সময়ের মধ্যে ব্যালট না পৌঁছালে গণনায় নেওয়া হবে না।
ব্যালটে নৌকা ছাড়া নিবন্ধিত সব দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ১১৮টি প্রতীক থাকবে। এছাড়া ‘না’ ভোটের চিহ্ন থাকবে ব্যালট পেপারে।
ডিজিটাল প্লাটফর্ম থেকে আসনভিত্তিক প্রার্থী তালিকা, নাম ও প্রতীক দেখে ‘টিক’ চিহ্ন দিয়ে ভোট দেবেন পোস্টাল ব্যালটে।
ওসিভি–এসডিআই প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান বলেন, ১৭ বা ১৮ ডিসেম্বরের দিকে প্রবাসে পোস্টাল ব্যালট পাঠানোর পরিকল্পনা চলছে।

পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রক্রিয়া
দেশে ও বিদেশ থেকে পোস্টাল ব্যালটে ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে যেসব ধাপ পার হতে হচ্ছে, সেগুলো-
>> পোস্টাল ভোট বিডির প্রচার ও নিবন্ধন।
>> ব্যালট পেপার ও তিন ধরনের খাম মুদ্রণ, নির্বাচন কর্মকর্তার উপস্থিতি।
>> পার্সোনালাইজেশন (ডাক বিভাগ), পোস্টাল ব্যালট পাঠানো শুরু, ব্যালট ট্র্যাকিং, ভোট প্রদান, প্রবাসে কাছাকাছি ডাকবাক্সে খাম রাখা।
>> পোস্টাল ব্যালট ফেরত ও ট্র্যাকিং, ডাক বিভাগ গ্রহণ, রিটার্নিং অফিসারের কাছে পৌঁছানো, রিটার্নিং অফিসারের গ্রহণ, পোস্টাল ব্যালট ব্যালট বাক্সে রাখা।
>> গণনা এবং শেষ ধাপে ফল ঘোষণা।
ওসিভি: প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন যেভাবে
অ্যাপ ডাইনলোড> লগইন ও রেজিস্ট্রেশন পেইজ> এনরুলমেন্ট এর জন্য অ্যাকাউন্ট তৈরি> মোবাইল নম্বর, ইমেইল অ্যাড্রেস, ওটিপি, ভেরিফিকেশন, পাসওয়ার্ড> লগইন উইথ ইউজারনেম (মোবাইল নম্বর) ও পাসওয়ার্ড>এনআইডি ভেরিফিকেশন>ফ্যাসিয়াল রেকগনিশন, লাইভলিনেস চেক>সেলফি>প্রবাসের ঠিকানা, পাসপোর্টসহ আনুষঙ্গিক তথ্য>তালিকাভুক্ত ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন।
আইসিপিভি: সরকারি চাকরিজীবীর তালিকাভুক্তি
ওপেন এনরুলমেন্ট প্রসেস>পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপ লগইন>ই-কেওয়াইসি ডিসক্লেইমার>ফেসিয়াল রেকগনিশন, লাইভলিনেস চেক>এনআইডি ভেরিফিকেশন>আইবাস++ভেরিফিকেশন> ঠিকানা, ওটিপি>তালিকাভুক্তি ও নিবন্ধন সম্পন্ন>ভোটার তালিকা মুদ্রণ>ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠানো>ভোটার গ্রহণ করবে।
ভোটের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের তালিকাভুক্তি
ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা চূড়ান্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের পোস্টাল ভোট অ্যাপ ব্যবহার> অ্যাপ লগইন>ই-কেওয়াইসি ডিসক্লেইমার>ফ্যাসিয়াল রেকগনিশন, লাইভলিনেস চেক>এনআইডি ভেরিফিকেশন>ঠিকানা, ওটিপি>তালিকাভুক্তি ও নিবন্ধন সম্পন্ন>ভোটার তালিকা মুদ্রণ>ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠানো>ভোটার গ্রহণ করবে ব্যালট।
কারাবন্দিদের তালিকাভুক্তি
তফসিল ঘোষণার পর কারা অধিদপ্তর তালিকা>বিভিন্ন কারাগারে পোস্টাল ভোট অ্যাপ লগ ইন>ই-কেওয়াইসি ডিসক্লেইমার>ফেসিয়াল রেকগনিশন, লাইভলিনেস চেক>এনআইডি ভেরিফিকেশন> ঠিকানা, ওটিপি>তালিকাভুক্তি ও নিবন্ধন সম্পন্ন>ভোটার তালিকা মুদ্রণ>ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠানো>ভোটার গ্রহণ করবে ব্যালট।
পোস্টাল ব্যালটে যেভাবে ভোট
পোস্টাল ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট দিতে ভোটদাতার অবগতির জন্য নির্দেশাবলী দেওয়া থাকবে খামে।
“ব্যালট পেপারে সব প্রতীক মুদ্রিত হয়েছে। আপনি ভোট দিতে ইচ্ছুক হলে যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিতে চান, তার নাম ও প্রতীক নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ডিজিটাল প্যাটফর্ম (মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট ইত্যাদি)-এ দেখা যাবে। যা প্রতীক বরাদ্দের তারিখ হতে দৃশ্যমান হবে।
