Published : 28 Feb 2026, 12:57 AM
বাইশ বছর আগে ছুরি-চাপাতি হামলার শিকার হওয়ার কয়েক মাস বাদে মৃত্যু হয় বহুমাত্রিক লেখক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের। এ ঘটনায় হত্যা মামলায় রায় হলেও বিস্ফোরক আইনের মামলাটি এখনো ঝুলেই রয়েছে।
এখন পর্যন্ত মামলাটিতে ৪৯ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মামলাটিতে ইফতেখার উদ্দীন নামে এক আলোকচিত্রী সর্বশেষ সাক্ষ্য দেন। এরপর আর কোনো সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ।
২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির রাতে বাংলা একাডেমির উল্টো পাশের ফুটপাতে আক্রান্ত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হুমায়ুন আজাদ, যিনি তার লেখার জন্য সাম্প্রদায়িক শক্তির হুমকি পেয়ে আসছিলেন। একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে জখম করা হয়।
দেশে লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, মুক্তমনা মানুষের ওপর বিগত বছরগুলোতে যে ধারাবাহিক জঙ্গিবাদী হামলার ঘটনা বাংলাদেশ দেখেছে, তার সূচনা হয়েছিল হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে।
কয়েক মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর ওই বছর অগাস্টে গবেষণার জন্য জার্মানিতে যান এই লেখক। পরে ১২ অগাস্ট মিউনিখে নিজের ফ্ল্যাট থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
হামলার পরদিন হুমায়ুন আজাদের ভাই মঞ্জুর কবির রমনা থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। আদালতের আদেশে অধিকতর তদন্তের পর তা হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
মামলাটি তদন্ত করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০১২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর হত্যা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করার পর সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক শেষে চার জঙ্গির রায় আসে ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল।
এরা হলেন-নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) শুরা সদস্য মিজানুর রহমান মিনহাজ ওরফে শফিক ওরফে শাওন, আনোয়ারুল আলম ওরফে ভাগ্নে শহীদ, নূর মোহাম্মদ শামীম ওরফে জে এম মবিন ওরফে সাবু ও সালেহীন ওরফে সালাউদ্দিন ওরফে সজীব ওরফে তাওহিদ।
অন্যদিকে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে একই আদালত। তবে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে না পারায় মামলার বিচার চলছিল ধীর গতিতে। ২০২৩ সালের ২ জানুয়ারি মামলাটি মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-২১ এ বদলি করা হয়। বিচারক জাহিদুলের ইসলামের আদালতে মামলাটি বিচারাধীন।
সাক্ষী না আসায় দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে মামলার বিচার। সর্বশেষ গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ছিল। তবে ওইদিনও কোনো সাক্ষীকে সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ।
আগামী ৫ এপ্রিল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক আব্দুল মালেকের সাক্ষ্যের দিন রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আদালতের বেঞ্চ সহকার সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, তাকে আদালতে হাজির হতে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
এ মামলার আসামিরা হলেন-নুর মোহাম্মদ, আনোয়ারুল আলম ও মিজানুর রহমান। এদের মধ্যে নুর মোহাম্মদ পলাতক রয়েছে। অপর দুই আসামি কারাগারে রয়েছে।
মামলার বিষয়ে জানতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আব্দুল্লাহ আল মামুনকে কয়েক দফা ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
আসামি আনোয়ারুলের আইনজীবী জেসমিন আক্তার বলেন, “দীর্ঘদিন হয়ে গেল মামলার বিচার শেষ হচ্ছে না। আসামিদের নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। বিচার দ্রুত শেষ হলে ভালো। একটা না একটা রেজাল্ট তো আসবে।
“আশা করছি, তিনি খালাস পাবেন। কারণ তিনি এ ঘটনার সাথে জড়িত না। ঘটনাস্থলে ছিলেন না। কোনোভাবে মামলার সাথে সম্পৃক্ত না। তার পরও এ ঘটনার হত্যা মামলায় তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। তার সাথে অবিচার হয়েছে। আশা করছি, এ মামলায় (বিস্ফোরক) ন্যায়বিচার পাবেন এবং খালাস পাবেন।”
এদিকে হুমায়ন আজাদের পরিবার বলছে, হামলা শিকার হওয়ার পর তিনি ইন্ধনদাতার নাম বলে ছিলেন। তবে সেই ব্যক্তিকে আসামি না করায় মামলা নিয়ে তাদের আর আগ্রহ নেই।
হুমায়ুন আজাদের ভাই মঞ্জুর কবির বলেন, “একটা মামলায় তো বিচার হয়েছে, কি লাভ হলো আমাদের বা দেশের? বিচার চাইলাম, তা কি পাইলাম? মারাত্মক আহত হওয়ার ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে ছিলেন। নিজেই ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন।
“বলেছিলেন ঘটনার সাথে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী জড়িত। বারবার বলে গেছেন তিনি। কারণ দেলওয়ার হোসেন সাঈদী সংসদে আমার ভাইকে নিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে বিষোদগার করেন।
“কিন্তু তাকে তো মামলায় সম্পৃক্ত করা হয়নি। তিনি মারা গেছেন। তার দুই ছেলে সংসদ নির্বাচন করেছে। একজন সংসদে গেল, আরেকজন পারেনি। বিচার হোক বা না হোক আমাদের কিছু যায়-আসে না।”
হুমায়ুন আজাদ নিজেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামলার পেছনে মৌলবাদী সংগঠন এবং দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর জড়িত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন দেন সাংবাদিকদের কাছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে হত্যা মামলায় অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বিচারক।
তবে তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় আসামির তালিকা থেকে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাদী মঞ্জুর কবির বলেন, “যারা স্বজন হারান, কষ্ট থেকে কথাগুলো বলেন; মামলার কিছুই হবে না।
“হলেও আমাদের আগ্রহ নেই। হুমায়ুন আজাদ তার লেখনীর মাধ্যমে বেঁচে থাকবেন।”