আগের সরকারের প্রায় ১৩০০ প্রকল্প মূল্যায়ন করছে সরকার: অর্থমন্ত্রী
“শেষ পর্যায়ে চলে আসা কিছু প্রকল্প শেষ করা ছাড়া সরকারের সামনে উপায় নেই,” বলেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আগের সরকারের নেওয়া প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্প মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, মূল্যায়নের পর কিছু প্রকল্প বাদ দেওয়া হচ্ছে। আবার শেষ পর্যায়ে চলে আসা কিছু প্রকল্প শেষ করা ছাড়া সরকারের সামনে উপায় নেই।
রোববার জাতীয় সংসদে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।
রানু তার প্রশ্নে ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৫ বছরে দেশি-বিদেশি ঋণের অর্থে নেওয়া প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত হয়েছে কি না জানতে চান।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোর মূল্যায়ন প্রায় শেষের দিকে। কিছু মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। আবার কিছু প্রকল্পের মূল্যায়ন শুরু হয়েছে।
নতুন বিনিয়োগে সরকার চারটি বিষয় বিবেচনা করছে বলেও জানান তিনি।
এগুলো হলো অর্থের যথাযথ মূল্য পাওয়া, বিনিয়োগের বিপরীতে সুফল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত প্রভাব।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ৩.৬৬ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি
রেহানা আক্তার রানুর মূল প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নয়টি প্রকল্পে ২ হাজার ৮৪৪ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও সাতটি প্রকল্পে ৮২০ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছে।
দুই অর্থবছর মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অর্থায়ন চুক্তির পরিমাণ ৩ হাজার ৬৬৪ মিলিয়ন ডলার।
এসব প্রকল্প কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, সামাজিক সুরক্ষা, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থিক খাত সংস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ময়মনসিংহ বিভাগে পাঁচটি জলবায়ু সহনশীল সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে ২৪১ মিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তিও হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
এ ছাড়া এডিবির অর্থায়নে বিদ্যুৎ সঞ্চালন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সড়ক, রেল, পানি সরবরাহ ও নগর উন্নয়নের কয়েকটি প্রকল্প রয়েছে।
‘একযোগে সব ভর্তুকি প্রত্যাহারের নীতি নেই’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ বা অর্থায়ন নেওয়ার শর্ত নির্ধারণে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার জাতীয় স্বার্থ।
১৪ লাখ কৃষকের ১,৩৫২ কোটি টাকার ঋণ মওকুফ
চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জুলাই পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
এসব কৃষকের কাছে ব্যাংকের পাওনা ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা সরকার পরিশোধ করেছে।
মাদারীপুর-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আনিসুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, কৃষকদের সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আপাতত সরকারের নেই।
ব্যাংক আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ঋণ দেয়। সেই আমানতের বিপরীতে ব্যাংককে সুদ দিতে হয়। এ কারণে প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থায় সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া সম্ভব নয় বলে ব্যাখ্যা করেন তিনি।
তবে সহজ শর্তে ও কম সুদে কৃষি ও পল্লী ঋণ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
প্রান্তিক কৃষকদের বিনা জামানতে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
যাকাত ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ
চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের মো. রুহুল আমিন যাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা চালুর কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ১৯৮২ সাল থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় যাকাত ফান্ড বিভাগ কাজ করছে। ২০২৩ সালে যাকাত আইন হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে যাকাত ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও আলেমদের মতামতের ভিত্তিতে যাকাত বোর্ড গঠন এবং যাকাত ফান্ডের কার্যক্রম আধুনিক করার কাজ চলছে।
সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, যাকাত ব্যবস্থাকে সমন্বয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
করের ‘অডিট ভীতি’ কমাতে ব্যবস্থা
বাগেরহাট-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীমের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাগেরহাট জেলায় টিআইএনধারী করদাতার সংখ্যা ৯৬ হাজার ৫৯৪ জন।
