Published : 09 Nov 2025, 05:40 PM
বাংলা একাডেমির সংগ্রহশালার জন্য দান করা জাহানারা ইমামের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালার বই বিক্রি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে বাংলা একাডেমি।
একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম লিখিত ব্যাখ্যায় বলছেন, দৈনিক প্রথম আলোর ওই "প্রতিবেদনে কিছু আংশিক সত্য উপস্থাপন করা হয়েছে; কিছু অংশ এমনভাবে হাইলাইট করা হয়েছে, যাতে প্রতিবেদনে অন্যরকম উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও পাঠক বিভ্রান্তির মধ্যে পড়বেন।"
"অনলাইনে বিভ্রান্তিকর শিরোনাম এবং হাইলাইটস ব্যাপকভাবে টেমপ্লেট আকারে প্রচারিত হয়েছে। অন্য অনেকেই একই ধরনের হাইলাইট ব্যবহার করে সংবাদ প্রচার করেছে। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বভাবতই এ স্পর্শকাতর বিষয়ে বহুজন নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন।"
বাংলা একাডেমির ভাষ্য, ২০২৪ সালের শুরুতে একাডেমির আগের প্রশাসন বই বিক্রির ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। হাজার হাজার ‘মানহীন ও পরিত্যক্ত’ বইয়ের মধ্যে যে জাহানারা ইমামের ব্যক্তিগত কিছু বইও ছিল, সে বিষয়ে একাডেমির বর্তমান প্রশাসনের কোনো ধারণা ছিল না।
সেই হিসেবে প্রতিবেদনের ‘আংশিক সত্যতা’ স্বীকার করে নিলেও প্রতিবেদনের শিরোনাম ও উপস্থাপনার ভঙ্গি নিয়ে সমালোচনা করে মোহাম্মদ আজম বলেছেন, “প্রতিবেদনটি উদ্দেশ্য-প্রণোদিত সাংবাদিকতার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”
শনিবার দৈনিক প্রথম আলোতে ‘জাহানারা ইমামের দেওয়া বই বিক্রি করেছে বাংলা একাডেমি, এখন দাম হাঁকা হচ্ছে লাখ টাকা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
সেখানে বলা হয়, “পুরোনো বই বিক্রির ফেসবুক পেজ ‘পুস্তক জোন’ গত ২২ সেপ্টেম্বর পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত জর্জ বার্নাড শ এর ‘প্লেস আনপ্লিজেন্ট’ বইটি বিক্রির পোস্ট দেয়। বইয়ের ভেতরে বাংলা একাডেমির সিল, পাশে লেখা– ‘জাহানারা ইমামের ব্যক্তিগত সংগ্রহ’। এই বিজ্ঞাপন দেখে খবর নিতে গিয়ে দেখা গেল জাহানারা ইমামের ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা অন্তত ২০টি বাংলা ও ইংরেজি বই বাংলা একাডেমি থেকে বিক্রি হয়ে গেছে কেজি দরে।
“বইগুলো বিক্রি করছে পুরোনো বই বিক্রি করার কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংগ্রহ ‘বিচিত্র বিচিত্র বই’ পেজের। যোগাযোগ করা হলে এই প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারী মো. রাশেদ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি নীলক্ষেতসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় এক ট্রাক পুরোনো বই কিনেছেন। তার মধ্যে পান জাহানারা ইমামের স্বাক্ষর দেওয়া দুটি বাংলা ও পাঁচটি ইংরেজি বই।”
