Published : 26 May 2025, 11:57 PM
গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল আহসান সাধনকে গুলি করে হত্যার পেছনে ‘রাজনৈতিক’ কিংবা ‘ব্যবসায়িক’— কোনো কারণই এখন পর্যন্ত পুলিশ নিশ্চিত হতে পারেনি; কাউকে গ্রেপ্তারও করা যায়নি।
পুলিশ বলছে, জড়িতদের কাউকে গ্রেপ্তারের আগে হত্যার কারণ ‘নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়’।
সাধনের স্ত্রী বলছেন, বাসা থেকে বের হওয়ার আগে একটা ফোন আসে। ফোনে কথা বলার পরই সাধন বাসা থেকে বেরিয়ে যান। কিন্তু কে ফোন করেছিল, সে তথ্য তিনি দিতে পারেননি।
আবার সাধনের সঙ্গে কারো বিরোধ ছিল কিনা, সে বিষয়ে স্বজন কিংবা পরিচিতদের কেউ কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
রোববার রাত ১০টার দিকে বাড্ডা গুদারাঘাট ৪ নম্বর গলির একটা চায়ের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় সাধনকে গুলি করে পালিয়ে যান দুই ব্যক্তি। হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।
কামরুল আহসান সাধন ২০১৮ সাল থেকে এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবসা করেন। মধ্য বাড্ডার বউবাজার এলাকায় ৫৬/৭ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার ভাড়া বাসায় স্ত্রীসহ প্রায় ২২ বছর ধরে বসবাস করছিলেন তিনি।
নিঃসন্তান এই দম্পতির বসবাস করা এই বাড়ির মালিক কাইয়ুম কমিশনার।
বাসা থেকে দুই মিনিটের হাঁটাপথের দূরত্বে বাড্ডা হাই স্কুল সংলগ্ন একটি বাসায় ছিল তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘স্বদেশ কমিউনিকেশনের’ অফিস। এর পরের গলিতেই স্থানীয় তিন বন্ধুর সঙ্গে বসে থাকার সময় গুলিতে খুন হন সাধন।

এ ঘটনায় সোমবার সকালে নিহতের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার অজ্ঞাতদের আসামি করে একটি মামলা করেছেন বলে জানিয়েছেন বাড্ডা থানার ওসি সাইফুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “ঘটনাস্থল ও আশপাশের একাধিক সিসিটিভির ভিডিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, চার নম্বর রোডে দুই ব্যক্তি সাধনকে গুলি করে হেঁটে চলে যাচ্ছেন।”
সোমবার দুপুরে সাধনের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, শোকস্তব্ধ স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতে স্বজন ও প্রতিবেশীর ভিড় করেছেন। হত্যার ঘটনায় ‘বিস্ময়’ প্রকাশ করে প্রায় সবাই বলছিলেন, এলাবাবাসী ও পরিচিতজনদের মধ্যে তিনি অনেক ‘পছন্দের মানুষ’ ছিলেন।
দিলরুবা আক্তার বলেন, “উনি রাত পৌনে ১০টার দিকে বাসায় আসেন। প্রতিদিন এই সময়েই ফেরেন। খাবার ও ওষুধ খেয়ে আবার হাঁটাহাঁটি করতে যান, পরে রাত ১১-১২টার দিকে বাসায় ফেরেন। কাল যখন বাসায় আসেন, তখন কোনো কথা হয় নাই; আমি নামাজে ছিলাম। আমি বলছিলাম, নামাজ শেষ কইরা খাবার দিব, উনি শুধু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেন।
“এরমধ্যেই উনার মোবাইলে একটা ফোন আসে; এরপর বের হয়ে গেল। কে ফোন দিছে জানি না। আমার সঙ্গে আর কথা হয় নাই; একটু পরেই তো এ ঘটনার খবর পাইলাম।”
