১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

মহাখালীতে বাসের জন্য হাহাকার, সায়েদাবাদে যাত্রী সংকট

“বলেন ভাই ২৫০ টাকার ভাড়া ১০০০ টাকা; কেমন যামু বলেন।”

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 19 Mar 2026, 03:43 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:11 PM

ঈদযাত্রার শেষ মুহূর্তে ঢাকার দুই বাস টার্মিনালে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে; মহাখালীতে বাসের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষা ফুরাতেই চাইছে না, আর সায়েদাবাদে হন্য হয়েও মিলছে না যাত্রী।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এ দুই টার্মিনালে এ চিত্র দেখা গেছে। মহাখালী বাস অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও তুলছেন যাত্রীরা।

তাদের ভাষ্য, ২০০ টাকার ভাড়া ৮০০-১০০০ টাকা রাখা হচ্ছে। আর বাস কাউন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলছেন, নির্ধারিত ভাড়ার বেশি তারা নিচ্ছেন না।

মহাখালী টার্মিনালে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের হা-হুতাশ দেখা গেছে। অনেকেই আগেভাগে অনলাইন থেকে বা সরাসরি টিকেট সংগ্রহ করেছেন। অনেকেই এদিনই লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করছেন, টিকেট মিললেও বাস কখন আসবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না।

টিকেট আছে, বাস নেই

মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলা ও টাঙ্গাইলগামীদের কেউ কেউ

টিকেট পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন; আবার কেউ কেউ টিকেট-বাস কোনোটাই পাচ্ছেন না।

ময়মনসিংহের যাত্রী ইমরান হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি আর ছোট বোন বাড়ি যাওয়ার জন্য দুই ঘণ্টা হলো লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, টিকেটের দেখা নাই। কখন টিকিট পাব- বলতে পারি না।”

ময়মনসিংহের যাত্রী সোহেল রানা বলেন, “ময়মনসিংহ যাব- ভোর ৫টার সময় এসেছি, হাতে টিকিট পাইছি; এখন বাজে ১২টা, কিন্তু কোনো বাসের দেখা পাই নি।”

টিকেট সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে আরেক যাত্রী জুনায়েদ আহমেদ বলেন, “এখনও টিকেট পাইনি। লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, দেখি- কখন টিকেট হাতে পাই।"

টাঙ্গাইলের যাত্রী আশরাফুল আকাশ বলেন, “ভোরে এসে ৯টায় টিকেট পেয়েছি, ঘণ্টা পার হলেও গাড়ি নাই।”

টিকেট-গাড়ি কোনোটাই না পেয়ে হতাশ নেত্রকোণার যাত্রী আহমেদ হোসেন।

তিনি বলেন, “গাড়ি-টিকেট কোনোটাই নাই। ৩ ঘণ্টা ধরে বসে আছি।”

বেশি টাকায় টিকেট-গাড়ি দুটোই মিলছে

ময়মনসিংহ বিভাগের যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক বাস মালিকরা কাউন্টার বন্ধ করে বেশি ভাড়া নিয়ে টার্মিনালের ভেতর থেকে যাত্রী উঠাচ্ছে। তাতে করে ২০০-৩০০ টাকার ভাড়া গুনতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা।

ময়মনসিংহের যাত্রী হোমায়রা বেগম অভিযোগ করে বলেন, “আগে ২০০-২৫০ টাকা দিয়ে ময়মনসিংহে যাইতাম, আজকে হেরা ৮০০ টাকা চায়। কেমনে বাড়ি যায়াম। 

“ডাক দিয়া ভিতরে নিয়া কয় ৮০০ দেন, গাড়িত উঠেন। ভাড়া বেশি দেহি, কম পাইনি।”

টাঙ্গাইল ঘাটাইলের যাত্রী নিলয় ইসলাম বলেন, “বাসের লোকজন সিন্ডিকেট করছে, তারা ইচ্ছা করে বাসের সংকট তৈরি করেছে, যাতে করে ভাড়া বেশি নিতে পারে।”