এ বিষয়ে ব্যাখ্যায় বাংলা একাডেমি বলছে, গত ২৫ জুন থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত ‘পরিত্যক্ত হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে মজুতকৃত’ কয়েক হাজার বই এবং অন্য কাগজপত্র ‘বিধি মোতাবেক‘ নিলামে বিক্রি করেছে একাডেমি।
“এর মধ্যে আছে বইমেলায় জমা হওয়া বিপুল সংখ্যক বই, যে বইগুলো প্রতি বছর কমিটির মাধ্যমে বাছাইকৃত হয়ে মানহীন ও পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়; আছে গ্রন্থাগারের যে বইগুলো ব্যবহার-অযোগ্য ঘোষিত হয় সেগুলো; এবং বাংলা একাডেমির নিজস্ব প্রকাশনার যেসব বই নানা কারণে বিক্রয়-অযোগ্য হয়ে ওঠে সেগুলো।
“এ ধরনের বইপুস্তক বহুদিন ধরে গ্রন্থাগার-সংলগ্ন একটি ঘরে গুদামজাত করা হয়। এটি পরিত্যক্ত বইয়ের গুদাম। এখানকার বইগুলোই সম্প্রতি নিলামে বিক্রি করা হয়েছে।”
এসব বই বিক্রি করতে হল কেন, সেই ব্যাখ্যায় বাংলা একাডেমি বলেছে, “ঘরটি সম্পূর্ণ ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। আগামী মেলায় প্রাপ্ত বই এবং অন্যসব কারণে পরিত্যক্ত হওয়া সম্ভাব্য বই রাখার কোনো জায়গা ওই ঘরে আর অবশিষ্ট ছিল না। ফলে ঘর খালি করার প্রয়োজন হয়েছিল। বিক্রির আগে গ্রন্থাগার ও সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হয়েছিল। তারা নিশ্চিত করেছে যে, এগুলো বহু বছর ধরে জমা হওয়া পরিত্যক্ত বই।”
এখন প্রশ্ন, বাংলা একাডেমি কি জাহানারা ইমাম, আহমদ শরীফ, মুক্তাগাছা সংগ্রহ বা অন্য কোনো তালিকার বই বিক্রি করেছে?
বাংলা একাডেমি বলছে, “আসলে এ ধরনের কিছুই ঘটেনি। কয়েক বছর আগে থেকে জাহানারা ইমামসহ অন্যদের দেওয়া বইগুলো যেভাবে ছিল ঠিক সেভাবেই আছে। এ বিষয়ে কোনো নতুন কমিটি গঠিত হয়নি, বা সংগ্রহশালা পুনর্মূল্যায়নের কোনো ঘটনাও ঘটেনি।
“অন্তত এক দশক ধরে জমা হওয়া পরিত্যক্ত বইগুলোই কেবল বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্যে গত এক বছরে নতুন যুক্ত হয়েছে কেবল গত বছরের বইমেলায় প্রাপ্ত মানহীন ও পরিত্যক্ত ঘোষিত বইগুলো।”
এ তালিকায় জাহানারা ইমাম সংগ্রহের বেশ কিছু বই কীভাবে যুক্ত হল, সেই ব্যাখ্যায় বাংলা একাডেমি বলছে, ২০১৪ সালে ‘বাংলা একাডেমি গ্রন্থাগার পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত কমিটি’ গঠিত হয়। কমিটির প্রথম সভা হয় ওই বছরের ১৩ জানুয়ারি।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে সেই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, একটি নীতিমালা করে সে অনুযায়ী গ্রন্থাগার থেকে কিছু বই ছাঁটাই করতে হবে। সেজন্য মো. মোবারক হোসেন, অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ, সুব্রত বড়ুয়া, বিশ্বজিৎ ঘোষ ও রেজিনা আক্তারকে নিয়ে একটি উপ কমিটি করা হয়। কোন বইগুলো গ্রন্থাগারে থাকবে না তা নির্ধারণ করে সেই উপ কমিটি।
বাংলা একাডেমি বলছে, তাদের রক্ষিত তালিকা অনুযায়ী, পরিবারের পক্ষ থেকে জাহানারা ইমামের মোট ৩৫৯টি বই দেওয়া হয়েছিল। বাছাইয়ের পরে অধিকাংশ বই সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট হয়।