তার স্ত্রী কারো সঙ্গে শত্রুতার তথ্য দিতে পারেননি, বলতে পারেননি আর্থিক লেনদেন নিয়ে কারও সঙ্গে ঝামেলা ছিল কিনা।
তার ভাষ্য, “কিছুই অনুমান করতে পারতাছি না। ছোট থেইকা এই এলাকায় বড় হইছে, প্রত্যেকেই তারে অনেক আদর করে। ব্যক্তিগত জীবনে কারও সঙ্গে রেষারেষি ছিল না। উনার লাইন (ইন্টারনেট সংযোগ) নেওয়ার জন্য সবাই পাগল। নিজেই সব কাজ করতেন, দুইটা ছোট ছোট ছেলে ছিল, উনারে সহযোগিতা করার জন্য।”
দিলরুবার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাধনের আগে গুলশানে সোনালী ব্যাংকের নিচে ‘দেশ রেস্টুরেন্ট’ ছিল। সেটি ছেড়ে দেওয়ার পর ২০১৮ সাল থেকে ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবসা শুরু করেন।
সাধনের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদর থানা এলাকায়; বাবা-মা বেঁচে নেই। তার একমাত্র বোনের বাসা ঢাকার উত্তরা এলাকায়।
বাড্ডা গুদারাঘাট থেকে এগিয়ে লেকের দিক থেকে শুরু হওয়া প্রথম গলিটিই চার নম্বর গলি। এর শেষমাথায় একপাশে ‘আকাশ ফল বিতান’ নামে একটি জুসের দোকান; অপরপাশে ‘হানিফ ভ্যারাইটি স্টোর’ নামে একটি চায়ের দোকান।

আকাশ ফল বিতানের সামনের দিকে সড়কের পাশে চার বন্ধু মিলে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসেছিলেন সাধন। সেখানেই তাকে লক্ষ্য করে দুই ব্যক্তি গুলি করে হেঁটে ‘স্বাভাবিকভাবে’ পালিয়ে যান।
সোমবার জায়গাটি কয়েকটি কাঠের বেঞ্চ ও টেবিল দিয়ে ঘিরে রাখে পুলিশ। মাঝখানে রক্তের দাগও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
পাশের ‘অ্যালিগেন্স বিউটি পার্লারের’ সামনে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে হামলার দৃশ্য ধরা পড়েছে, যেটি রোববার রাতেই ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার সময় দোকানেই ছিলেন ‘হানিফ ভ্যারাইটি স্টোরের’ মালিক মো. হানিফ।
তিনি বলেন, “সন্ধ্যার পর থেকে চায়ের দোকানে এমনিতেই ভিড় থাকে। আমি কাস্টমার সামলাইতেছি, এরমধ্যে হঠাৎ কয়েকটা শব্দ হইল। মানুষজন এরমধ্যে বলা শুরু করল গুলি করছে, গুলি করছে। এ সময় একটা দৌড়াদৌড়ি শুরু হইলে আমিও দোকান থেকে বের হইয়া যাই। পরে আরও মানুষের ভিড় বাইরা গেলে আবার দোকানে ঢুকি।”
পাশের ‘আরএম বার্ড হোম’ নামে পাখি কেনাবেচার একটি দোকানের মালিক রিজভী রহমান বলেন, “আমি কাস্টমার সামলাইতেছিলাম। হঠাৎ কইরা শব্দ শুইনা ভাবছি পটকা, পরে শুনি গুলি করছে। সাধন ভাই প্রায় সময়ই এইখানে আসত, আড্ডা দিত।”
ঘটনার সময় জাকির হোসেন রূপক, আবুল হোসেন, কামরুল ইসলাম বাবুলসহ একসঙ্গে বসা ছিলেন সাধন। চারজনই এলাকার স্থানীয় বন্ধু। এরমধ্যে কামরুল ইসলাম বাবুল স্থানীয় কাইয়ুম কমিশনারের ভাগ্নে। সাধনের বাড়ির দ্বিতীয় তলাতেই পরিবারসহ বসবাস করেন তিনি।
সাধন বাসা থেকে বের হওয়ার আগে কে ফোন করেছিল, বিষয়টি জানেন না কামরুল ইসলাম বাবুলও। তথ্য দিতে পারেননি সাধনের সঙ্গে কারও পূর্ব শত্রুতা বা দ্বন্দ্বের বিষয়েও।
তিনি বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকে বন্ধু, একসঙ্গে বড় হইছি। ঘটনার ৫-৭ মিনিট আগে আইসা বসছে। তাকে কে ফোন দিছিল জানি না। সে এখানে আসার পরই আমাদের দেখা হইছে।
