১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

চিন্তার সততার জন্যই আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আলাদা: ওবায়দুল হাসান

“গাফ্ফার ভাইকে অনুভবে ধারণ করাটাই এখন বেশি জরুরি,” বলছেন অভিনয়শিল্পী পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 18 Aug 2024, 03:38 PM

Updated : 26 Aug 2026, 09:36 AM

একুশের গানের রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী চিন্তার সততার জন্য অনেকের চেয়ে আলাদা হয়ে আছেন বলে মনে করেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। 

তার কথায়, “গাফ্ফার চৌধুরী তার লেখায় আপস করেননি, সত্যকে অবলীলায় লিখেছেন। তিনি ইতিহাস বিকৃত করেননি, বরং ইতিহাসের সত্যকে তুলে ধরেছেন।"

ভাষার জন্য বাঙালির রক্তদানের স্মৃতি জড়ানো ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি' গানের গীতিকার পরিচয়টি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। তবে কেবল গীতিকার পরিচয়টিই তার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন প্রধান বিচারপতি।

তার ভাষ্যে, “সাংবাদিক ও কলাম লেখক হিসেবে গাফ্ফার চৌধুরী পরিচিত হলেও তিনি একাধারে গল্পকার, কবি, নাট্যকার হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। তার সৃজনশীল কাজকে তরুণদের সামনে তুলে ধরতে হবে। তিনি জাতির বিবেকে পরিণত হয়েছিলেন। তার চিন্তায় আমরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক হওয়ার দীক্ষা পেয়েছি।"

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রোববার বিকালে শিল্পকলা একাডেমিতে আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন প্রধান বিচারপতি।

তিনি বলেন, “যে বাঙালি পরিচয়ের জন্য আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী গর্ব অনুভব করতেন, সেই বাঙালি কখনো অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে না।"

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কর্মময় জীবন নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশের আহ্বান জানান প্রধান বিচারপতি।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ৮৮ বছর বয়সে কয়েক মাস চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২২ সালের ১৯ মে যুক্তরাজ্যে মারা যান। পরে তার মৃতদেহ দেশে এনে ২৮ মে মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

অনুষ্ঠানে লেখক, গবেষক ও রাজনীতিবিদ মোনায়েম সরকার বলেন, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতন লেখক। ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার ঋদ্ধ পুরুষ। 

“ইতিহাস-বিকৃতিকারীদের আস্ফালন দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। সময় সময় পাল্টা যুক্তি ও তথ্য উপস্থাপন করে ইতিহাসের সত্যকে তুলে ধরেছেন। জীবনের শেষ বছরগুলো লন্ডনে বসবাস করলেও কখনো শেকড়ের টান থেকে দূরে থাকেননি।"

বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা বাঁক বদলের সাক্ষী গাফফার চৌধুরী ছিলেন একাত্তরের মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক জয়বাংলার নির্বাহী সম্পাদক। ১৯৭৪ সাল থেকে লন্ডনে বসবাস করলেও মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে তার কলম সোচ্চার ছিল বরাবর।

প্রবাসে থেকেও ঢাকার পত্রিকাগুলোতে তিনি যেমন রাজনৈতিক ধারাভাষ্য আর সমকালীন বিষয় নিয়ে একের পর এক নিবন্ধ লিখে গেছেন, তেমনি লিখেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, স্মৃতিকথা ও প্রবন্ধ।

মোনায়েম সরকার বলেন, “সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প যখনই বাঙালি জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে, তখনই তার প্রতিকারে লেখনী হাতে তুলে নিয়েছেন। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাঙালি জাতীয়তাবাদের দীপ্তিতে করেন ভাস্বর। তার কলাম ও সাহিত্যরাজি জাতির চেতনায় প্রজ্বালিত করে বাঙালিত্বের চিরায়ত অগ্নিমশাল।"

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, “গাফ্ফার ভাই বঙ্গবন্ধুকে ভীষণ ভালোবাসতেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর, সেই হত্যার বিচারের জন্য তিনি ইউরোপের অনেক জায়গায় গিয়েছেন। গাফ্ফার ভাইয়ের জন্য কিছু করতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।"

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, “এখন যারা শিল্প-সাহিত্যচর্চায় আছেন, তারা কি সাহস নিয়ে কথা বলছেন? আমরা এখন অনেকটাই স্থবির হয়ে গেছি। এই সময়ে গাফ্ফার চৌধুরী থাকলে চুপ থাকতেন না।"

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, “আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বুদ্ধিদীপ্ত সমালোচনা করে রাষ্ট্রের অসংগতি আমাদের সামনে তুলে ধরতেন। আমাদের সমাজ ক্রমশ ধর্মান্ধতায় ডুবে যাচ্ছে, আমাদের অর্থনীতির দুর্বৃত্তায়ন বাড়ছে, তখন গাফ্ফার ভাইয়ের লেখা আমাদের মনে পড়ছে। তিনি থাকলে এই সময়ের অসংগতিগুলোও লিখতেন।"

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা শাহরিয়ার কবির বলেন, “হাজারের বেশি কলাম পত্রিকায় লিখেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। তার অসংখ্য সৃজনশীল লেখা রয়েছে, সেই লেখাগুলো সংকলিত করা উচিত। বিশেষ করে আজকে যারা সাংবাদিকতায় যুক্ত; তারা এই লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে বুঝতে পারবেন সাংবাদিকতায় কতটা সাহসী হতে হয়।"

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ‘মনেপ্রাণে’ বাঙালি ছিলেন মন্তব্য করে সংসদ সদস্য আরমা দত্ত বলেন, “তাকে আমি কাকু বলে ডাকতাম। আমার বাবার বন্ধু হিসেবে তাকে আমি পারিবারিকভাবেই চিনতাম।"

অনুষ্ঠানে একুশের গানের ইতিহাস তুলে ধরেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ।

অভিনয়শিল্পী পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “গাফ্ফার ভাইকে অনুভবে ধারণ করাটাই এখন বেশি জরুরি। তার সৃজনশীল কাজকে অনুধাবন করা জরুরি। 

“বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা, শেখ হাসিনার প্রতি ভালোবাসা, অসাম্প্রদায়িকতার বিষয়ে আপসহীন থাকার এক অনন্য নাম আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।"

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী স্মৃতি সংসদের আহ্বায়ক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, সংগঠনের সদস্য সচিব সৈয়দ সামাদুল হক, সাংবাদিক আবেদ খান, প্রয়াতের ভাতিজা ফুয়াদ চৌধুরী অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় শিল্পীদের কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি' গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। পরে দেখানো হয় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী নির্মিত ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি' নাটকের খন্ডাংশ।

এর আগে সকালে প্রয়াতের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে স্মৃতি সংসদের দিনব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয়। পরে বিকাল সাড়ে ৩টায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় আলোকচিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী।