১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

তিন অভাবে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিপজ্জনক মাত্রায়: অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার

“আজকাল সবাই ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছেন। যার ফলে যেটা হচ্ছে কী, ভূমিকম্পের বিষয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এবং সরকারের নীতি নির্ধারক যারা রয়েছেন তাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের মেসেজ যাচ্ছে। তারা কনফিউজড এবং তারা মিসগাইডেড হচ্ছেন।”

তিন অভাবে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিপজ্জনক মাত্রায়: অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার
ভূমিকম্পে পুরান ঢাকার বংশালের কসাইটলি এলাকার যে ভবনের রেলিং ভেঙে তিনজনের প্রাণ গেছে, শনিবার সেখানে ভিড় করেন উৎসুক মানুষেরা। ছবি: আব্দুল্লাহ আল মমীন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 24 Nov 2025, 03:04 AM

Updated : 10 Sep 2026, 12:46 PM

আজ হোক, কাল হোক, বা ৫০ বছর পর, বড় ধরনের একটি ভূমিকম্পের বিপদ যে বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের মনে। 

কিন্তু তার মতে, জনগণের সচেতনতা, সরকারের পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতির অভাবেই ভূমিকম্পের ওই ঝুঁকি বিপদজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

এই ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞের কথা হল, ভূমিকম্প ঠেকানো যাবে না, প্রতিরোধ করা সম্ভব না, আগাম সংকেতও দেওয়া যাবে না; কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব, যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। 

“সব কথার শেষ কথা যেটা হচ্ছে, আমাদের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধ বা ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা…।”

এক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে জনগণকে সচেতন করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “এটার জন্যে সামাজিক আন্দোলন করতে হবে। ভূমিকম্পের নিয়মিত মহড়া করতে হবে। 

“এখানে সবারই দায়িত্ব আছে। সাধারণ মানুষ, সরকার, রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন পেশাদার–সবার আসলে এখানে দায়িত্ব রয়েছে, তাদেরকে নিয়ে সামাজিক আন্দোলন তৈরি করে জনগণকে সচেতন করে যদি আমরা করতে পারি, তাহলে একটা সেইরকম যদি ভূমিকম্প হয়, তাহলে তার মানে ক্ষয়ক্ষতি, জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে আনা সম্ভব।”

শুক্র ও শনিবার দুই দিনে চার দফা ভূমিকম্পের পর মানুষের মধ্যে আতঙ্কের মধ্যে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোচনা অনুষ্ঠান ইনসাইড আউটে এসেছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালওয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার।

বার বার নরসিংদী এলাকায় ভূমিকম্পের কারণ, ভূমিকম্প পরবর্তী সাড়াদানে সক্ষমতার ঘাটতি, সরকারের ‘অনাগ্রহ’, বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি খোলামেলা কথা বলেন। 

রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ফেইসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়।

ভূমিকম্পের বিপদের মধ্যে সোশাল মিডিয়ায় অপতথ্য ও ভুল ব্যাখ্যার মহোৎসব যে আতঙ্ক আর জটিলতা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে, সে কথাও বলেন হুমায়ুন আখতার।

তিনি বলেন, “আজকাল সবাই ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছেন। যার ফলে যেটা হচ্ছে কী, ভূমিকম্পের বিষয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এবং সরকারের নীতি নির্ধারক যারা রয়েছেন তাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের মেসেজ যাচ্ছে। তারা কনফিউজড এবং তারা মিসগাইডেড হচ্ছেন।”

দুই উৎস

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দুই দশকের বেশি সময় ভূমিকম্প নিয়ে কাজ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার। ১২ বছরের তথ্য উপাত্ত নিয়ে তাদের একটি গবেষণা প্রতিবেদন নেচার জিও সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছিল। 

