Published : 05 Mar 2026, 10:47 PM
এবার অমর একুশে বইমেলায় কোনো প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। সর্বোচ্চ ৫ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দিয়েছে মেলা পরিচালনা কমিটি। কিন্তু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ৬ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে প্রকাশকদের একটি অংশের।
এদিকে মেলায় কোনো প্যাভিলিয়ন না থাকার কারণে বিষয়টির মাঝে সমতা দেখছেন কবি, লেখক এবং বইপ্রেমীদের কেউ কেউ। তারা বলছেন, মেলায় প্যাভিলিয়ন এক ধরনের বৈষম্য তৈরি করে। এতে ছোট প্রকাশনী সংস্থাগুলো আড়ালে পড়ে যায়।
বৃহস্পতিবার কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালকে পাওয়া গেল বিদ্যাপ্রকাশের স্টলে। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "এই ব্যাপারটা কিন্তু ভালো হয়েছে। প্যাভিলিয়ন থাকলে কয়েকটা প্রকাশনীকেই মনে হয় মেলার প্রাণ। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে মেলায় এক ধরনের সমতা এসেছে। সব প্রকাশনীই সমান সুবিধা পেয়েছে।"
মজা করে মোহিত কামাল বলেন, "মেলায় এবার সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ এসেছে।"
প্যাভিলিয়ন না থাকাকে ইতিবাচক মনে করছেন তরুণ কবি অর্বাক আদিত্যও। মেলার শিশুচত্বরে কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে।
অর্বাক আদিত্য বলেন, "প্যাভিলয়ন থাকার কারণে কয়েকটি বড় প্রকাশনী একটু বেশি হাইলাইটেড হত, আর ছোট প্রকাশনীগুলো আড়ালেই থেকে যেত। এবার সব প্রকাশনীর জন্যই সুবিধা হয়েছে।"
গত বছরও অন্যপ্রকাশ, প্রথমা, বাতিঘর, আগামী প্রকাশন, পাঠক সমাবেশ, ইউপিএলসহ ৩৭টি প্রকাশনীর প্যাভিলিয়ন ছিল। এবার তাদের সবাই বরাদ্দ পেয়েছে স্টল।
বৃহস্পতিবার ছিল বইমেলার অষ্টম দিন। মেলা চলে দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলার
তথ্যকেন্দ্রে এদিন নতুন ৯২টি বই জমা পড়েছে।
মেলায় লোক সমাগম এবং বই বিক্রি নিয়ে আছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বাতিঘর, প্রথমাসহ কয়েকটি স্টলে কিছুটা ভিড় দেখা গেলেও কিছু স্টল ছিল ক্রেতাশূন্য।
ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী সাবিহা আনজুম বলেন, "অনেক প্রকাশনী তো নতুন বই প্রকাশ করেনি। তাদের স্টলে বিক্রি নাই। কিন্তু যারা ভালো বই প্রকাশ করেছে, তাদের স্টলে বিক্রি ভালো হচ্ছে। আমি বাতিঘর এবং প্রথমা থেকে দুটি বই কিনেছি।"
সুকান্ত স্মরণ
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হয় ‘জন্মশতবর্ষ: সুকান্ত ভট্টাচার্য’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুমন সাজ্জাদ। আলোচনায় অংশ নেন আহমেদ মাওলা। সভাপতিত্ব করেন আবদুল হাই শিকদার।
সুমন সাজ্জাদ বলেন, "বাংলা সাহিত্যে ‘কিশোর—কবি’ আখ্যা পেলেও সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা মোটেই কিশোরসুলভ চপলতায় আচ্ছন্ন নয়। ভাবাদর্শিকভাবে কবি সুকান্ত হয়ে উঠেছিলেন আন্তর্জাতিক। তাই তার কবিতায় চিত্রিত হয়েছে কাশ্মীর, স্তালিনগ্রাদ ও প্যারিসের সংগ্রামী ছবি। মূলত ঔপনিবেশিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে মার্কসবাদ সুকান্তকে সহায়তা করেছে।
“তার কবিতায় আমরা পাই উপনিবেশ কিংবা ‘বিদেশি শাসনে’র সুস্পষ্ট উল্লেখ। ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচনা আর ভারতীয় অঞ্চলের জাতীয় আন্দোলন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছে তার কবিতায়। হিন্দু—মুসলমান বিতর্কের বাইরে গিয়ে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাঠ করার মত অগ্রসর মন ছিল সুকান্তের। তার কবিতা শাসক ও শোষিতের সংগ্রামকে দ্যোতিত করেছে। সুকান্তের সমগ্র সাহিত্য শেষপর্যন্ত হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের সাহিত্য।"
আহমেদ মাওলা বলেন, "কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য জীবনের খুব অল্প সময়ই কাব্যচর্চার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তার কাব্যপ্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছেন। তিনি লোকজীবনের ভাষাকে কাব্যভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মার্কসবাদে উদ্বুদ্ধ কবি শ্রেণিচেতনাকে তার কবিতায় মূর্ত করে তুলেছেন। কবিতাকে তিনি সমাজবদলের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।"
আবদুল হাই শিকদার বলেন, "সাম্রারাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও সামাজিক অন্যায়—অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ক্ষেত্রে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের যোগ্য উত্তরসূরি। বাংলাদেশের সকল লড়াই—সংগ্রামে সুকান্তের প্রতিবাদী পংক্তি বারবার উচ্চারিত হয়েছে।"
গান-কবিতার আয়োজন
বৃহস্পতিবার 'লেখক বলছি' অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি রেজাউদ্দিন
স্টালিন ও কবি আসাদ কাজল।
বিকেল ৪ টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন শোভা চৌধুরী। আবৃত্তি পরিবেশন করেন শাকিলা মতিন মৃদুলা এবং সালমা সুলতানা। সংগীত পরিবেশন করেন আব্দুল লতিফ শাহ, এলাহী মাসুদ, ডলি মণ্ডল, শামীম সালাম, সাইফুল ইসলাম, মো. আলতাফ হোসেন ও জাকির হোসেন আখের।
যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন পুলিন চক্রবর্তী (তবলা), মো. বজরুল ইসলাম বিজু (কিবোর্ড), মো. আতিকুল ইসলাম (বাঁশি) ও আকাশ আহমেদ কবির (বাংলা ঢোল)।
শুক্রবার যা থাকছে
শুক্রবার মেলা শুরু হবে দুপুর ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশুপ্রহর।
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হবে ‘জন্মশতবর্ষ: কলিম শরাফী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অণিমা রায়।
আলোচনায় অংশ নেবেন সাইম রানা। সভাপতিত্ব করবেন সাধন ঘোষ।
বিকেল ৪ টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।