“বাংলা একাডেমি গ্রন্থাগারে সংরক্ষণার্থে গ্রন্থ বাছাই কমিটির বাছাইকৃত গ্রহণযোগ্য বইয়ের তালিকা (জাহানারা ইমাম) প্রণয়ন করা হয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। ওই বইগুলো বাংলা একাডেমির নির্দিষ্ট সেলফে মজুদ আছে। সেখানে বইয়ের সংখ্যা ৩০৮টি। তিনতলার নির্ধারিত স্থানে যে কেউ বইগুলো দেখতে এবং ব্যবহার করতে পারবেন।
“জাহানারা ইমামসহ অন্য সংগ্রহের যেসব বই গ্রন্থাগারের জন্য উপযোগী বিবেচিত হয়নি, সেগুলো আলাদা করে আর্কাইভ করা যেত। কিন্তু এ ধরনের পরিকল্পনা তখনকার দায়িত্বশীলরা কেন করেননি তা এখন অনুমান করা কঠিন। তখন একাডেমি-প্রশাসনের প্রধান পদগুলোতে যারা ছিলেন, তাদের অনেকেই গত হয়েছেন; অন্যরাও এখন আর একাডেমিতে কর্মরত নেই। তখন গ্রন্থাগারের দায়িত্বে যারা ছিলেন, তারাও কেউ নেই। ফলে এই পরিত্যক্ত বইয়ের ভান্ডারে জাহানারা ইমাম সংগ্রহের কোনো বই তো দূরের কথা, কোনো ব্যবহার্য বই থাকতে পারে এমন দূরতম অনুমান করারও বাস্তবতা ছিল না।”
ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “বাংলা একাডেমির বর্তমান দায়িত্বরতদের সম্পর্কে বলা যায়, বইগুলো বিক্রির আগে আরেকবার পরীক্ষা করা যেত। কিন্তু বইয়ের সংখ্যা ছিল আক্ষরিক অর্থেই হাজার হাজার। তদুপরি, গুরুত্বপূর্ণ কোনো বই এখানে থাকতে পারে, এমন সম্ভাবনাও সংশ্লিষ্ট কারো অভিজ্ঞতায় ছিল না।”
প্রথম আলোর প্রতিবেদক সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমামের প্রতিবেদনটি ‘উদ্দেশ্য-প্রণোদিত সাংবাদিকতার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে’ মন্তব্য করে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম ব্যাখ্যায় বলেন, “এ প্রতিবেদকের সাথে আমার বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে। তাকে পুরো বিষয়টি অনেকবার বলা হয়েছে। তবু তিনি এমন শিরোনাম করেছেন, যাতে মনে হবে, জাহানারা ইমামের বই আলাদা করে অথবা শনাক্ত করে অথবা ইচ্ছা করে বিক্রি করা হয়েছে, এবং কাজটা করেছে বর্তমান প্রশাসন।
“তিনি লিখেছেন, ‘বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম অবশ্য বলছেন, ২০১৪ সালে গঠিত একটি কমিটি একাডেমির সংগ্রহশালায় একাধিক কপি থাকা এবং অসংরক্ষণযোগ্য কিছু বই বাতিল বলে নির্ধারণ করেছিল, সেগুলোই বিক্রি করা হয়েছে।’ এ বাক্য পড়লে যে কারো মনে হবে, বইগুলো আলাদা করে রাখা ছিল। মোটেই তা নয়। বইগুলো বহু বছর আগে থেকেই কয়েক হাজার বইয়ের পরিত্যক্ত মজুদের সাথে রাখা ছিল, এবং সে তথ্য এখন কর্মরত একাডেমির কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে ছিল না।”
প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃত করে মোহাম্মদ আজম বলেছেন, “প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ‘বাড়তি কিংবা অসংরক্ষণযোগ্য বই বিক্রির যুক্তি বাংলা একাডেমি দিলেও এক্ষেত্রে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের নীতি পরিপন্থি কাজ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশে এবং বিদেশে গ্রন্থাগার পরিচালনার কাজে যুক্ত থাকা বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী। তিনি বলছেন, বিশিষ্ট ব্যক্তির সংগ্রহশালার বই এভাবে বিক্রি করা ‘স্পষ্ট অন্যায়’।