সেই প্রসঙ্গ ধরে এ ভূতত্ববিদ বলেন, “সেখানে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে দেখিয়েছি এবং বলেছি বাংলাদেশে দুটো ভূমিকম্পের উৎস রয়েছে। একটা হচ্ছে উত্তরে হচ্ছে ডাউকি ফল্ট; যেটা বাংলাদেশ দেশের অভ্যন্তর দিয়ে গেছে পলি মাটি দিয়ে ঢাকা, হিডেন।”

এ চ্যুতি যমুনা নদী থেকে ময়মনসিংহ হয়ে শেরপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট, জৈন্তাপুর হয়ে ইন্ডিয়ার করিমগঞ্জের ওদিকে চলে গেছে।

তিনি জানান, এই ফল্টে অতীতে অনেক বড় বড় ভূমিকম্প হয়েছে। ১৮৯৭ সালে গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক ছিল রিখটার স্কেলে ৮.৩ মাত্রার। 

সেই ভূমিকম্পে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তার ১০০ বছর আগে ১৭৯২ বা ১৭৯৭ সালে আরেকটা বড় ভূমিকম্প হয়। সেটা বহ্মপুত্রের নদীর গতিপথ পরিবর্তন করেছে। যেটা ময়মনসিংহ দিয়ে প্রবাহিত হত, সেটা এখন যমুনা দিয়ে। তাহলে একটা বিরাট পরিবর্তন।”

ভূমিকম্পের আরেকটি উৎস হচ্ছে দেশের পূর্বে, যেটাকে বিশেষজ্ঞরা ‘সাবডাকশন জোন’ বলে থাকেন। এ উৎসটি সিলেট থেকে দক্ষিণে কক্সবাজারে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। 

অধ্যাপক হুমায়ূন আখতার বলেন, একটি প্লেট যখন আরেকটি প্লেটের নিচে চলে যায়, তখননিচের অংশকে বলা হয় সাবডাকশন জোন। এখানে ইন্ডিয়ান প্লেট পুবে বার্মা প্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। 

“এই যেখান থেকে তলিয়ে যাচ্ছে সেটা হচ্ছে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ হাওর হয়ে মেঘনা নদী দিয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে চলে গেছে। এখন এইটা হচ্ছে দুটা প্লেটের সংযোগস্থল।”

‘বড় বিপদ অবধারিত’

ভূতত্ত্ববিদ হুমায়ুন আখতার বলেন, মানচিত্রে নরসিংদীর অবস্থান হল দুটো প্লেটের সংযোগস্থলে।

“এখন দুটো প্লেট পরস্পরমুখী। আমরা জিপিএস দিয়ে এর গতি নির্ধারণ করেছি। সেগুলো যে পরিমাণ গতিশীল এবং এই গতির কারণে কী পরিমাণ শক্তি ভূত্বকের মধ্যে সাবডাকশন জোনে জমা হচ্ছে, সেটা ১২ বছরের উপাত্ত দিয়ে পরিমাপ করেছি। আমরা দেখেছি, তাতে প্রতিবছর ১৭ মিলিমিটার করে সংকোচন হচ্ছে।”

নিজেদের গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এই সাবডকশন জোনে গত ৮০০ থেকে হাজার বছরে বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি।

দক্ষিণে টেকনাফ থেকে মিয়ানমারে (প্লেট সংযোগস্থল) ১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল ৮.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। সেখানকার ভূত্বকের মধ্যে সঞ্চিত শক্তি বের হয়ে আসে। 

“ওই ভূমিকম্পের ফলে সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ড যেটা ডুবন্ত একটা দ্বীপ ছিল, সেটা ৩ মিটার উপরে উঠে আসে। এবং মিয়ানমার অঞ্চলের চেদুয়া আইল্যান্ড ৬ মিটার উপরে উঠে আসে।”

এ গবেষক বলেন, ওই ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডু পাহাড়ে কাদা বালুর উদগীরণ হয়। বঙ্গোপসাগরে সুনামির সৃষ্টি হয়। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে যেসব কাঁচা বাড়িঘর ছিল, সেগুলা ধুয়ে যায়। ৫০০ থেকে ৭০০ লোকের প্রাণহানি হয়। 