সালাম মিয়া নামের আরেক যাত্রী বলেন, “কাউন্টার বন্ধ করে তারা লোজনদের ডেকে পিছনে নিয়ে ১২০০ টাকা, ১০০০ টাকা চায়। বলেন ভাই ২৫০ টাকার ভাড়া ১০০০ টাকা; কেমন যামু বলেন।”

মাহমুদা নামের ৫০ বছর বয়সী এক যাত্রী বললেন, আগেই টিকেট কাটা। 

“রোজা রেখে এভাবে সকাল থেকে বসে আছি। গাড়ির খবর নেই।”

রাস্তায় যানজট আর যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় বাস সংকট বলে ভাষ্য বাস কর্মীদের। তারা বলছেন, তীব্র যানজট থাকার কারণে টার্মিনালে বাস সঠিক সময়ে আসতে পারছে না। এছাড়া হঠাৎ যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।

ঈশ্বরগঞ্জ পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার জুয়েল বলেন, “গতকালের তুলনায় আজ কিছুটা যাত্রীর চাপ কম। তবে সকালে আরও বেশি যাত্রীর চাপ।

“কাউন্টারে গাড়ি আসলে আমরা টিকেট দিচ্ছি। গাড়িতে আসন ফুল হয়ে গেলে গাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। একটা গাড়ি ছেড়ে গেলে আবার নতুন করে পরের গাড়ির টিকেট দেওয়া হচ্ছে।”

শ্যামলী বাংলা পরিবহনের সুপারভাইজার মেহেদী হাসান বলেন, “সকাল থেকে অনেক গাড়ি টার্মিনাল ছেড়ে গেছে। রাস্তায় জ্যামের কারণে গাড়ি সঠিক সময়ে টার্মিনালে আসছে না।”

সৌখিন এক্সপ্রেসের চালকের সহকারী আজাদ বলেন, “যাত্রীর চাপ অনেক। সব গাড়ি ফুল যাচ্ছে। কিন্তু রাস্তায় অনেক জ্যাম। 

“যানজটের কারণে অনেক গাড়ি সময় মতন যেতে ও ফিরে আসতে পারছে না। তাই গাড়িরও সংকট আছে।”

শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের নওগাঁ রুটের টিকেট মাস্টার স্বপন বলেন, “গতকাল টাঙ্গাইল রুটে দীর্ঘ জ্যামের কারণে গাড়ি আসতে পারছে না। ফলে আমরা আমাদের শিডিউল মত গাড়ি ছাড়তে পারছি না।

“এতে ঝামেলার সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা যাত্রীদের বোঝানোর চেষ্টা করছি। গাড়ি আসা মাত্র ছেড়ে দিচ্ছি।”

সায়েদাবাদে যাত্রী সংকট

পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের বেশিরভাগ যাত্রী সায়েদাবাদ ও আশপাশের এলাকার কাউন্টার থেকে যাত্রা করে থাকেন।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের জন্য সায়েদাবাদ এলাকায় কাউন্টার গড়ে ওঠে। তাছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াতের জন্য সদরঘাটে লঞ্চ সেবা থাকায় যাত্রীর চাপ কম বলে মনে করছেন বাস সংশ্লিষ্টরা।

আর সিলেট-চট্টগ্রাম অঞ্চলেও যাত্রীদের চাপ কম থাকায় যাত্রী সংকটে ভুগছেন বাস মালিকরা।

সায়েদাবাদ ফকির বাড়ির বাস কাউন্টারগুলো এখন পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সেখানকার নোয়াখালী-লক্ষীপুর অঞ্চলের পরিবহন নীলাচলের কাউন্টার মাস্টার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “গাড়ি অ্যাভেইলএবল আছে, যাত্রী নাই। 

