Published : 11 Aug 2026, 12:16 AM
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি এলাকার যুবক মোহাম্মদ রাশেদ সোমবার স্ত্রীকে নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখে বললেন, “মনে হল ওই সময়ে ফেরত গেলাম ক্ষণিকের জন্য।”
২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ের নানা ঘটনার স্মারক ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন রাশেদ। তার মত আরো অনেকেই এদিন এসেছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর দেখতে।
সেখানে শিহাবুল ইসলাম নামে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বললেন, “আমি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। এখানে পুরো জুলাই আন্দোলন যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সেটা সত্যিই অসাধারণ।”
জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ করায় সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ঢাকার মোহাম্মদপুরের এ তরুণ বললেন, “আমার মনে হয়, এই জাদুঘর যে একবার ঘুরে আসবে, সে সত্যিকার অর্থেই মানুষের ত্যাগ সম্পর্কে বুঝতে পারবে।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে শুধু জুলাইয়ের স্মৃতি নয়, ২০০৮ সাল থেকে আওয়ামী লীগ শাসনের সময়ে গুম, খুন আর নানা ঘটনার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানাভাবে। ভুক্তভোগীদের নানা স্মৃতিও সংরক্ষণ করা হয়েছে সেখানে।
এর মধ্যে ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভাস্কর্য, ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনে দমন-পীড়ন নিয়ে ভাস্কর্য রয়েছে। জুলাইয়ে সাভারে নিহত ইয়ামীনের লাশ এপিসিতে করে ঘোরানোর সেই আলোকচিত্রের আদলে গড়া ভাস্কর্য, স্ট্যাম্প কাঁধে আন্দোলনে বের হওয়া কিশোরীর ভাস্কর্য, জুলাইয়ে নারীদের অবদান নিয়ে ফোয়ারাবেষ্টিত ভাস্কর্য, লাশ নিয়ে আন্দোলনকারীদের মিছিলের আলোকচিত্রের আদলে গড়া ভাস্কর্যও রয়েছে।
এ ছাড়া গণভবনের লেকের পাড়ে গুমের পর বুকে ইট বেঁধে ফেলে দেওয়ার প্রতীকী ভাস্কর্যও স্থাপন করা হয়েছে।
ভাস্কর্য ছাড়াও ব্যানার, ফেস্টুন ও ডিসপ্লেতে নানা ঘটনাপ্রবাহের বয়ান, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের কথাও বাজানো হচ্ছে।
জাদুঘরে রয়েছে ডিজিএফআইয়ের টর্চার সেল বহুল আলোচিত ‘আয়নাঘর’ এর রেপ্লিকা, ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, র্যাবের টিএফআই সেলের আদলে রেপ্লিকার প্রতীকী গণকবর।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টে উদ্ধার হওয়া বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি, শেখ হাসিনার বাজারের ফর্দ, ব্যবহৃত আসবাব, লাল টেলিফোনে তার সংরক্ষিত ফোনালাপ, কিছু ফোনালাপের লিখিত দলিল, সেইসঙ্গে অনেক আলোকচিত্রও রয়েছে।
এর বাইরে ‘মুনসুন থিয়েটার’ নামে একটা থিয়েটারও স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে শেখ হাসিনার আমলে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, আর জুলাই আন্দোলনের প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হচ্ছে। বিশ্রামের জন্য রয়েছে আলাদা কর্নার।
সোমবার চার বছরের সন্তানকে নিয়ে জাদুঘর দেখতে এসে মিরপুরেরর বাসিন্দা আব্দুল আলীম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই জাদুঘর শুধু জুলাই না, বরং আওয়ামী দুঃশাসন আর ফ্যাসিবাদের এক জাজ্বল্যমান স্মারক। বাচ্চাটাকে তাই দেখাতে নিয়ে এলাম।”
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়, একপর্যায়ে তা রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে। ছাত্রজনতার সেই রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ শাসন করা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
৩৬ দিনের টানা আন্দোলনে ওই বছরের ৫ অগাস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালাতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। সেদিন হাসিনার সরকারি বাসভবন—গণভবনে তাণ্ডব চালায় আন্দোলনকারীরা।
এরপর ৮ অগাস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। পরে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবনটিকে জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নানা জটিলতা পেরিয়ে চলতি বছরের ৫ অগাস্ট উদ্বোধন করা হয় এ জাদুঘরের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘর উদ্বোধন করেন।
জুলাই আন্দোলনের পর জাদুঘর তৈরির পরিকল্পনা আর প্রেক্ষাপট নিয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে ফোন করলে তিনি অসুস্থ বলে জানান।
তবে তিন দিন আগে গত ৭ অগাস্ট ফেইসবুক পোস্টে ফারুকী লেখেন, “গভীর সমুদ্রে মাঝির অবস্থা যেমন হয়, আমার অবস্থাও হয়েছিল তেমন। মানে যখন জুলাই জাদুঘরের ভার আমার কাঁধে তুলে দেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস।”
তিনি বলেন, “এই জাদুঘর কি যে কোনো একটা জায়গা থেকে শুরু করা যাবে? নাকি সিনেমার মতই এর একটা শুরু থাকবে এবং তারপর ধাপে ধাপে সমাপ্তিতে পৌঁছাবে?
“এরকম হাজারটা প্রশ্ন তুলতে তুলতে এবং সমাধান করতে করতে আজকে জুলাই জাদুঘর একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে “
যেভাবে প্রবেশ করবেন
গত ৬ অগাস্ট থেকেই দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘর উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ভেতরে প্রবেশ করতে হবে টিকেট নিয়ে। অনলাইনে বুকিংয়ের পাশাপাশি জাদুঘরের কাউন্টার থেকেও কেনা যাবে টিকেট।
মূল ভবনে প্রবেশে সকালের সময় (মর্নিং স্লট) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা। দুপুরের সময় (মিড-ডে স্লট) দেড়টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা। বিকালের সময় (ইভনিং স্লট) ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা।
টিকেটে যে সময় থাকবে সে সময়ের মধ্যেই কেবল জাদুঘরের মূল ভবনে প্রবেশ করতে হবে। https://july36.gov.bd/ থেকে অগ্রিম টিকেট কেনা যাবে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য টিকেটের মূল্য ৫০ টাকা। তিন থেকে ১৩ বছরের শিশুদের জন্য ২০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ৫০০ টাকা এবং বিদেশি নাগরিকদের জন্য টিকেটের মূল্য ২ হাজার টাকা।