দক্ষিণে ভূত্বকে জমা শক্তি বড় ভূমিকম্পের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে গেলেও উত্তরে বা মধ্যাঞ্চলে তা না ঘটায় বিপদ রয়ে গেছে বলে মনে করছেন হুমায়ুন আখতার।

তিনি বলেন, “আমাদের এই সেগমেন্টে, উত্তরের দিকে সিলেট থেকে চিটাগাং এখানে কোন এনার্জি রিলিজ হয়নি। পরশুদিন যে ভূমিকম্পটা হল সেটা হচ্ছে এইখানে, এই দুটা প্লেটের সংযোগস্থলে। এখন একটা চিত্র পেয়ে গেলাম।

“সাবডাকশন জোনে কী পরিমাণ শক্তি জমা হয়ে রয়েছে, সেটার চিত্রও আমরা পেয়ে গেছি। এই শক্তিটা আজ হোক কাল হোক বের হবেই; বের হতেই হবে, এর কোন বিকল্প ব্যবস্থা নেই। এখন কোন সময় সেটা আমরা বলতে পারি না।”

শুক্রবারের ভূকম্পনের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার জানান, “পরশুদিনের যে ভূমিকম্পটা হল সেটা হচ্ছে, যে শক্তি আটকে রয়েছে; তারই একটা পয়েন্টে একটা বিন্দুতে। ৫.৭ ম্যাগনিচিউডের শক্তি ওখান থেকে বের হল। এবং পরের দিন দুটো আফটার শক হল তার কিছুটা উত্তরে, ৫-১০ কিলোমিটার উত্তরে।

“বার্তাটা দিচ্ছে বিপুল পরিমাণ যে শক্তি সাবডাকশন জোনে জমা হয়ে রয়েছে, সেইটার বের হওয়ার দ্বার উন্মোচন হল; তা আনলক হল। দা প্রসেস হ্যাজ জাস্ট বিন স্টার্টেড। এখন ইট উইল কন্টিনিউ।”

এ বিশেষজ্ঞের ভাষ্য, “এটা সামনে কন্টিনিউ করবে। এখন হয়ত এক মাস, দুই মাস, ছয় মাস ধরে এটা চলতে পারে। তারপর একসময় হয়ত একটা বড় শক্তি বের হয়ে আসবে। তখনই ভয়াবহতা হবে, সেই বার্তাই এটা দিচ্ছে।”

ঢাকার বিপদ

এ ভূতত্ববিদ জানান, যে উৎস থেকেই ভূমিকম্প হোক না কেন, নানা কারণে রাজধানী ঢাকার বিপদটা বেশি। 

“ভূমিকম্পের উৎস যদি ৭০-১০০ কিলোমিটার দূরেও হয় এবং এবং ৭-৮ মাত্রার হয়, তাহলে সবচেয়ে ক্ষতি হবে ঢাকাতে। উৎসের কাছাকাছি যেসব নগর রয়েছে, সেখানে যতটা না ক্ষতি হবে, ঢাকায় বেশি ক্ষতি হবে। একটা ভূমিকম্পের ঝুঁকির জন্য যেসব উপাদান থাকা দরকার তার সবগুলা এখানে বিরাজ করছে।”

জনসংখ্যার ঘনত্ব ও অপরিকল্পিত নগরায়ন যে ঢাকায় হতাহতের ঝুঁকি বাড়িয়েছে, সে কথা বলেন এই বিশেষজ্ঞ। 

তিনি বলেন, “অপরিকল্পিত এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে নগরায়ন হয়েছে। এবং আরেকটা হচ্ছে বিল্ডিং কোড তো আগে ছিল না, ওই সময় তো অনেক বিল্ডিং হয়েছে। পরে আইন হলেও বিল্ডিং কোড ফলো করে এটা করা হয় না। 

