১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় দুই অধ্যাদেশ অনুমোদন

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অধ্যাদেশ দুটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় দুই অধ্যাদেশ অনুমোদন
ছবি: পিআইডি

বিডিনিউজ২৪

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Oct 2025, 06:43 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:26 PM

ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিনিময় ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা’ ও ‘জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা’ অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে সরকার।

তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অধ্যাদেশ দুটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বৈঠকে সভাপতি ছিলেন।

বৈঠকে আইসিটি বিভাগের এক উপস্থাপনায় বলা হয়, ব্যক্তিগত উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে উপাত্তের গোপনীয়তা, বিশ্বস্ততা, সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ ন্যায্যতা, আন্তঃপরিবাহিতা, ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনা সুরক্ষিত করা এবং দায়িত্বশীল উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণয়নের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। অধ্যাদেশটি জারি হলে উপাত্ত সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত বা ধারণ, ব্যবহার বা পুনঃব্যবহার, স্থানান্তর, প্রকাশ, বিনষ্টকরণ, আন্তর্জাতিক মান বজায় সর্বোপরি ডিজিটাল সেক্টরের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিকালে ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়ব বলেন, “১৯৯৯ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ‘ইন্টারঅপারেবলিটি’ নিশ্চিত করার জন্য নতুন ধারণা নিয়ে আসে। ২০১৬ সালে তারা ‘জেনারেল ডেটা প্রটেকশন রেগুলেশন’ বা জিডিপিআর নিয়ে আসে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যারা ডেটা ও সফটওয়্যার সংক্রান্ত লেনদেন করে, তাদের মধ্যে কমপ্লায়েন্সের একটা বিষয় চলে আসে।

“বাংলাদেশে যেহেতু এই ধরনের কোনো আইন ছিল না, তাই এই দেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি ভুগছিল। বাংলাদেশে জেনারেল ‘ডেটা প্রটেকশন’ ছিল ব্যবসায়ী বেসিস ও বিজনেস কমিউনিটির দীর্ঘদিনের দাবি। এটা ভবিষ্যতে ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য একটা মাইলফলক।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে সরকারি, বেসরকারি ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যক্তিগত তথ্য আদান প্রদান হত। এতদিন মনে করা হত ডেটার মালিক সরকার বা যেই প্রতিষ্ঠানের কাছে আছে তাদের। আজকে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশের মাধ্যমে ডেটার মালিকানা বা স্বত্বাধিকারী হবে ব্যক্তি। ব্যক্তির অনুমতি সাপেক্ষে প্রতিষ্ঠান তার তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিনিময় বা প্রক্রিয়াজাত করতে পারবে।

“প্রতিষ্ঠান কীভাবে আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে ডেটা দেবে সেটাও এই আইন দ্বারা সংরক্ষিত থাকবে। যদি দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ডেটা আদান প্রদান হয়, তাহলে সেটা দেখভালের জন্য একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। আমরা সেটাকে বলছি ‘জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’। এই আইনে জামিন অযোগ্য কোনো ধারা নেই। এটাকে জিডিপিআর এর কাছাকাছি নিয়ে গেছি। আমরা ব্যক্তিগত তথ্যকে চার ভাগে শ্রেণি বিন্যাস করেছি। ব্যক্তিগত উপাত্ত সরকারি, ব্যক্তিগত উপাত্ত বেসরকারি, সংবেদনশীল ব্যক্তিগত উপাত্ত, গোপনীয় ব্যক্তিগত উপাত্ত।”

‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’

>> কোনো ব্যক্তির উপাত্ত তার মালিকানাধীন গণ্য করে তার সম্মতিতে আইনসম্মতভাবে প্রক্রিয়াকরণের বিধান রাখা হয়েছে।

>> ব্যক্তিগত উপাত্ত সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রক্রিয়াকরণের উদ্দেশ্য, ধারণ-মেয়াদ, স্থানান্তর ও প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করে উপাত্তধারীর সম্মতি গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে।

>> শিশু বা সম্মতি প্রদানের সক্ষম নয়, এমন ব্যক্তি সম্পর্কিত উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণে পিতামাতা বা আইনগত অভিভাবক বা সিদ্ধান্ত প্রদান করতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত এমন ব্যক্তির সম্মতি গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে।

