Published : 02 Sep 2026, 01:48 AM
ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনালে অলস বসে থাকা বাসগুলোকে পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোতে পাঠানোর যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তাতে বাস মালিক ও চালকদের তেমন আগ্রহ নেই।
মধ্যরাত কিংবা দিন-দুপুর বেলায় মহাখালী, তেজগাঁও ও তেজগাঁও লিংক রোড এলাকায় বাসগুলো সার বেঁধে রাস্তার ওপর রাখা হচ্ছে আগের মতোই।
অস্থায়ী ডিপোর স্থানটির নাম একসময় ছিল আলমপুরা গ্রাম। এখন সেটিকে পূর্বাচল তিন নম্বর সেক্টরের নতুন বাস ডিপো বললে মানুষ চেনে। স্থানটি অনেকটা গ্রাম-শহরের মিশেল। একদিকে গরু চড়ছে, আরেকদিকে চলছে বিরাট ডিপো নির্মাণের কাজ। কাছেই ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ে, দিনভর কেবল দ্রুতগামী যানবাহনের শাঁ শাঁ ছুটে চলার শব্দ।
গত ১৫ জুলাই মহাখালী বাস টার্মিনালে অলস বসে থাকা বাসগুলোকে পূর্বাচলের নতুন ডিপোতে নেওয়া শুরু হয়। তবে কার্যক্রম শুরুর দেড় মাসেও সেখানে যাচ্ছে না অলস বাসগুলো।
মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের ওই ডিপোতে বাস কর্মীদের ঘুমানোর জন্য একটি অস্থায়ী তাঁবু করা হয়েছে। বাথরুম, খাবারের রেস্তোরাঁসহ গাড়ি ধোয়ার সুবিধাও যুক্ত করা হচ্ছে। তবে কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। সেই কারণেই এখনো সেখানে যেতে অনীহা বলে জানাচ্ছেন পুলিশ ও বাস মালিক নেতারা।
তারা বলছেন, সেখানে এখনো পুরোপুরি নির্মাণকাজ শেষ হয়নি, বৃষ্টি হলে গাড়ি তলিয়ে যায়। থাকার জায়গাও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
দ্রুতই নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাবে জানিয়ে তারা বলছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে গাড়ি পাঠানো শুরু হবে।
২৪ অগাস্ট পূর্বাচলের ওই বাস ডিপোতে গিয়ে সব মিলিয়ে ১৪টির মতো বাস দেখা গেল। মহাখালীতে এলাকায় যখন বাস রাখতে ঠেলাঠেলি, পুলিশের সঙ্গে হরদম লুকোচুরি খেলা; তখন পূর্বাচলের ১০ একর জায়গার এই বাস ডিপো প্রায় খালিই বলা যায়।
মহাখালী থেকে মূলত বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের বাস যাতায়াত করলেও নতুন ডিপোতে ময়মনসিংহ রুটের বাস নেই বললেই চলে। দেখা গেল আহনাফ পরিবহনের চারটি বাস, বিলাস পরিবহনের তিনটি এবং ইউনাইটেড, শ্যামলী বাংলা, নিউ পিংকি, এসআর প্লাস পরিবহনের কয়েকটি করে বাস রাখা। শ্যামলী বাংলা বাসটি বাদে এগুলোর সবই উত্তরবঙ্গ ও সিলেট রুটে চলাচল করছে।
থাকা-খাওয়ার সুবিধা পরিপূর্ণ হয়নি
অস্থায়ী ডিপোর একটি বেশ বড় তাঁবুর নিচে প্রায় ২০টির মতো চৌকি পাতা। তাতে ঘুমাচ্ছিলেন বেশ কয়েকজন গাড়ি চালক। ঘরে আছে ফ্যানের ব্যবস্থা। এ তাঁবুটি পুলিশ করে দিয়েছে। তবে সেখানে মহাখালীর বাস পুরোমাত্রায় রাখা শুরু হলে পাঁচশর মতো গাড়ি আসবে বলে ধারণা দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ভোর বেলা তাবুতে এসে এক ঘুম দিয়ে সকালে চা হাতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন আহনাফ পরিবহনের বাস চালক জাহাঙ্গীর আলম শুভ।
