১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

হুমায়ুন কবিরের ‘ব্রিটিশ নাগরিকত্ব’ বিতর্ক: আইনের ‘ব্যত্যয় দেখছেন না’ আইনমন্ত্রী

“যখন শপথ নেওয়া হয়েছে আমরা সাংবিধানিকভাবেই নিয়েছি,” বলেন তিনি।

হুমায়ুন কবিরের ‘ব্রিটিশ নাগরিকত্ব’ বিতর্ক: আইনের ‘ব্যত্যয় দেখছেন না’ আইনমন্ত্রী
সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Aug 2026, 08:44 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:54 PM

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের ‘ব্রিটিশ নাগরিকত্ব’ নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, সে বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সরকার যা করেছে তা ‘সংবিধান মেনেই করেছে’। 

সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, “সরকার যেটা করেছে সংবিধান মেনেই করেছে। এখানে বত্যয়ের কোন কিছু ঘটেনি। শুধু আমরা যা করেছি সাংবিধানিকভাবেই করেছি।”

মন্ত্রীর ভাষায়, “এটাকে বলে ‘ডিমিং ক্লজ’।

“যখন শপথ নেওয়া হয়েছে আমরা সাংবিধানিকভাবেই নিয়েছি।”  

আসাদুজ্জামান বলেন, “আমরা মনে করি, প্রত্যেকটা মানুষের ‘লিগ্যাল এইড’ পাওয়ার অধিকার আছে। এটা মানবাধিকার এবং মৌলিক অধিকার।”

সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নানা বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দেন হুমায়ুন কবির।

তার ‘ব্রিটিশ নাগরিকত্ব’ থাকার বিষয়ে একটি সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের প্রসঙ্গ টেনে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলে উত্তরে তিনি বলেন, “কোন নিউজপেপার? কার এত জ্বালা? মানে কাজকর্ম থুইয়া…”

টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় ঢোকা হুমায়ুন কবির বলেন, “আমি বাংলাদেশি। এখানে তো বাংলাদেশি মিনিস্টার হিসেবে আছি। আমি মনে করি না আমার বাংলাদেশিত্ব নিয়ে কেউ প্রশ্ন করবে। মানে এখানে আসিয়া বাংলাদেশের জন্য কাজ করা, মানে তো কোনো সুবিধাভোগী লোক করবে না।”

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে গেল শুক্রবার শপথ নেন এতদিন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে আসা হুমায়ুন কবির। এরপর ছোটবেলা থেকে যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা এই বিএনপি নেতার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকা এবং সেটা ছাড়ার প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

যুক্তরাজ্যের কোম্পানি নিবন্ধকের কার্যালয় ‘কোম্পানিজ হাউজ রেজিস্ট্রার’ এর সোমবারের তথ্য বলছে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিক। তার আবাসস্থল যুক্তরাজ্য বলে সেখানে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

‘হ্যামলেটস কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সিআইসি’ নামে একটি কোম্পানির পরিচালক ছিলেন হুমায়ুন কবির, যা নিবন্ধন করা হয় ‘কোম্পানিজ হাউজ রেজিস্ট্রারে’।

ব্রিটিশ সরকারি সেবা ও তথ্যের ওয়েবসাইট ‘গভডটইউকে’ এ ওই কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্য দেওয়া রয়েছে। এতে দেখা যায়, হুমায়ুন কবির ওই কোম্পানির পরিচালক হন ২০১২ সালের ১৮ জানুয়ারি। এক মাস ৬ দিন পর ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬ এবং ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দ্বৈত নাগরিক হলে তার মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর হওয়ার সুযোগ নাই।

সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য’ এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রিসভার সর্বোচ্চ এক-দশমাংশ সদস্য বেছে নিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।

অন্যদিকে ৬৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার’ করলে সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ-সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না।

আবার এ অনুচ্ছেদেই বিধান আছে, কোনো ব্যক্তি আগে বিদেশি নাগরিকত্ব নিলেও তিনি যদি পরে সেটা ত্যাগ করেন, তাহলে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য হয়ে যাবেন।

এমন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার প্রেক্ষাপটে হুমায়ুন কবির প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর তার কথিত ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

গত রোববার দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, “সিলেটে জন্মগ্রহণ করলেও মাত্র আড়াই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে হুমায়ুন কবির পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। সেখানে তিনি বেড়ে ওঠেন, নেন উচ্চশিক্ষা।

“যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্বও নেন তিনি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, হুমায়ুন কবির বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না।”

যুক্তরাজ্যের আইনে দ্বৈত নাগরিক হলেও সে দেশে রাজনীতি করতে বা এমপি হতে বাধা নেই।

তবে তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ছাড়ার বিষয়ে প্রকাশিত খবর এবং এ নিয়ে ইন্টারনেটে ‘শোরগোলের’ প্রসঙ্গ টেনে করা প্রশ্নে হুমায়ুন কবির হাসতে হাসতে বলেন, “আমি তো সিটিজেন নিয়ে আছি, আপনি বলেন নেটিজেন।”

গণমাধ্যমে খবরের প্রকাশের প্রসঙ্গ এক সাংবাদিক টানলে তিনি বলেন, “কোন নিউজপেপার? কার এত জ্বালা? মানে কাজকর্ম থুইয়া…”

তখন এক সাংবাদিক প্রথম আলোতে খবর প্রকাশিত হওয়ার কথা বললে পত্রিকাটির সম্পাদক মতিউর রহমানকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, “তার জ্বালা কেন হচ্ছে? তার কি ২০০৮-এর জ্বালা উঠছে নাকি আবার? মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের জ্বালা উঠছে তার আবার নাকি?

“দেশের পক্ষে জোরাল অবস্থান নেওয়া মানুষ সকল, দেশপ্রেমিক যারা আছে, দেশের পক্ষে যারা অবস্থান নেই, যারা মিডিয়া আছে, যারা দেশবাসী আছে, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আছে, তারা সবাই মিলে ইনশাআল্লাহ এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব।”

মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিয়মিত ব্রিফ্রিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকেও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা। 

সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, “বিষয়টি হুমায়ুন কবিরকেই জিজ্ঞেস করাটাই সবচেয়ে ভালো অপশন।” 

উপদেষ্টা বলেন, “বেস্ট হচ্ছে তাকেই জিজ্ঞেস করা। বক্তব্যটা যদি দেখেন তিনি ‘ক্যাজুয়ালি’...‘ইনফরমালি’…বলেছেন…আমার মনে হয়েছে খুব ‘সিরিয়াসলি’ না নেওয়াটাই উচিৎ হবে।”

আরও পড়ুন:  

ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ছেড়েছেনপ্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন বললেন 'কার এত জ্বালা'