১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

র‍্যাব থেকে ‘এসআরবি’: সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণে অন্তর্ভুক্তির পথ বন্ধের দাবি টিআইবির

“র‍্যাবের বদলে এসআরবি নামে একই ধরনের ক্ষমতা ও সংস্কৃতির বাহিনী গড়ে উঠলে তা হবে কেবলই পুরনো প্রতিষ্ঠানের খোলস বদলানোর শামিল।”

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Sep 2026, 12:26 AM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

র‌্যাব বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে আরেকটি বাহিনী গঠনের উদ্যোগের মাধ্যমে ‘অধিকতর ক্ষমতায়িত ও জবাবদিহিহীন’ আইনগত ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

রোববার এক বিবৃতিতে এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সশস্ত্র বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণে প্রস্তাবিত এসআরবিতে অন্তর্ভুক্তির পথ বন্ধ করতে সরকারের প্রতি আহবান জানান।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল ২০২৬ এর একাধিক ধারা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, “পুলিশ বাহিনীর বাইরে সশস্ত্র বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণে এসআরবিতে অন্তর্ভুক্তির পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। কারণ এই বিধান অভ্যন্তরীণ পুলিশিংয়ে সামরিক যুদ্ধকৌশল ব্যবহারের ঝুঁকি জিইয়ে রাখবে যা প্রকারান্তে প্রতিপক্ষকে হত্যাসহ নির্মূল করতে দীক্ষা দেয়।”

গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “র‍্যাব বিলুপ্তির নীতিগত সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বহু প্রতীক্ষিত এবং এটিকে আমরা ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তন করলেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয় না।”

র‍্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের যে গুরুতর অভিযোগ ও প্রমাণ রয়েছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধে নতুন বাহিনীর কাঠামো, জনবল, ক্ষমতা, বলপ্রয়োগের বিধান এবং জবাবদিহির ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনার বিষয়ে মত দেন তিনি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক মনে করেন র‍্যাবের বদলে ‘এসআরবি’ নামে একই ধরনের ক্ষমতা ও সংস্কৃতির একটি বাহিনী গড়ে উঠলে তা হবে কেবলই পুরনো প্রতিষ্ঠানের খোলস বদলানোর শামিল। এর মাধ্যমে দেশের নাগরিক বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

টিআইবি বলছে, বিলটিতে এসআরবিকে ব্যাপক ও অস্পষ্ট ক্ষমতা প্রদান, অস্ত্র ও বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষার অনুপস্থিতি, সন্দেহের ভিত্তিতে পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের সুযোগ, স্বার্থের দ্বন্দ্বযুক্ত অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং র‍্যাবের জনবলকে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া নতুন বাহিনীতে স্থানান্তরের ঝুঁকি এবং প্রেষণে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বহাল রয়েছে। 

“র‍্যাবের জনবল কোনো ধরনের যাচাই ছাড়া ঢালাওভাবে এসআরবিতে স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। জাতিসংঘের সিকিউরিটি সেক্টর রিফর্ম (এসএসআর) ও ডিডিআর মানদণ্ড অনুযায়ী, অতীতে র‍্যাবে দায়িত্ব পালনকালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন বা গুমের মত অপরাধে অভিযুক্ত বা জড়িত কোনো সদস্য যেন নতুন বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হতে না পারে, সে জন্য একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভেটিং প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।”

বিলের খসড়ায় বাহিনীটির ওপর অবারিত ক্ষমতা অর্পণ ও বিচারিক সুরক্ষার অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন,  “প্রস্তাবিত বিলে এই বিশেষায়িত ইউনিটকে গোয়েন্দা নজরদারি থেকে শুরু করে অভিযান, তল্লাশি ও সাধারণ তদন্তের মতো বহুমুখী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তদুপরি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা বা সরকার নির্দেশিত অন্যান্য দায়িত্বের মত অস্পষ্ট শব্দবন্ধের উপস্থিতি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিন্নমত দমন, বলপ্রয়োগের সুযোগ এবং অতীতের মত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে আইনগত বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।”

বিলটিতে কেবল সন্দেহের বশে পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেপ্তার এবং বাহিনীর নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “এটি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং সংবিধানের মৌলিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।”

বিলের ২২ ধারায় প্রস্তাবিত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থারও সমালোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।

টিআইবি মনে করে, র‍্যাব বিলুপ্তির পর নতুন বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন বাহিনীর ক্ষমতার সুস্পষ্ট সীমারেখা, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদারকি, স্বচ্ছ সদস্য যাচাই প্রক্রিয়া, বিচারিক সুরক্ষা এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত না হলে র‍্যাব বিলুপ্তির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।