“ব্যালট পেপারের প্রতীকের বিপরীতে চিহ্নের স্থানে কলমের সাহায্যে একটি টিক (✔) চিহ্ন অথবা ক্রস (X) চিহ্ন দিয়ে ভোট দেবেন।”
যেসব নির্দেশ মানতে হবে
>> খামের ভেতরের ঘোষণাপত্রটি পড়ে স্বাক্ষর করতে হবে।
>> নিরক্ষরতা বা অক্ষমতার কারণে ব্যালট পেপার চিহ্নিত ও ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করতে অক্ষম হলে, জাতীয় পরিচয়পত্রধারী যে কোনো ব্যক্তি ভোটারের পক্ষে ভোট চিহ্নিত করতে ও ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে ভোটারের সম্মুখে ও তার ইচ্ছা অনুসারে ব্যালট পেপার চিহ্নিত করবেন। ভোটারের পক্ষে তাকে সত্যায়ন করতে হবে।
>> ব্যালট পেপারে ভোট চিহ্নিত করার পর ব্যালট পেপারটি এর সঙ্গে পাঠানো পোস্টাল ব্যালট চিহ্নিত ক্ষুদ্রতর খামটিতে রেখে বন্ধ করতে হবে এবং রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা মুদ্রিত থাকা খামটিতে রাখতে হবে। এরপর বৃহত্তর খামটি বন্ধ করার পর ডাকযোগে তা রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠাতে হবে।
>> নির্বাচনের শেষ সময়সীমার আগেই রিটানিং অফিসারের কাছে (ফলাফল একত্রীকরণের জন্য নির্ধারিত সময়ের পূর্বে) খামটি ডাকযোগে যেন পৌঁছে তা নিশ্চিত করতে হবে।
>> ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী ঘোষণাপত্র সত্যায়িত করাতে ব্যর্থ হলে ব্যালট পেপারটি নাকচ করা হবে।
>> নির্বাচনের শেষ সময়সীমার পূর্বে এবং ফলাফল একত্রীকরণের জন্য নির্ধারিত সময়ের পরে খামটি রিটার্নিং অফিসারের কাছে পৌঁছলে এ ভোট গণনা করা হবে না।
পোস্টাল ভোটিংয়ে প্রতি ভোটের জন্য প্রায় ৭০০ টাকা খরচ হচ্ছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অ্যাপে দেশের ভেতরে-বাইরে ১০ লাখের মতো ভোটার নিবন্ধনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
এনআইডি নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য ও নির্ভুল ঠিকানা দিয়ে অ্যাপে নিবন্ধনের পর ব্যালট পেপার ইস্যু থেকে সংশ্লিষ্ট আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানো পযন্ত ‘ট্র্যাকিং’ করা যাবে।
দেশে বর্তমানে পৌনে ১৩ কোটি ভোটার রয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে প্রচলিত পদ্ধতিতে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীর নাম ও প্রতীক দেখে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সিল মেরে ভোট দিতে হবে; গণভোটের ব্যালটেও ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এর ঘরে সিল দিয়ে ভোট দেবেন।
তবে পোস্টাল ব্যালটে শুধু প্রতীকের পাশে ‘টিক’ বা ‘ক্রস’ চিহ্ন দিয়ে ভোট দিতে হবে। গণভোটের ব্যালটেও ‘হ্যা’ বা ‘না’ চিহ্নে একই পদ্ধতিতে ভোট দেবেন ভোটাররা।
দেশের ভেতরে কারাবন্দি ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের নিবন্ধনের সুযোগ ১৭ থেকে ২৫ ডিসেম্বর।
বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বলেন, দেশের অভ্যন্তরে যে তিন শ্রেণি পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন, তারা এখন নিবন্ধন অ্যাপ ডাউনলোড করতে পারবেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনের দায়িত্বে যারা থাকবেন, তাদের তালিকা রিটার্নিং অফিসার কার্যালয় থেকে আগামী সপ্তাহে চূড়ান্ত হলে ১৭ ডিসেম্বর থেকে তারা নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন।
শেষ যে অংশটা, যারা নির্বাচনের সরাসরি দায়িত্বে থাকবেন তাদেরটা আরেকটু সময় লাগবে…এরমধ্যে রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, অ্যাসিস্টেন্ট প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসাররা নিবন্ধন করতে পারবেন।”