১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপদেষ্টারা থাকতে পারেন?

সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরাই মন্ত্রিসভার কেন্দ্রবিন্দু এবং তারাই সংসদের কাছে সম্মিলিতভাবে দায়বদ্ধ।

মাছুম কামাল মাছুম কামাল

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 20 Feb 2026, 09:18 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:59 PM

বিএনপি নতুন সরকার গঠনের পর প্রথম যে মন্ত্রিসভা বৈঠক করেছে তাতে উপদেষ্টাদের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

যেহেতু উপদেষ্টারা গোপনীয়তার শপথ নেন না, তাই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে তারা থাকতে পারেন কিনা, সেই প্রশ্ন ওঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বিষয়টি প্রথা ও প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তনির্ভর।

শপথ নেওয়ার পরদিন বুধবার বেলা ৩টায় সচিবালয়ের এক নম্বর ভবনে নতুন মন্ত্রিসভার বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

যদিও বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, বৈঠকটি মন্ত্রিসভা বৈঠক ছিল না।

তিনি বলেন, “আপনারা জানেন আজকে এটা আসলে ক্যাবিনেট মিটিং ছিল না। এটা একটা সৌজন্যমূলক মিটিং ছিল যেখানে মন্ত্রীরা ছিলেন এবং আমরা উপদেষ্টারা ছিলাম। আমরা উপদেষ্টারা ক্যাবিনেটের পার্ট না, তারপরও এ কারণে এটা ফরমাল মিটিং না। 

“তারপরও উনি যেটা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে মানে বেসিক কয়েকটা কথা মূলত ক্যাবিনেটকে বলেছেন—সেটা হচ্ছে তারা যেন এই সরকারের কাছে জনগণ যে প্রত্যাশা করে, একটা ট্রান্সপারেন্ট এবং একটা এফেক্টিভ সরকার, সেটা নিয়ে তিনি খুব সিরিয়াসলি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।”

জাহেদ উর রহমান বলেন, এর বাইরে খুব ইমিডিয়েটলি যে রমজান আসছে সামনে, রমজানে যেসব চ্যালেঞ্জগুলো আসতে পারে—দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ, বাড়ি ফিরে যাওয়া—এসব নিয়ে যেসব সংকট সাধারণত তৈরি হয় সেগুলো যেন ঠিকঠাকমতো ফেইস করা যায় সেগুলো।

“আর একটা কথা হয়েছে যে আমরা শর্ট টার্মে, মানে ১৮০ দিনের জন্য বিএনপির একটা প্ল্যান আছে। সেটা তারা আগেই তৈরি করা ছিল, সেটা আর একটু রিফাইন করে জনগণের সামনে খুব দ্রুতই প্রেজেন্ট করা হবে, যাতে জনগণ বোঝে ইমিডিয়েটলি সরকার কী করতে যাচ্ছে।”

মন্ত্রিসভা নিয়ে সংবিধান কী বলছে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাঁহার কর্তৃত্বে এই সংবিধান-অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে।”

৫৫(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন।”

অর্থাৎ সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরাই মন্ত্রিসভার কেন্দ্রবিন্দু এবং তারাই সংসদের কাছে সম্মিলিতভাবে দায়বদ্ধ।

কার্যবিধিমালায় কী আছে?

সংবিধানের ভিত্তিতে প্রণীত সরকারের রুলস অব বিজনেস (কার্যবিধিমালা), ১৯৯৬–এ মন্ত্রিসভা বৈঠকের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে,

মন্ত্রিপরিষদের সদস্য অর্থাৎ মন্ত্রীরাই বৈঠকের নিয়মিত অংশগ্রহণকারী।

কোনো মন্ত্রী অনুপস্থিত থাকলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতিতে প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী আলোচনায় অংশ নিতে পারেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বৈঠকে উপস্থিত থাকেন এবং সিদ্ধান্তের কার্যবিবরণী প্রস্তুত ও সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন।

কার্যবিধিতে বলা হয়েছে:

“Secretary of the Ministry/Division concerned may, if required by the Minister-in-charge, attend Cabinet meetings during discussions of the subject.”

