Published : 30 Jun 2026, 10:43 PM
বছর চারেক আগে উদ্বোধন হলেও এখনো পুরোদস্তুর কার্যক্রম নেই রাজধানীর শাহবাগে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের; চিকিৎসক ও লোকবল সংকটসহ নানা কারণে ধুঁকতে থাকা এ প্রতিষ্ঠানটিকে এখন ‘করপোরেট কোম্পানি মডেলে’ সাজানোর কথা বলছেন কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বমানের চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটি উদ্বোধন করা হয় ২০২২ সালে। নানা জটিলতার কারণে সেটি কার্যত অচল অবস্থায়ই থেকে গেছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, আগামী অগাস্টের মধ্যে হাসপাতালটিকে একটি ‘করপোরেট কোম্পানি মডেলে’ সাজানোর কাজ চলছে। এতে দেশের সরকারি মেডিকেলের তুলনায় বেশি খরচ হলেও বেসরকারি অন্য হাসপাতালের তুলনায় ‘স্বল্প খরচে’ কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপনসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা মিলবে।
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “এটি একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হবে, যার মধ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ শতাংশ এবং সরকারের ১০ শতাংশ শেয়ার থাকবে। এখানে লাভ আবার হাসপাতালেই বিনিয়োগ করা হবে।”
কাঠামো আছে, জনবল নেই
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী পদ রয়েছে ২ হাজার ৭৫৮টি। এর মধ্যে বর্তমানে ২০ জন ডাক্তারসহ পৌনে ২০০ কর্মকর্তা, কর্মচারী ও স্টাফ রয়েছেন। ফলে হাসপাতাল পরিচালনার অবকাঠামো থাকলেও জনবলসহ নানা সংকটে বিভিন্ন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ।
হাসপাতালটির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, উদ্বোধনের সময় থেকে ২০ জন ডাক্তার সেখানে দায়িত্ব পেয়েছেন, এর মধ্যে সবাই যোগদান করেননি। তবে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা আউটডোর সেবা দিচ্ছেন।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, কার্ডিওভাসকুলার অ্যান্ড স্ট্রোক সেন্টার, হেপাটোবিলিয়ারি অ্যান্ড প্যানক্রিয়েটিক ডিজিস, মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা, নিউরো, জেনারেল সার্জারিসহ ১৪ ধরনের আউটডোর চিকিৎসা চলমান রয়েছে।

লিভারের সমস্যায় মঙ্গলবার চিকিৎসক দেখাতে চাঁদপুর থেকে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে এসেছিলেন জসিম উদ্দিন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “লিভারের ডাক্তার দেখাতে এর আগেও দুবার এসেছি। এখানে ৫০০ টাকা দিয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ পাওয়া যায়।
“ডাক্তারের পরামর্শে ভালো আছি, তাই এখানে ফলোআপ করতে আসছি।”
নাম প্রকাশ না করে হাসপাতালের এক কমকর্তা বলেন, “বর্তমানে আউটডোরে অনেক রোগী আসেন। তবে সবাই ডাক্তার দেখাতে পারেন না। ডাক্তার অল্প থাকায় এত বেশি রোগীকে সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। তবে বেসরকারি হাসপাতালের অর্ধেক ফি দিয়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারছে সাধারণ মানুষ।”
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সি বলেন, ‘‘আমাদের এখানে বিশ্বমানের সব সেবা অর্ধেক টাকায় মানুষরা পাবেন। বর্তমানে কিডনি ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট হচ্ছে, যার মধ্যে বিশ্বের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট খরচ প্রায় ১ কোটি টাকা। কিন্তু এখানে ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা দিয়ে এই সেবা পাওয়া যাবে।
“বর্তমানে এসব জটিল রোগের সেবা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, দ্রুতই সবগুলো সেবা মানুষ পাওয়া শুরু করবে।”
আইসিইউ ১০০, সচল ১৮টি