তিনি বলছেন, পঞ্চগড়-নীলফামারী থেকে ভোরবেলা ট্রিপ নিয়ে মহাখালীতে যাত্রী নামিয়ে এখানে চলে এসেছেন। গাড়ি পার্ক করে ঘুম দিয়েছেন। কিছুক্ষণ পর দুপুরের খাবার খাবেন।
আলাপচারিতায় শুভ বলছিলেন, “আমার বাড়ি টাঙ্গাইল। টানা তিন-চারদিন ডিউটির পর বাড়ি যাইতে পারি।
“ঢাকায় তো আমার কোনো থাকার জায়গা নাই। খুব সুবিধা হইছে আমাদের। এখানে থাকতে টাকা লাগে না কোনো। বাথরুম, হোটেল—সব ব্যবস্থা আছে।”
এর পরও কেন এখানে বাস আসতে চাইছে না, এমন প্রশ্নে শুভ বললেন, “এইখানে আসতে-যাইতে প্রায় হাজার টাকার তেল পুড়ায়, আবার সময়ও নষ্ট হয়।
“এই কারণে শুধু নাইট টু নাইট যারা চলে, তারাই এখানে আসতেছে। বাকিরা আসতে চায় না।”
বিলাস পরিবহনের চালকের সহকারী সুজন এতক্ষণ বাসের ভেতর সজোরে গান চালিয়ে দিয়ে বাহনটির ভেতর-বাইরে পরিষ্কার করছিলেন। বাস ধোয়া শেষে ঘেমে একাকার সুজন গামছা-লুঙ্গি হাতে চললেন গোসল করতে। এরপর খেয়ে একটা ঘুম দেবেন।
সুজন বললেন, “গাবতলী-মহাখালী হইলে আমাগো তো গাড়ি রাইখা নড়ার উপায় থাহে না। এটা-ওটা চুরি হইয়া যায়, আস্তা গাড়িই নিয়া যায়। এইহানে সিস্টেম ভালা, পুলিশ মামারা রইছে। গোসল দিয়া বিছানায় হুইতা দিমু ঘুম।”
সুজনের ভাষ্য, তার জন্য ফ্যানের বাতাসের নিচে নরম বিছানায় শুতে পারাই ‘বিরাট ব্যাপার’। না হলে এই ভ্যাপসা গরমের মধ্যে গাড়ির ভেতরে কোথাও অথবা মালামাল রাখার বক্সের ডালা খুলে রেখে সেখানে ঘুমাতে হতো।
“হেলপারের জন্য তো আর বাসের এসি চালিয়ে ঘুমানোর সুযোগ কোনো মালিক দেবেন না।”
আরেক বাস চালক ইব্রাহিম বললেন, “এইখানে অনেকে আসতে চায় না, কারণ এখানে কোনো0 মিস্ত্রি নাই। ট্রিপ মাইরা আসার পর সবাই চায় গাড়িটা চেক দিতে, টুকটুাক কাম (মেরামতি) থাকেই।
“সেইটা এইখানে করানো যায় না। মহাখালী বা গাবতলীতে গাড়ি রাইখা খালি মিস্ত্রি কল দিলেই আইসা পরে, মালও (স্পেয়ার পার্টস) এবেইলেবেল।”
তাঁবুর কাছেই রুবেল মিয়ার চায়ের দোকান। সকাল ১০টার দিকে রুবেল মিয়া সিঙ্গারা ভাজার আয়োজনে ব্যস্ত। ওদিকে চলছে দুপুরের খাবারের যোগাড়যন্তর। রুবেল মিয়া এক সপ্তাহ হয়েছে এখানে বসছে। বেচাবিক্রি সেভাবে জমেনি এখনো।
রুবেল মিয়ার দোকানের পাশেই আরেকটা রেস্তোরাঁ। সকালের নাস্তা ভাতের আয়োজন তখনো শেষ হয়নি। থরে থরে ভাত, ভর্তা আর সবজি সাজানো। তবে রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক রিফাত খুবই আশাবাদী।
তিনি বলছেন, “দুপুরে আইলে দেখবেন। যে গরু পাকাইতাছি ঢাকা থিকা লোক আইব খাইতে। রাইতে পুরা লাল-নীল বাত্তি দিয়া চকচক কইরা ফালামু। “
দুই খাবারের দোকানদারই বললেন, বাসকর্মীরাই তাদের মূল খরিদ্দার। তবে এখন এখানে নির্মাণ কাজ চলায় অনেক শ্রমিক, ঠিকাদারের কর্মীরাও তাদেরও ওখানে খেতে আসছেন। যদিও বেশিরভাগ নির্মাণ শ্রমিক বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসছেন। সকালে তাদের লাইন ধরে বসে খাবার খেতে দেখা গেল।
কেন যাচ্ছে না?
