ছাত্রদের যৌন নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠা ৫১% মাদ্রাসা শিক্ষক: জেএমবিএফ
এর বাইরে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের ৪৭ জন প্রতিবেশী, আটজন স্কুল শিক্ষক ও পাঁচজন আত্মীয়।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ছেলে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ১৭২টি ঘটনার তথ্য দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন— জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ)।
ফ্রান্সভিত্তিক সংগঠনটির হিসাবে, এসব ঘটনায় ২৩৫ শিশু আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের ১৫৩ জন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী; ৬৩ জন স্কুলের শিক্ষার্থী।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সেই ২০১ জনের ১১৮ জন মাদ্রাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ইমাম ও মুয়াজ্জিন।
অভিযোগ অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ৬ থেকে ১০ বছরের শিশুরা; ১২৫ জন। ১০১ জনের বয়স ১১ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে।
সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ করা জেএমবিএফ মাসে মাসে বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের তথ্য হালনাগাদ করে। সংবাদমাধ্যমে আসা খবরের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তারা, যার শিরোনাম হলো, ‘বাংলাদেশে ছেলে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা’।
গেল ১ অক্টোবর সবশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংগঠনটি। নভেম্বরে ১০ মাস নিয়ে আরেকটি হালনাগাদ প্রকাশ করবে তারা।
২৪ অক্টোবর পর্যন্ত হিসাব তুলে ধরে সংগঠনটি বলেছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের ১০৩ জন বা ৫১ শতাংশ মাদ্রাসার শিক্ষক, ছয়জন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, পাঁচজন ইমাম ও চারজন মুয়াজ্জিন।
এদের বাইরে ৪৭ জন প্রতিবেশী, আটজন স্কুল শিক্ষক এবং পাঁচজন আত্মীয় রয়েছেন।
নির্যাতনের স্থান ও ধরন
শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটে মাদ্রাসায়। সেখানে ৯১টি ঘটনায় ১৩৭ শিশুর নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ পেয়েছে জেএমবিএফ।
এর বাইরে পাড়া-মহল্লায় ২৯টি ঘটনায় ২৯ শিশু, স্কুলে ছয়টি ঘটনায় ২০ শিশু এবং মসজিদে ছয়টি ঘটনায় সাত শিশুর ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, এমন ৬০টি ঘটনা রয়েছে, যেগুলোতে ১১৭ শিশুর ওপর একাধিকবার নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ১০৫টি ঘটনায় ১৪৭ শিশুর ক্ষেত্রে জবরদস্তি, ২৯টি ঘটনায় ৪৮ শিশুর ক্ষেত্রে ভয়ভীতি বা হুমকি এবং ৩১টি ঘটনায় ৩৩ শিশুর ক্ষেত্রে প্রলোভন দেখানোর তথ্য রয়েছে।
জেএমবিএফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাঁচটি ঘটনায় নয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ৪২টি ঘটনায় ৫৭ শিশু শারীরিক আঘাত পেয়েছে এবং ১৮টি ঘটনায় ২০ শিশু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।
আগস্টে সর্বোচ্চ নির্যাতন
জেএমবিএফের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টে সবচেয়ে বেশি ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৪৩ শিশু ভুক্তভোগী হয়েছে। মে ও জুনে ২৩টি করে, সেপ্টেম্বরে ২৪টি এবং অক্টোবরের ২৪ তারিখ পর্যন্ত ১৮টি ঘটনার তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে ৩৮টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৫টি এবং খুলনা বিভাগে ২৬টি ঘটনা রয়েছে।
মামলা ও তদন্তের অবস্থা
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ১৭২টি ঘটনার মধ্যে ১৪৮টিতে মামলা বা জিডি হয়েছে।
এসব ঘটনায় ১৩৫ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে। তিনটি ঘটনায় ১৭ অভিযুক্তের মধ্যে আংশিক গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি। এ ছাড়া ১৪১টি ঘটনায় ১৭০ শিশুর বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং একটি ঘটনায় এক শিশুর মামলায় বিচার শুরুর তথ্য রয়েছে।
জেএমবিএফ জানিয়েছে, নথিবদ্ধ নির্যাতনের এসব ঘটনায় কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন, অভিযোগপত্র দাখিল কিংবা সাজা হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিশু নির্যাতন প্রসঙ্গে জেএমবিএফের সভাপতি শাহানুর ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের যাবতীয় তথ্য সংবাদমাধ্যম থেকে নেওয়া। তবে বাস্তবতা হলো, সংবাদমাধ্যমে সব ঘটনা প্রকাশিত না হওয়ায় আমরা আশঙ্কা করছি, প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা নথিভুক্ত সংখ্যার চেয়ে পাঁচ থেকে ১০ গুণ বেশি হতে পারে।”
মাদ্রাসায় বালকদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে ‘সমকামিতার’ সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার অভিযোগ তুলে শাহানুর ইসলাম বলেন, “শিশু ধর্ষণ ও সমকামিতা এক বিষয় নয়। কিছু ধর্মীয় বক্তা সমকামিতার বিরোধিতা করলেও মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনায় তাদের স্পষ্ট অবস্থান দেখা যায় না। এটা খুবই হতাশাজনক।”
শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. সামিনা লুৎফা নিত্রা।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ধর্ষণ একটি ফৌজদারি অপরাধ। এই অপরাধের বিচার হতে হবে। ঘটনাটি মাদ্রাসায় হোক বা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে— বিচারটা নিশ্চিত করতে হবে।”
ভুক্তভোগীদের নীরবতা ও ঘটনা প্রকাশ না পাওয়ার বিষয়ে সামিনা লুৎফা বলেন, বাংলাদেশের মতো সমাজে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিরা সাধারণত এ বিষয়ে কথা বলতে চান না। আইনে ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে। তাই ভুক্তভোগীরা সামনে আসতে না চাইলে সেটিকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে বিদ্যমান নির্দেশনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন এই সমাজবিজ্ঞানী।
তিনি বলেন, “হাই কোর্ট ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলা মিডিয়াম, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মাদ্রাসাতেও যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা এবং কমিটি থাকা বাধ্যতামূলক। যেহেতু ঘটনাগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, তাই এখানে কোনো ‘যদি-কিন্তু’র সুযোগ নেই।”
মাদ্রাসা, স্কুল, এতিমখানা ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন এবং শিশুদের অভিযোগ জানানোর স্বাধীন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছেন শাহানুর ইসলাম।
অনানুষ্ঠানিক সালিশ বা অর্থের বিনিময়ে সমঝোতার বিরোধিতা করে এসব ঘটনায় রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।
একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুদের নাম-পরিচয় গোপন রাখা এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান জেএমবিএফের সভাপতি।