“একটা নগরে যে কোনো স্ট্রাকচার করতে গেলে তো একটা সংস্থা একটা অথোরিটি আছে, তার কাছ থেকে পারমিশন নিতে হয়, কিছু জায়গা খালি রাখতে হবে, সেই জিনিসগুলো এখানে করা হয়নি।”

অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, “একটার সাথে একটা বিল্ডিং রয়েছে। মাশরুমের মত এই বিল্ডিংগুলো, দ্রুত এক্সপানশন হয়েছে। যেসব কমন ফ্যাসিলিটিস থাকা দরকার সেগুলো এখানে নাই। ওপেন স্পেস নেই। শিক্ষার জন্য অনেক দূরে যেতে হয়, হাসপাতালের সেবাতে আরেকটা জায়গায় যেতে হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা–সব দিক দিয়ে কিন্তু আমাদের অপরিকল্পনা এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি।” 

বিদ্যমান ইমারত বিধিকে একটি ‘ফল্টি বিল্ডিং কোড’ আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, “ভূমিকম্পের জন্য যে পরিমাণ শক্তি জমা হয়ে আছে, এটাকে তারা কনসিডারেশনে না নিয়ে এই বিল্ডিং কোড করছে।” 

অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার

অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার

সরকারের ‘প্রস্তুতির অভাব’, সচেতনতাও নেই

ভূতত্ববিদ হুমায়ুন আখতার বলেন, “আনপ্ল্যানড এন্ড আনকন্ট্রোলড (নগর)–এটা একটা জিনিস। এবং এই বিল্ডিংগুলার যারা বাসিন্দা, আমাদের মধ্যে ভূমিকম্পের বিষয়ে সচেতনতার অভাব। ভূমিকম্প হলে আমি কীভাবে রেসপন্ড করব, সেই জ্ঞানটা আমাদের নেই। অন্যান্য দুর্যোগের ক্ষেত্রে হয়ত রয়েছে, কিন্তু এইটার (ভূমিকম্প) ক্ষেত্রে আমরা নেই।”

সরকারের কোনো পদক্ষেপ না থাকা এর একটি কারণ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা তো পরশুদিনের ভূমিকম্পে দেখলাম বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজে, তাড়াহুড়া করে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে, বাইরে যখন আসছে, একজন ছাদ থেকে লাফ দিয়েছে। অনেক আহত হয়েছে। 

“আরেকটা হচ্ছে সরকারের এই বিষয়ে পরিকল্পনার অভাব, প্রস্তুতির অভাব। এইসব মিলিয়ে ঢাকা ভূমিকম্পের দিক দিয়ে ঝুঁকিতে একেবারে একটা বিপদজনক অবস্থায় রয়েছে।

দেশে বড়ধরনের ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে যে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে, সে কথাও বলেন এ বিশেষজ্ঞ। 

হুমায়ুন আখতার বলেন, এমন দুর্যোগে তাৎক্ষণিকভাবে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানী হতে পারে এবং উদ্ধার না পেয়ে আরও বিপুল সংখ্যক মানুষ ধুকেধুকে প্রাণ হারাতে পারে।

তিনি বলেন, ঢাকায় রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে বলে প্রকৌশলবিদরা ধারণা করছেন।

“তাৎক্ষণিকভাবে দুই লাখ লোক মারা যেতে পারে। বাকি যে বহুতল ভবনগুলো আছে সেখানে কেউ কেউ বেঁচে থাকবে বা ঘরের মধ্যে আহত অবস্থায় থাকবে সেগুলোর এক্সিটটা বন্ধ হয়ে যাবে। হয়তো নিচের তলা দেবে যাবে, একটা বিল্ডিংয়েরে সঙ্গে আরেকটা বিল্ডিং হেলে এক্সিট বন্ধ করে দেবে।”

এমন বিপর্যয়ের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগে আগুন ধরে যেতে পারে। যারা ঘরের মধ্যে আটকা পড়বেন, তারা খাদ্য, পানীয়জল ও প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবেন। উদ্ধারকারীরাও আসতে পারবেন না।

“এমন বিপর্যয় হলে কোন জায়গাটায় বেশি ড্যামেজ বা ডিজাস্টার হয়েছে, সেই চিত্রটা সরকার পাবে না। অথবা কীভাবে চিত্রটা পেতে পারে সেটিও তার পরিকল্পনার মধ্যে নেই।… নানা কারণে এমন পরিস্থিতিতে মানবিক বিপর্যয় চলে আসবে।”

সক্ষমতা কতটা?