মহাখালী বাস টার্মিনালটি পড়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান ট্রাফিক বিভাগের মধ্যে।
মহাখালী থেকে পূর্বাচলের ডিপোতে বাস পাঠাতে মঙ্গলবার বেশ ঘটা করে অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
অভিযানে অংশ নেন ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত কমিশনার) আনিছুর রহমান। তিনি বলছেন, “এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হল টার্মিনাল এলাকায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং যাত্রীদের নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করা। পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোতে প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা সকল বাস মালিক ও চালকদের সহযোগিতা কামনা করছি।
“টার্মিনাল এলাকায় দীর্ঘসময় অপেক্ষমাণ ও গ্যাপের গাড়িগুলো ধাপে ধাপে পূর্বাচলের অস্থায়ী বাস ডিপোতে স্থানান্তর করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে নির্ধারিত সংখ্যক গাড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট গাড়িগুলোও পর্যায়ক্রমে স্থানান্তর করা হবে।”
এ বিভাগের ডিসি আনোয়ার সাঈদ সোমবার দুপুরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওখানে (পূর্বাচলে) গাড়ি রাখার অবকাঠামো মোটামুটি হয়েছে। তবে থাকার ব্যবস্থাটা পরিপূর্ণ হয়নি। আমরা (পুলিশ) একটা অস্থায়ী তাঁবু করে দিয়েছি।
“আজকে একটা মিটিং আছে এ নিয়ে। আশা করা যায় কাল (মঙ্গলবার) থেকেই সেখানে বেশি গাড়ি পাঠানো শুরু হবে। তবে বিষয়টা একদিনে পুরোপুরি হবে না। আমরা চেষ্টা করব পরবর্তী দিনগুলোতে আরও বেশি গাড়ি সেখানে পাঠানোর।”
ময়মনসিংহ রুটের সৌখিন পরিবহনের দুটো বাস চলে এক ব্যবসায়ীর।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “আমাদের গাড়িগুলার গ্যাপ অনেক বেশি থাকে। এগুলা ২১ দিন চলার পর প্রায় এক মাসের মতন বসা (ট্রিপের বাইরে) থাকে। কারণ এই ব্যাানারে যে পরিমাণ বাস চলার কথা, তার ডাবলেরও বেশি বাস নিয়া রাখছে কোম্পানি।
“আর লম্বা গ্যাপে মালিকরা কেউ ঢাকায় গাড়ি রাখে না। কেউ ময়মনসিংহ আর কেউ টঙ্গী বা গাজীপুরের আশপাশ দিয়া বিভিন্ন গ্যারেজ বা হাউজিংয়ের মাঠে গাড়ি রাখে; যার কারণে আমাদের গাড়িগুলা পূর্বাচলে যাইতাছে না।”
জানতে চাইলে ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, “রাজউক সেখানে হেরিংবন করে দেওয়ার যে কাজটা করছে, সেটা এখনো শেষ হয়নি। অনেক বৃষ্টিতে মাঝখানে সেখানে রাখা গাড়ি তলায় গিয়েছিল। আর থাকা-খাওয়ার অ্যারেঞ্জমেন্টটাও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
“এগুলো সম্পন্ন হয়ে গেলে পরে আমরা পুলিশকে বলব ও সাংগঠনিকভাবেও প্রেশার দেব। যারা শুধু রানিং অপারেটিংয়ে থাকবে, মহাখালীতে আসবে। মহাখালীতে শুধু যাত্রী পিক অ্যান্ড ড্রপ করা যাবে।”
সব মিলিয়ে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই পূর্বাচলের ডিপোতে পুরোদমে বাস পাঠানো শুরু হবে মন্তব্য করে পরিবহন মালিকদের নেতা সাইফুল বলেন, “এখন একটু ঢিলেঢালা মনে হচ্ছে। এটার কারণে হচ্ছে ওখানে কাজ শেষ হয়নি।
“সব মিলিয়ে সপ্তাহখানেকের মধ্যে আশা করি সব গাড়ি আমরা ওখানে পাঠাব। তখন আমরা পুলিশকে বলে দেব, যে কথা না শুনবে তারে ধইরা সোজা ডাম্পিংয়ে দেবেন।”
তবে রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী (বাস্তবায়ন) আমিনুর রহমানের দাবি, সেখানে কাজ প্রায় শেষ।
“ওইখানে আমরা নরমাল একটা তাঁবু দিছি, বাথরুম করে দিছি; যাতে ওখানে বাস কর্মীরা গিয়ে বিশ্রামটা নিতে পারে। এই বিষয়গুলি আমরা চেষ্টা করেছি যে অ্যাকোমোডেট করার। ওইখানে একটা হোটেলও আমরা করে দিছি, খাবারের জন্য। ওখানে ৬০ টাকার মধ্যে নাস্তা করাচ্ছে, ১০০ টাকায় লাঞ্চ পাওয়া যাচ্ছে।”
রাজউক কর্মকর্তা আমিনুর বলেন, “এটা হচ্ছে অস্থায়ী বাস ডিপো। যেই বাসগুলো একটা দীর্ঘ সময় পরে ট্রিপে যাবে, সেগুলো যেহেতু মহাখালীতে রাখার জায়গা নেই; তাই সেখানে পাঠানো হচ্ছে।
“অনেকটা হাইবারনেশনের (শীতনিদ্রা) মতো থাকবে আরকি! তা নাহলে এই বাসগুলো রাতের বেলায় মহাখালীতে রাস্তার উপর রাখা হয়। এখানে আমাদের ১০ একর জায়গা রয়েছে। আমাদের টার্গেট হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ বাস অ্যাকোমোডেট করা; যাতে এগুলো ঢাকায় শহরে চাপ তৈরি না করে।”