Published : 30 Nov 2025, 09:33 PM
সরকারের তরফে হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও সরকারি মাধ্যমিক ও প্রাথমিকের শিক্ষকদের কর্মবিরতি কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণায় বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা ইতোমধ্যে শুরু হলেও সোমবার থেকে বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন ৭২১টি সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকরা।
একই দিন শুরু হওয়ার কথা প্রাথমিক স্কুলগুলোর বার্ষিক পরীক্ষা। কিন্তু প্রাথমিকের শিক্ষকদের একাংশ তাদের চলমান কর্মবিরতি কর্মসূচির মধ্যে বার্ষিক পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।
তাহলে কী বার্ষিক পরীক্ষা হচ্ছে না, এমন প্রশ্ন অভিভাবকদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অভিভাবকদের সংগঠন অভিভাবক ঐক্য ফোরাম।
ফোরামের সভাপতি জিয়াউল হক দুলু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকরা মাঝপথে পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের একটি অংশ বার্ষিক পরীক্ষা নেবেন না বলে জানিয়েছেন। শিক্ষকদের এ অবস্থানে আমরা উদ্বিগ্ন।
“এ দুইপক্ষই সরকারি কর্মচারী৷ শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে তাদের এই অবস্থান কখনই কাম্য নয়। তারা সরকারের সঙ্গে তাদের দাবি দাওয়া নিয়ে আলোচনা করতে পারে, তবে শিক্ষার্থীদের তারা জিম্মি করবেন, সেটা অভিভাবকরা কখনোই চান না।”
কর্মবিরতিতে ৭২১ স্কুলের শিক্ষকরা
সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। তবে ৭২১টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চার দফা দাবিতে সোমবার থেকে কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার ও রোববার রাজধানীর আব্দুল গণি রোডের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কার্যালয় ‘শিক্ষা ভবন’ চত্বরে ‘বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি-বাসমাশিসের’ ব্যানারে চার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালনের পর তারা এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
তার আগেই শিক্ষকরা হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, দাবি নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনায় না বসলে তারা বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন করবেন।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চারটি দাবি হল-
>> সহকারী শিক্ষক পদ নবম গ্রেডে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত ও দ্রুত সময়ে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠন করে গেজেট প্রকাশ।
>> বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত শিক্ষকদের বিভিন্ন শূন্যপদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন।
>> সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে বকেয়া টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের মঞ্জুরি আদেশ তিন কর্মদিবসের মধ্যে দেওয়া।
>> ২০১৫ সালের পূর্বের মতো সহকারী শিক্ষকদের ২-৩টি ইনক্রিমেন্টসহ অগ্রিম বর্ধিত বেতন সুবিধা বহাল করে গেজেট প্রকাশ।
বাসমাশিসের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও রাজধানীর সবুজবাগ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আব্দুস সালাম রোববার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের সঙ্গে সরকার বা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কোনো আলোচনা করেননি। তাই আমরা সোমবার থেকে কর্মবিরতি শুরু করবো।”
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে গেল ২৩ নভেম্বর থেকে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা সোমবার থেকে পরীক্ষা বর্জন করবো। দাবি-দাওয়া সরকার মেনে নেওয়ার আগে আমরা ক্লাসে ফিরবো না।”
সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকদের কর্মবিরতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিদপ্তরের একজন পরিচালক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তাদের (শিক্ষকদের) দাবি দাওয়া মন্ত্রণালয়ের নজরে আছে। কিন্তু আমরা অনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি মাধ্যমিক শাখার অতিরিক্ত সচিব মো. সাইদুর রহমানের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।
প্রাথমিক শিক্ষকদের একাংশও কর্মবিরতিতে
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের একাংশ রোববার পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেছেন। তারা সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া বার্ষিক পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।
‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের’ কয়েক দিন আগে দশম গ্রেডে বেতনসহ তিন দাবিতে তারা আন্দোলন করে আসছেন। পরে ১১তম গ্রেডে বেতনের আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত করেন।
নোয়াখালী সদর উপজেলার ত্রিপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কর্মবিরতি পালনের তথ্য দিয়েছেন ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের’ আহ্বায়ক ও স্কুলটির শিক্ষক মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ।
সন্ধ্যায় তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অর্থ মন্ত্রণালয়ের আশ্বাস অনুযায়ী তিন দফা দাবির মধ্যে ১১তম গ্রেডের প্রজ্ঞাপন জারি ও অন্যান্য দাবি বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় আমরা পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করছি।
“অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আপাতত ১১তম গ্রেডসহ তিন দফা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণদিবস কর্মবিরতি কর্মসূচি চলবে।
“সোমবার থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। আমরা সে কর্মবিরতিতে অটল আছি, সোমবার থেকে বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন করবো।”
ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার চাঁনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও কর্মবিরতি পালন করেছেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন স্কুলটির শিক্ষক ও পরিষদের আরেক আহ্বাবায়ক মো. আবুল কাসেম।
তিনি বলেন, “আমরা বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন করে লাগাতার কর্মবিরতি চালিয়ে যাবো।”
তবে, গ্রেড ও পদোন্নতি নিয়ে জটিলতা নিরসনের তিন দাবি পূরণে মঙ্গলবার থেকে ‘তিন দিনের পূর্ণদিবস কর্মবিরতি’ পালন করে রোববার থেকে ক্লাসে ফিরেছেন প্রাথমিকের শিক্ষকদের বারোটি সংগঠনের মোর্চা ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ’ অনুসারীরা; তারা বার্ষিক পরীক্ষা নেবেন বলেছেন।
এ মোর্চাভুক্ত সংগঠন ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের’ সভাপতি শাহীনুর আল আমিন বলেন, “আমরা তিনদিন লাগাতার কর্মবিরতি পালন শেষে রোববার থেকে ক্লাসে ফিরেছি। সোমবার থেকে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু, আমরা বাচ্চাদের জিম্মি করে কোন কর্মসূচি নেব না।”
ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাঘাসুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কর্মবিরতিতে নেই বলেছেন স্কুলটির এই সহকারী শিক্ষক।
তিনি বলেন, “১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বার্ষিক পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ করে আমরা ১১ ডিসেম্বর থেকে অনশন কর্মসূচি শুরু করবো।”
এদিকে ঠিকমত বার্ষিক পরীক্ষা না নিলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
সোমবার থেকে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় সাময়িক পরীক্ষা (বার্ষিক পরীক্ষা) শুরু হবে তুলে ধরে রোববার অধিদপ্তরের এক আদেশে বলা হয়েছে, এই পরীক্ষা গ্রহণে কোনো প্রকার ‘শৈথিল্য বা অনিয়ম’ পরিলক্ষিত হলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরীক্ষা কার্যক্রম বিনা ব্যর্থতায় নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে ওই আদেশে সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।