“সময়মত গাড়ি ছাড়তে হলে কমপক্ষে ৭-৮টা সিট ফাঁকা রাখতে হয়। এই মাত্র যেই গাড়িটা ছাড়লাম সেখানে ৮টা সিট ফাঁকা।”

সিলেটগামী শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের কাউন্টার ম্যানেজার শিমুল চন্দ্র রায় বলেন, “এখন আপনে দেখেন, সাধারণ সময়ের চেয়ে যাত্রী কম। 

“কোন গাড়ি দেখাতে পারবেন যাত্রী আছে, সব গাড়িতেই অনেক সিট ফাঁকা।”

চট্টগ্রামগামী হানিফ বাস কাউন্টারের মাস্টার জাহাঙ্গীর বলেন, “আমাদের এখানে যাত্রীর চাপ আছে, তবে গাড়িও বেশি থাকায় কোনো যাত্রীকে বসে থাকতে হ্ছে না। 

“কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েকটা সিট ফাঁকা রেখেই ছেড়ে দিচ্ছি।”

ফকির বাড়ি কাউন্টার এলাকায় দায়িত্বরত এক পুলিশের সার্জেন্ট বলেন, “যাত্রীর চাপ একেবারেই কম, তাই কিছুটা স্বস্তি।”

সায়েদাবাদ টার্মিনাল ফাঁকা

সায়দাবাদ টার্মিনালের ভেতর থেকে দূর দূরান্তের গাড়ি ছাড়ে মূলত রাতে। এর বাইরে কয়েকটি টার্মিনাল থেকে দিনের বেলায়ও গাড়ি ছাড়ে।

সায়েদাবাদ টার্মিনাল ১ থেকে কিশোরগঞ্জ ভৈরব অঞ্চলের গাড়ি ছেড়ে যায়।

সেখানকার ইশা খাঁ ৩২ বাসের কাউন্টারে টিকেট বিক্রেতা ইমন বলেন, “যাত্রীর চাপ কম, তবে আমাদের গাড়ি খালি যাবে না, কারণ যাত্রাবাড়ী ও চিটাগাং রোডে কাউন্টার আছে।”

টার্মিনাল-২ এ গিয়ে দেখা যায়, বাসের চালকের সহকারীরা হাঁকডাক দিয়ে যাত্রী টানার চেষ্টা করছেন। যাত্রী কম থাকায় বাস ছাড়তে পারছেন না অনেকে।

ঢাকা থেকে বাগেরহাটের বারেন্দীগামী আরপি লাইন পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার কামরুজ্জামান বলেন, “গাড়ি আছে, যাত্রী নাই। বাসের হেলপাররা ডাকাডাকি করে যাত্রী তুলছে।”

ঢাকা থেকে মঠবাড়িয়াগামী বনফুল ট্রান্সপোর্টের টিকেট বিক্রেতা রাজু আহমেদ বলেন, “যাত্রী কই, আগে কোনো দিন আমাদের সামনে পর্যস্ত আসতে পারছেন, আজকে দেখেন শত শত বাস আছে, যাত্রী মাত্র ১০-১২ জন।”

ঢাকা-পাথরঘাটা রুটের রাজীব পরিবহনের টিকেট বিক্রেতা মো. মনির বলেন, “১০ সিট খালি রেখে আগেরটা ছেড়েছি। পরেরটার কথা জানি না, যাত্রী নাই।”

টার্মিনাল-৩ এ মূলত রাতের যাত্রার জন্য। কাউন্টারে দু-একজন থাকলেও তারা বুকিং দেওয়ার জন্য এসেছেন বলে জানান আল শামীম এক্সপ্রেসের কাউন্টার মাস্টার আনোয়ার।

তিনি বলেন, “বুকিংয়ের জন্য কাউন্টার খোলা রেখে বসে থাকতে হয়। এই টার্মিনালে মূলত রাতের যাত্রীদের জন্য বাস ছাড়ে।”