এছাড়া,

“Other officers may attend the meeting only in special cases, if so allowed by the Prime Minister.”

অর্থাৎ সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতি বিষয়ভিত্তিক এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমতিনির্ভর।

উপদেষ্টাদের উপস্থিতির বিষয়ে কি বলা হয়েছে?

কার্যবিধিমালার বিধি ৩ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিতে পারেন।

বিধি ২১(৪বি)–তে বলা হয়েছে:

“The Prime Minister may direct any Adviser or Special Assistant appointed under rule 3 to attend any or all meetings of the Cabinet or any Committee thereof.”

অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী চাইলে উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারীকে মন্ত্রিসভা বা মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিতে পারেন।

এজেন্ডা ও সিদ্ধান্ত কীভাবে?

কেবিনেট বৈঠকের এজেন্ডা প্রস্তুত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কোনো মন্ত্রণালয় নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রস্তাব পাঠালে তা যাচাই-বাছাই শেষে বৈঠকের সূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কার্যবিধি অনুযায়ী কেবিনেটে উত্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সম্পন্ন করতে হয়। আর্থিক প্রভাব থাকলে অর্থ বিভাগ বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত সাধারণত ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত হয়। কার্যবিবরণী অনুমোদনের পর তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বাস্তবায়নের জন্য পাঠানো হয়।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর উপস্থিত থাকার বিষয়ে কোনো আইনি বাধা আছে কিনা জানতে চাইলে সাবেক এক মন্ত্রিপরিষদ সচিব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কেবিনেট বৈঠকের নিয়মিত সদস্য হচ্ছেন পূর্ণমন্ত্রীরা, যাদের কার্যত “ক্যাবিনেট মিনিস্টার” বলা হয়।

তিনি বলেন, “ক্যাবিনেট মিনিস্টার মানে পূর্ণমন্ত্রী, তারাই কেবিনেটের সদস্য।”

তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অন্যদের উপস্থিত থাকার সুযোগ রয়েছে, বলেন সাবেক এই সচিব।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী যদি ইচ্ছা করেন, উপদেষ্টা থাকতে পারেন, নির্দিষ্ট প্রতিমন্ত্রী থাকতে পারেন। এটা ওনার বিবেচনা।”

সাবেক এই মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, “যে প্রতিমন্ত্রীরা কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকেন, তাদের উপস্থিতি অনেক সময় দেখা যায়। তবে এটি নিয়মে স্বয়ংক্রিয় সদস্যপদ হিসেবে উল্লেখ নেই; বরং প্রথাগত চর্চার অংশ।”

সচিব পর্যায়ের উপস্থিতি বিষয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব বৈঠকে থাকেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিবও থাকেন। আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সচিবরা বিষয়ভিত্তিকভাবে অংশ নেন।

সাবেক এই সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব সাধারণত বৈঠকে থাকেন, কারণ যে কোনো বিষয়ে আর্থিক বা আইনি দিক থাকতে পারে।

আন্তর্জাতিক চর্চার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্যে নতুন কেবিনেট গঠনের পর নোটিফিকেশনের মাধ্যমে কারা বৈঠকে থাকবেন তা নির্ধারণ করা হয়। ভারতে পূর্ণমন্ত্রীরা কেবিনেটের সদস্য, আর যেসব প্রতিমন্ত্রী স্বতন্ত্র দায়িত্বে থাকেন তারা বিষয়ভিত্তিকভাবে কেবিনেট বৈঠকে অংশ নিতে পারেন।”

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমাদের দেশে বিষয়টা প্রথা ও প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তনির্ভর। সংবিধান ও কার্যবিধিতে নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করা নেই।”

সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “না, এগুলা লিখিত তো কিছু নাই। এগুলো হলো ট্র্যাডিশনাল।”

তিনি বলেন, “ট্র্যাডিশনালি ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা থাকতেন না মন্ত্রিসভার বৈঠকে। কিন্তু, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালে উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী সবাইকেই থাকার ব্যবস্থা করেছে। তো সেই ধারাবাহিকতা থেকেছে। এটা ২০০৯ সাল থেকেই শুরু হয়েছে; আগে ছিল না।”