বিশেষায়িত এ হাসপাতালে ১০০টি আইসিইউ থাকলেও জনবল সংকটে মাত্র ১৮টি সচল রয়েছে। ২৫টি ডায়ালাইসিস মেশিন থাকলেও অর্ধেক সেবা দিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।
পরিচালক অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সি বলেন, হাসপাতাল তড়িঘড়ি করে উদ্বোধনের পর বিভিন্ন কারণে জনবল নিয়োগ হয়নি। ফলে হাসপাতালের কাঠামো এবং যন্ত্রপাতি থাকলেও সব সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জনবল নিয়োগের পর সব সেবা মানুষরা পেতে শুরু করবে।
২ বছরের মধ্যে পুরোপুরি চালুর পরিকল্পনা
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালকে ‘করপোরেট কোম্পানি মডেলে’ গড়ে তুলতে গত ৪ জুন বিএমইউ আইন সংশোধনের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সি বলেন, “উদ্বোধনের পর দুর্নীতি, স্ক্যাম, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ নানা কারণে জনবল নিয়োগ হয়নি। চব্বিশের আন্দোলন পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে হাসপাতালের কার্যক্রম চালুর চিন্তা করা হয়। সবশেষ বিএনপি সরকার গঠনের পর কোন প্রক্রিয়ায় হাসপাতাল চলবে, তার জন্য তিন মাসে সময় দেয়। এটি আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল।”
“কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোতে কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠান করার আইন ছিল না। সিন্ডিকেট সভায় আইন সংশোধন করে নতুন করপোরেট মডেল করা হয়েছে। যখন এই কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হবে, সেটির একটি নিয়মে থাকবে এর লভ্যাংশ হাসপাতালেই বিনিয়োগ করা হবে।”

পরিচালক বলেন, “আমরা একটি করপোরেট মডেলে যেতে চাই, যার একজন সিইও থাকবেন। আগামী অগাস্ট মাসের মধ্যে হাসপাতালের পরিচালনা পরিষদ গঠন হবে।
“সেখানে একজন অতিরিক্ত সচিবসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ থাকবে। এরপর বিভিন্ন বিভাগের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ করব। এর পর থেকে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রম চালু হবে।”
নতুন মডেলে চিকিৎসা খরচ নিয়ে তিনি বলেন, “এখানে দেশের প্রাইভেট হাসপাতালের তুলনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্ধেক, আবার কিছু ক্ষেত্রে অর্ধেকের কম খরচে সেবা পাবে মানুষ। এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে দেশের নামকরা বেসরকারি হাসপাতাল এক ধরনের ধাক্কা খাবে। কারণ একই ধরনের সেবা অনেক কম খরচে এখানে পাওয়া যাবে।”
হাসপাতাল পরিচালনা নিয়ে তিনি বলেন, “এটা যেহেতু করপোরেট মডেলে চলবে, তাই একবারে সব সেবা চালু করা সম্ভব নয়। সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ খরচ হবে, সেটি মানুষের থেকে আসবে।
“আমরা বিশেষায়িত বিভিন্ন সেবা আস্তে আস্তে চালু করব। যেমন- লিভার ও কিডনি প্রতিস্থাপন আমাদের এখানে হয়, কিন্তু সেটি অল্প পরিসরে। কারণ জনবল কম।”
সাইফ উল্লাহ বলেন, “এখানে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ করা হবে, যাদের একটি অপারেশন বা নির্দিষ্ট সময়ের হিসেবে টাকা দেওয়া হবে।
“দুই বছর পর তাদের কাজ পর্যালোচনা করা হবে। কারণ একটি লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য ডাক্তারকে যে পরিমাণ ফি দিতে হয়, সেটির জন্য সবসময় ডাক্তার রাখা সম্ভব নয়। তাই সেবার ভিত্তিকে তাদের ফি প্রদান করা হবে।”
পূর্ণাঙ্গরূপে সব সেবা চালু হতে কতদিন লাগতে পারে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এই বছরের শেষ থেকেই বিশেষায়িত সব সেবা চালু শুরু করব। তারপর আস্তে আস্তে সব সেবাই চালু হবে।
“জনবল নিয়োগসহ পুরো মাত্রায় হাসপাতাল চালু হতে দুই বছরের মত সময় লাগবে।”