আগে ভূমিকম্প সতর্কীকরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু প্রকল্প থাকলেও তহবিলের অভাবে সেগুলোর কার্যক্রম এখন চলছে না বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অবজারভেটরির সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার।

তিনি বলেন, “আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি, ইউজিসির হিট প্রজেক্টের অধীনে ওই কার্যক্রমগুলো চালু করেতে আমি পরামর্শ দিয়েছি। যেহেতু একটা ভূমিকম্প হল, এটা এখন গুরুত্ব পাবে। আশা করছি এগুলো সামনে চালু করতে পারব।

সরকারি পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ভূমিকম্প ‘গুরুত্ব পাচ্ছে না’ বলে আক্ষেপ করেন সৈয়দ হুমায়ুন আখতার।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে যখন একটা ভূমিকম্প হয়, তখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা যে ব্যুরো আছে, যে মন্ত্রণালয় আছে, তারা হয়ত সরকারের পক্ষ থেকে একটা বিবৃতি দিল বা সেমিনার করল, তার মধ্যে এটা সীমাবদ্ধ।

“ভূমিকম্প বিষয়ে যে কাজটা হয়েছে, সেটা ২০০৮ থেকে শুরু হয়ে ২০১১ তে শেষ হয়েছে সেটা হচ্ছে কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম-সিডিএমপি। সেটি ইউএনডিপির অর্থায়নে হয়েছে। বলা হয়েছিল সেটার ফলোআপ করা হবে। বরিশাল, ময়নসিংহ রাজশাহীসহ পাঁচটা সিটিতে ফলো আপ করা হবে। আর ওই সময় তিনটা সিটিতে করা হয়েছিল। থাইল্যান্ডভিত্তিক ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট সংস্থা এডিপিসি কিছু কাজ করেছে। এটা কিন্তু যথেষ্ট না।”

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, “এটা যে তারা করল, সরকারকে তাদের রেকমেন্ডেশন দিল, সরকারতো সে অনুযায়ী কাজ করবে। আমি সেই জায়গায় সরকারের অ্যাক্টিভিটিটা দৃশ্যমান দেখছি না।”

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি

দেশের উন্নয়নের কাজ যে রাজনীতিবিদরাই করবেন, সে কথা তুলে ধরে অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, “রাজনীতিবিদরা যেভাবে তাদের পরিকল্পনায় যেগুলো অগ্রাধিকার দেবেন, সেটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করবে। এটাতো দেশপ্রেমের বিষয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এটাকে আমি যদি রাইটলি অ্যাড্রেস না করি, এর সঙ্গেতো অনেক কিছু নির্ভর করে অর্থনীতি, দেশের উন্নয়ন।

“ঢাকা হচ্ছে কেন্দ্রবিন্দু, হাব অব এভ্রিথিং, এখানে স্কিলড লেবাররা কাজ করছেন, শিক্ষিত ও বিভিন্ন সেক্টরে অভিজ্ঞতাসম্পন্নরা কাজ করছে, বিভিন্ন পেশাজীবীদের বসবাস রয়েছে। অর্থনীতিতে ও দেশের জিডিপিতে যারা কন্ট্রিবিউট করছে, তারা যদি ভূমিকম্পে নিহত বা হতাহত হন তাহলে তারা তাদের পেশায় কন্ট্রিবিউট করতে পারবেন না, সে চাপতো অর্থনীতির ওপরে পড়বে। ফলে দেশতো পেছনের দিকে যাবে, সামনে যাবে না।”