২০২৫-২৬ করবর্ষে রিটার্ন দাখিল করেছেন ২৭ হাজার ৬০৭ জন।
করদাতার সংখ্যা বাড়াতে ব্যাংক, আরজেএসসি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ভূমি অফিস, বিআরটিএসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্য ব্যবহার করে সম্ভাব্য করদাতা শনাক্ত করা হচ্ছে।
সম্পূরক প্রশ্নে আব্দুল আলীম করদাতাদের মধ্যে অডিট নিয়ে ভীতি এবং কর কর্মকর্তাদের হয়রানির আশঙ্কার প্রসঙ্গ তোলেন।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, করের আওতায় আসা নিয়ে মানুষের মধ্যে ভীতি থাকার বিষয়টি সরকার জানে।
করনীতি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়িয়ে পুরো প্রক্রিয়া সহজ করার কাজও চলছে বলে তুলে ধরেন তিনি।
কাস্টমসে বাজেয়াপ্ত ৯৬১ গাড়ি, ৬২২টির মামলা চলছে
রাজশাহী-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমানের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, কাস্টমসের আওতায় বাজেয়াপ্ত ৯৬১টি গাড়ির মধ্যে ১০৫টি নিলামে বিক্রি করা হয়েছে।
ব্যবহারের অনুপযোগী ৭৪টি গাড়ি স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে।
আরও ৩০টি গাড়ি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরে হস্তান্তর করা হয়েছে।
১৩০টি গাড়ি নিলামের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাকি ৬২২টি গাড়ি নিয়ে আদালতে রিট মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া চলায় সেগুলো নিলাম করা যাচ্ছে না।
এ ধরনের গাড়ি ও অন্যান্য পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সম্পদের অপচয় ঠেকাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গত ১৭ আগস্ট সংশ্লিষ্ট স্থায়ী আদেশ সংশোধন করেছে।
নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট ধরনের আটক ও বাজেয়াপ্ত গাড়ি সংরক্ষিত মূল্যের অন্তত ৬০ শতাংশ দামে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির কাছে বিক্রি করা যাবে।
নিলামের পরও বিক্রি না হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে গাড়িসহ অন্যান্য পণ্য নিলাম ছাড়াই হস্তান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে।
১৪ বছরে আড়াই টনের বেশি স্বর্ণ বাজেয়াপ্ত
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মোছাম্মৎ ফরিদা ইয়াসমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চোরা কারবারিদের ২ হাজার ৫১৮ কেজি ৬৬৮ গ্রাম স্বর্ণ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
একই সময়ে ৩৭৭ কেজি ৩৪৮ গ্রাম রৌপ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
স্টার্টআপ ঋণে ৪ শতাংশ সুদ
কুমিল্লা-৬ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল করেছে।
এ তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ৩৯টি তফসিলি ব্যাংকের অংশীদারত্বে বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসি গঠন করা হয়েছে।
এই কোম্পানি থেকে স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা ইকুইটি বা মালিকানার অংশের বিনিময়ে বিনিয়োগ সহায়তাও নিতে পারবেন।
শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীদের ক্ষুদ্র উদ্যোগে ঋণ দিতে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার নতুন তহবিল গঠনের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়েছে।
এই তহবিল থেকে নতুন উদ্যোক্তারা জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন।
নারী উদ্যোক্তা তহবিল ৪ হাজার কোটি টাকা
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্মল এন্টারপ্রাইজ খাতের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।
এই তহবিল থেকে নারী উদ্যোক্তারা ৫ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন।
স্টার্টআপ তহবিল ও নতুন উদ্যোক্তা পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি থেকেও নারী উদ্যোক্তারা সুবিধা পাবেন।
নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করলে স্মল এন্টারপ্রাইজ পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় পরিশোধ করা ঋণের ওপর ১ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
পেমেন্ট গেটওয়ে ‘সবার জন্য উন্মুক্ত’
কুমিল্লা-৬ আসনের মনিরুল হক চৌধুরীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির সুবিধা পেতে সাধারণ মানুষের সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
তফসিলি ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব সুবিধা দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্র সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
পেপ্যালের পাশাপাশি স্ট্রাইপসহ অন্যান্য পেমেন্ট গেটওয়ের ব্যবহার হচ্ছে বলেও সংসদকে জানান তিনি।
তরুণরা যেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসায় সহজে অংশ নিতে পারেন, সেজন্য নিয়ম সহজ করার পাশাপাশি অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
