Published : 04 Aug 2026, 07:48 PM
ঢাকার সবুজবাগে বিএনপি কর্মী ইব্রাহীম পলাশকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ দাবি করেছে, তারা ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে।
গ্রেপ্তারদের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে পুলিশ বলছে, ঘটনাটি ছিল ‘তুচ্ছ ঘটনার জের’।
গেল ২১ জুলাই সন্ধ্যায় বাগপাড়া পানির পাম্প সংলগ্ন সোহাগের চায়ের দোকানের সামনে ধারালো অস্ত্র নিয়ে সবুজের উপর হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা এলোপাথারি কুপিয়ে পলাশের দুই হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
রক্তাক্ত অবস্থায় পলাশকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা প্রথমে মুগদা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাত ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পরদিনই নাঈম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার সপ্তাহখানেকের মাথায় ২৭ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয় মো. আলী নামে আরেকজনকে।
এরমধ্যে ‘ধারাবাহিক অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতার মুখে’ ২৬ জুলাই ‘হোতা’ মোস্তফা হোসেন রয়েল ও তার সহযোগী সবুজ আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, “আসামিদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটিত হয় এবং চারজনই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।”
যে কারণে হত্যা
ঘটনার কয়েকদিন আগে সবুজের ভাগ্নে তানভীর স্থানীয় একটি রিকশা গ্যারেজে প্রসাব করলে গ্যারেজের ম্যানেজার তাকে মারধর করে। এর জেরে সবুজও গ্যারেজের ম্যানেজারকে মারধর করে।
গ্যারেজ মালিক রসুল বিষয়টি নিয়ে ইব্রাহীম পলাশের কাছে বিচার চাইলে পলাশ লোকজন নিয়ে সবুজকে ধাওয়া দেয়। হামলা থেকে রক্ষা পেতে সবুজ আশ্রয় নেয় মোস্তফা হোসেন রয়েলের বাসায়; একপর্যায়ে বাড়ির পেছন হয়ে দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়।
পুলিশ বলছে, এ সময় পলাশের সঙ্গে রয়েলের বাকবিতণ্ডা হয়। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে রয়েল ও তার বাবা-মায়ের ওপর হামলা চালায় পলাশ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় রয়েল।
গ্রেপ্তারদের জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই ঘটনার জেরে প্রতিশোধ নিতে রয়েল তার সহযোগীদের নিয়ে ইব্রাহীম পলাশের ‘দুই হাত বিচ্ছিন্ন করার’ পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১ জুলাই সন্ধ্যায় রয়েল ও তার সহযোগীরা দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে বাগপাড়া পানির পাম্প সংলগ্ন সোহাগের চায়ের দোকানের সামনে থাকা ইব্রাহীম পলাশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
পুলিশ বলছে, হামলার সময় রয়েল তার হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে সবার আগে পলাশকে কোপ দেয়। আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে পলাশ ডান হাত দিয়ে কোপ ঠেকানোর চেষ্টা করলে তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এরপর পলাশ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে রয়েলসহ তার সহযোগীরা তাকে ধাওয়া করে। কিছুদূর যাওয়ার পর পলাশ রাস্তায় পড়ে গেলে রয়েল ও তার সহযোগীরা দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে এবং পলাশের দুই হাত দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
হামলা শেষে তারা বিচ্ছিন্ন হাত দুটি নিয়ে ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন গুরুতর আহত অবস্থায় ইব্রাহীম পলাশকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর সবুজবাগ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের অবস্থান বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করে পুলিশ।
এরপর অভিযানে নাঈম ও আলীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং রয়েল ও সবুজ আদালতে আত্মসমর্পণ করে।
গ্রেপ্তারদের দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি দেশীয় ধারালো অস্ত্র (ছ্যানা) উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে পলাশের ডান হাতের বিচ্ছিন্ন বৃদ্ধাঙ্গুলি এবং আসামিদের দেখানো মতে হাতের অবশিষ্ট অংশ উদ্ধার করা হয়।
উপকমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, “তদন্তে পুরো ঘটনাপ্রবাহ উন্মোচিত হয়েছে এবং হামলায় অংশগ্রহণকারী সকল সহযোগীকেও ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। হামলার আগে আলোচনা এবং হামলার সময় রয়েল ও সবুজ অন্যরাসহ একসাথেই ছিল।”
ঘটনায় জড়িত অন্যান্য পলাতকদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।