“বাংলা একাডেমি আসলে ‘বাড়তি কিংবা অসংরক্ষণযোগ্য বই বিক্রির যুক্তি’ দেয়নি, প্রায় এক যুগ আগে সংঘটিত একটা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে কেবল। যেখানে বইগুলো চিহ্নিতই ছিল না, সেখানে ‘স্পষ্ট অন্যায়টা কার, তা স্পষ্ট না করে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন জাহানারা ইমামের বইগুলোই বিক্রি করা হয়েছে।
“তার অসঙ্গত মনোভাব এবং উদ্দেশ্য প্রকাশ পেয়েছে প্রতিবেদনের এ অংশে: ‘বাংলা একাডেমির নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলায় জাহানারা ইমামসহ কয়েকজনের ব্যক্তিগত বইয়ের সংগ্রহ এখনো আছে। সেখানে আলমারির ওপর নাম লিখে রাখা আছে, কার সংগ্রহ কোনটি। তার কিছু বই–ই বিক্রি করা হয়েছে।’ এ অংশ, বিশেষত শেষ লাইনটি পড়লে যে কারো মনে হবে, আলমারিতে রাখা বইগুলো থেকে কিছু বই বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা উপরে ব্যাখ্যা করেছি যে, ঘটনা এর ধারেকাছেও কিছু নয়।”
প্রতিবেদক ছাঁটাই কমিটি সম্পর্কেও ‘মনগড়া তথ্য দিয়েছেন’ বলে দাবি করা হয়েছে বাংলা একাডেমির ব্যাখ্যায়।
“প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার বাংলা একাডেমির গ্রন্থাগার বিভাগের ছিল বলে জানান ওই উপকমিটির সদস্য রেজিনা আক্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কোন বইটি বাতিল করা হবে বা সংরক্ষণযোগ্য না, সে সিদ্ধান্ত নেয় গ্রন্থাগার বিভাগ।’ আসলে যাচাই-বাছাই না করে স্রেফ একজন সদস্যের কথার ভিত্তিতে এখানে যা বলা হয়েছে, তা মোটেই সত্য নয়।”
মোহাম্মদ আজম তার ব্যাখ্যায় বলেছেন, “আমি এ প্রতিবেদককে ২০১৪ সালে গঠিত কমিটির রিপোর্টসহ আরো লিখিত তথ্য দিয়েছি। এবং অনুরোধ করেছি, তিনি যেন সরেজমিন ব্যাপারটা দেখেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেন। তিনি জানিয়েছেন, তার এত সময় নেই। স্পষ্টতই খুব স্পর্শকাতর একটি ইস্যুকে পুঁজি করে ‘ভাইরাল’ প্রতিবেদন প্রণয়নই ছিল তার উদ্দেশ্য। তার অন্যতম প্রমাণ এই যে, আহমদ শরীফ, সিকান্দার আবু জাফরসহ আরো কয়েকজনের বই পাওয়া গেলেও তিনি সে তথ্যটিকে উচ্চকিত হতে দেননি।
“আমরা সংবাদমাধ্যম এবং আগ্রহী সকলকে অনুরোধ করব, তারা যেন বাংলা একাডেমির গ্রন্থাগারে এসে সংগ্রহশালা দেখেন। তাহলেই বোঝা যাবে, বহু বছর আগে এ সংগ্রহশালার যে তালিকা নির্দিষ্ট করা হয়েছিল, তা অক্ষত আছে।”
লিখিত ব্যাখ্যায় বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বলেছেন, “জাহানারা ইমামসহ আমাদের দেশের শ্রদ্ধেয় মানুষদের বেশ কিছু বই বাংলা একাডেমির সিলসহ নীলক্ষেতে কিংবা অনলাইন প্লাটফর্মে বিক্রি হচ্ছে–এ ঘটনায় নিঃসন্দেহে বাংলা একাডেমির দায় আছে। কিন্তু বহু বছর আগে ঘটে যাওয়া একটা দায় কৌশলে বহুগুণ বাড়িয়ে বর্তমান প্রশাসনের ওপর বর্তানো নিশ্চয় সুরুচির পরিচয় নয়, সাংবাদিকতার তো নয়ই।”