রাজনৈতিক দলগুলো দেশপ্রেমের দৃষ্টিভঙ্গিতে ভূমিকম্পের ভায়াবহতা যদি বুঝে উঠতে পারে, তাহলে শুধু ইশতেহারে নয়, ক্ষমতায় গেলে ভূমিকম্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করবে বলে বিশ্বাস করেন অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার। তিনি বলেন, দেশবাসীও রাজনৈতিক দলগুলো কাছে এটা প্রত্যাশা করে।

ভূমিকম্প প্রতিরোধযোগ্য না হলেও সঠিক সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ এর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারে, সে কথা তুলে ধরে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “আসলেই যদি আমরা আমাদের দেশটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চাই তাহলে যে যে বিষয়ের বিশদ জ্ঞান রাখেন, তাদের সঙ্গে একসঙ্গে পরামর্শ করে সরকার যদি কাজ করে, তাহলে ভালো কাজ হতে পারে।”

ভুল বার্তার বিপদ

অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, ভূকম্পনবিদ্যা বা সাইসমোলজির তিনটা বড় ভাগ আছে। একটি হল আর্থকোয়েক জিওলজি। ভূমিকম্প কীভাবে হয়, ভূমিকম্পের শক্তি কী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূত্বকের মধ্যে সঞ্চিত হয়, ফল্ট কাকে বলে, ভূতাত্ত্বিক কাঠামো কোথায়–এসব বিষয়ে সাইসমোলজিস্টরা আলোচনা করেন। 

আরেকটি ভাগ হল আর্থকোয়েক ইঞ্জিনিয়ারিং। ভূপৃষ্ঠের উপরে যে ইমারতগুলা রয়েছে, ভূমিকম্প প্রতিরোধী করতে সেগুলো কোথায় কীভাবে নির্মাণ করতে হবে, শক্তিশালী ভূমিকম্প হলেও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো যাতে ১০০ বছর টিকে থাকতে সক্ষম হয়, সেরকমভাবে নকশা করার বিষয়গুলো এ বিভাগে আলোচিত হয়।  

তৃতীয়টি আর্থকোয়েক ফিজিক্স। ভূমিকম্প হলে যে তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে, শিলাস্তরে এবং ভূগঠনে তার প্রভাব কেমন হবে– এসব বিষয়ে আলোচনা করেন এ বিভাগের বিশেষজ্ঞরা। 

অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলছেন, ভূমিকম্পের বিপদ কমাতে পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই তিন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে। 

“তারা যদি এক সূতায় মিলে কাজ করেন তাহলে একটা সুন্দর আমরা দিক নির্দেশনা দিতে পারি। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমরা এই বিষয়ে একেকজন একেক রকম ভাবে কথা বলছি। যারা প্রকৌশলবিদ, যাদের স্ট্রাকচার নিয়ে কাজ করার কথা তারাও বলছেন কোথায় ফল্ট, কোথায় ভূমিকম্প কতমাত্রা, কোনটা আফটারশক কোনটা ফোরশক…। এটা হচ্ছে মিসগাইড করছে।”

এ কারণে নীতি নির্ধারকরা যাতে নীতি প্রণয়নে বসার সময় সঠিক বিশেষজ্ঞদের ডাকেন, সঠিক ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করেন, সে বিষয়ে জোর দিচ্ছেন হুমায়ুন আখতার।

ভূমিকম্প হওয়ার পর এ নিয়ে ‘যে যার মত কথা বলে’ নাগরিক ও সরকারকে বিভ্রান্ত করছে বলে মন্তব্য করেন হুমায়ুন আখতার। 

তিনি বলেন, “অন্য প্রফেশনে যারা, তারা যদি এই বিষয়ে কথা বলেন, তাহলে সে ধারণাটা হচ্ছে সারফেশিয়াল ধারণা। ভাসা ভাসা একটা জ্ঞান নিয়ে বলেন, তাতে অনেক সময় ভুল মেসেজটা জনগণের কাছে যাচ্ছে।”