চার শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি কেন অবৈধ নয়: হাই কোর্ট
সরকার, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব, ইউজিসি চেয়ারম্যান এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য এবং রেজিস্ট্রারদেরকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দেশের ২২ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে গঠিত অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটি কেন বেআইনি নয় এবং তা কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে রুল দিয়েছে হাই কোর্ট।
বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি শেখ তাহসীন আলীর হাই কোর্ট বেঞ্চ সোমবার এ রুল জারি করে।
রুলে সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারদেরকে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের চার আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস, এম লিটন আহমেদ, রাশেদুল হক খোকন ও বিপ্লব কুমার দাস চলতি মাসের ৬ সেপ্টেম্বর জনস্বার্থে রিটটি করেন। আদালতে রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন চঞ্চল কুমার বিশ্বাস।
রিট আবেদনে বলা হয়, গত ৪ অগাস্ট একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং ও তদন্ত কমিটি গঠন এবং তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। অথচ ওই সংবাদটি যাচাইহীন এবং এর ভিত্তিতে চার শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে এসব কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
রিটে দাবি করা হয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্ত, বেতন বন্ধ, পদোন্নতি স্থগিত, বিভাগীয় ও পাঠদান কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা এবং বিদেশে চিকিৎসার জন্য অনাপত্তিপত্র না দেওয়ার মত পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
রিটে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গঠিত এসব কমিটি আইন, বিধি, অধ্যাদেশ, সার্ভিস রুল বা সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী আইনগত কর্তৃত্বের বাইরে গঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়। সেখানে বলা হয়, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো নির্দিষ্ট, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য অভিযোগ ছাড়া পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রসিকিউটর বা আদালতের মত কথিত অপরাধের তদন্ত বা দায় নির্ধারণের ক্ষমতা নিজেরা নিতে পারে না।
“এসব কার্যক্রম সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদে স্বীকৃত সমতা, আইনের আশ্রয়, ব্যক্তিস্বাধীনতা, চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনসম্মত পেশা পরিচালনার অধিকারের লঙ্ঘন।”
শিক্ষকদের পেশাগত জীবন, সুনাম, বেতন, পদোন্নতি বা একাডেমিক দায়িত্বে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে আইনগত কর্তৃত্ব ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ প্রয়োজন বলেও রিটে যোগ করা হয়েছে।
রিটে ৪ অগাস্টের ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চার শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং, ইনকোয়ারি ও তদন্ত কমিটি গঠনের কার্যক্রম এবং ৩১ অগাস্ট এসব কমিটি বিলুপ্ত ও প্রত্যাহারের জন্য দেওয়া আবেদনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববর্হিভূত ও আইনগত কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে রুল জারির প্রার্থনা করা হয়।
একইসঙ্গে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে গঠিত সব ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং, ইনকোয়ারি ও তদন্ত কমিটি বিলুপ্ত ও প্রত্যাহার এবং ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেওয়া কার্যক্রম বাতিলের নির্দেশনা চাওয়া হয়।
এছাড়া রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কোনো শিক্ষককে রাজনৈতিক মতামত, আইনসম্মত সংশ্লিষ্টতা, চিন্তা বা মতপ্রকাশের কারণে বিরূপ আচরণ, ভয়ভীতি, হয়রানি বা পেশাগত বৈষম্যের শিকার না করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের পাঠদান ও গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য নিরাপদ এবং নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিতে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে রিটে।
আদালতে রুল জারির বিষয়ে রিটকারী আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনো আইনে শিক্ষকের স্বাধীন মতামত প্রকাশের কারণে তাকে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির আওতায় আনার বিধান নেই। বিভিন্ন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির মাধ্যমে যেসব শিক্ষককে ডাকা হচ্ছে, একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হচ্ছে বা চিকিৎসার জন্য অনাপত্তিপত্র দেওয়া হচ্ছে না, সেসব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা আমরা চেয়েছি।”
রুল জারির পর বিষয়টি হাই কোর্টে বিচারাধীন থাকায় সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার ও সিন্ডিকেট সদস্যরা শিক্ষকদের অযথা হয়রানি করা থেকে বিরত থাকবেন বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এই আইনজীবী।