>> উপাত্তধারীর লিখিত আবেদনের মাধ্যমে উপাত্ত জিম্মাদারের নিকট উপাত্তধারীর অধিকার প্রয়োগের বিধার রাখা হয়েছে।

>> সংবেদনশীল ব্যক্তিগত উপাত্ত শর্তসাপেক্ষে প্রক্রিয়াকরণের বিধান রাখা হয়েছে।

>> উপাত্ত-জিম্মাদার কর্তৃক প্রক্রিয়াকৃত উপাত্তে উপাত্তধারীর প্রবেশাধিকারের বিধান রাখা হয়েছে।

>> উপাত্তধারী যেকোনো সময় সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে তার সম্মতি প্রত্যাহার করতে পারবেন।

>> উপাত্তধারীর সম্মতি ব্যতিরেকে, যে উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছিল, সে উদ্দেশ্যে ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত উপাত্ত প্রকাশ করা যাবে না।

>> জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা বা জনস্বার্থ, অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, জনস্বাস্থ্য, সরকারি তহবিলের অপব্যবহার, অনুসন্ধান বা তদন্ত, পরিসংখ্যান প্রস্তুতকরণ, শিক্ষা, শৈল্পিক কাজ বা সাহিত্য রচনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণের প্রয়োজন হলে উপাত্তধারীর সম্মতি গ্রহণ হতে অব্যাহতির বিধান রাখা হয়েছে।

>> এই অধ্যাদেশে সরকার ব্যক্তিগত উপাত্ত চারটি শ্রেণিতে বিভাজন করা হয়েছে। (ক) পাবলিক বা উন্মুক্ত ব্যক্তিগত উপাত্ত (খ) অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিগত উপাত্ত (গ) গোপনীয় ব্যক্তিগত উপাত্ত (ঘ) সীমাবদ্ধ ব্যক্তিগত উপাত্ত।

>> এই অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণের নিমিত্ত দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক এবং আন্তঃসীমান্ত ব্যক্তিগত উপাত্ত বিনিময় এবং অন্যান্য সহযোগিতার উদ্দেশ্যে অন্য যেকোনো দেশ বা বহুপাক্ষিক সংস্থা বা কনসোর্টিয়াম বা ফোরামের সাথে সংযুক্তির বিধান রাখা হয়েছে।

>> উপাত্তধারীর অধিকার লঙ্ঘিত হলে প্রশাসনিক জরিমানা এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে।

>> এই অধ্যাদেশের বিধান লঙ্ঘন করে অসৎ উদ্দেশ্যে প্রক্রিয়াকরণ, অননুমোদিতভাবে প্রবেশ বা হস্তক্ষেপ, বেআইনি টেম্পারিং, অপব্যবহার, সংবেদনশীল ব্যক্তিগত উপাত্ত অননুমোদিতভাবে প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে দণ্ড আরোপের বিধান রাখা হয়েছে;

‘জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’

উপাত্তের আইনসম্মত ব্যবহার, ব্যক্তিগত উপাত্তের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করে এর মজুদ, সংরক্ষণ, স্থানান্তরের জন্য এই কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। এর বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে-

>> সরকারি-বেসরকারি/দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যক্তিগত উপাত্তের আইনানুগ আন্তঃপরিচালন নিশ্চিত করা।

>> প্রধানমন্ত্রী/প্রধান উপদেষ্টাকে চেয়ারম্যান করে একটি নীতি-নির্ধারণী বোর্ড গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

>> এই অধ্যাদেশের অধীনে ‘জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে।

>> সরকারি সফটওয়্যার কোড সংরক্ষণ, শেয়ারিং ও সিকিউরিটি প্রটোকল নির্ধারণের জন্য জাতীয় কোড রিপ্রেজেন্টরি সম্পর্কিত বিধান রাখা হয়েছে।

>> এআই ব্যবহার করে ডাটা বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্দেশ্যে এআই ভিত্তিক ‘ডেটা এনালিটিক্স’ ক্ষমতায়নের বিষয়ে বিধান রাখা হয়েছে।

>> এই অধ্যাদেশের বিধান লঙ্ঘনের জন্য প্রশাসনিক জরিমানা এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে।

>> এই অধ্যাদেশে নির্ধারিত পদ্ধতিতে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের, বিচারার্থে গ্রহণ ও দণ্ড আরোপের বিধান রাখা হয়েছে।

>> এই অধ্যাদেশের অধীন অপরাধসমূহ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য হবে।