“সিসিটিভি ফুটেজে দুই শ্যুটারের বাইরেও সন্দেহভাজন আরও দুজনকে দেখা গেছে বলে শুনতে পেরেছি। তারা নাকি ডা. জিয়া নামে একজনের বাড়ির কোনায় দুই শ্যুটারের সঙ্গে কথা বলে এদিকে আসে।”

সাধনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘স্বদেশ কমিউনিকেশনের’ অফিসের বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক আবুল হাসেম বলেন, “গুলি খাওয়ার পাঁচ মিনিট আগে তিনি অফিসে আসছিলেন। আইসা বাইক রাইখা ইন্টারনেটের দুইটা বক্স অফিসে রাইখা চইলা গেলেন। এখানে আসা থেইকা গুলি খাওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১০ মিনিটের ব্যবধান।”
এমনিতে তার অফিসে দুজন কর্মচারী ছাড়া তেমন কারও আসা যাওয়া ছিল না বলেও জানান তিনি। এই এলাকায় তার শখানেক কানেকশান থাকতে পারে বলে ধারণা হাসেমের।
এ ঘটনায় করা মামলায় বাদী লিখেছেন, এলোপাতাড়ি গুলিতে সাধনের ঘাড়ে, কাঁধে, পিঠে, বুকের নিচের অংশে ও পেটে জখম হয়। প্রথমে অটোরিকশায় মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে নিয়ে গেলে তিনি মারা যান। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার ময়নাতদন্ত হয়।
ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণের কথা জানিয়ে পুলিশের বাড্ডা জোনের সহকারী কমিশনার এইচ. এম. শফিকুর রহমান বলেন, “শ্যুটার দুইজন প্রথমে গলির যে প্রান্তে নিহত সাধন বসা ছিলেন, সে প্রান্ত থেকে হেঁটে লেকের দিকে যান। গলির আরেকপাশে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন, এরপর লোকজনের ভিড় একটু কমলে হেঁটে গিয়ে কাছ থেকে গুলি করে চলে যায়।”
তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করতে যতদূর পর্যন্ত অন্যান্য সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া গেছে, ততদূর পর্যন্ত তাদেরকে স্বাভাবিকভাবেই হেঁটে চলে যেতে দেখা গেছে। তবে পুরোটা সময়ই তারা মাস্ক পরা থাকায় চেহারা বোঝা যায়নি বলেও জানান পুলিশের এ কর্মকর্তা।
পুলিশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলছেন, “সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িত দুজনের শারীরিক আকার ও গঠন অনুযায়ী আমরা ৫-৬ জনের একটি তালিকা করেছি। তবে এখন পর্যন্ত সিডিআর রেকর্ড অনুযায়ী সন্দেহভাজনদের লোকেশন ঘটনার সময় ঘটনাস্থলের আশপাশে পাওয়া যায়নি। আমরা অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে দুজনকে শনাক্ত করার কাজ করছি।”
হত্যার ‘মোটিভের’ বিষয়ে কোনো ধারণা পাওয়া গেছে কিনা জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার শফিকুর বলেন, “আমরা তার ব্যবসা নিয়ে কোনো দ্বন্দ্বের তথ্য এখনও পাইনি। আগে থেকেই তাদের ব্যবসার জন্য নির্ধারিত এলাকা ছিল বলে শুনেছি, একজন আরেকজনের এলাকায় যান না।
“রাজনৈতিক কোনো দ্বন্দ্বের তথ্যও পাইনি। এখন জড়িত কাউকে গ্রেপ্তারের আগে বিষয়টা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।”
ফোন পেয়ে বের হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা সিসিটিভি ফুটেজে দেখেছি, সাধন স্বাভাবিকভাবেই সেখানে বসা ছিল। তবে আমরা ফোনকলের বিষয়টিসহ সবকিছুই খতিয়ে দেখব।”