Published : 15 May 2026, 12:05 PM
আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের বাইরে রেখে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির যে নির্বাচন হল, তাতে নিরঙ্কুশ জয় পেলেন বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা।
সমিতির ২০২৬-২০২৭ সেশনের এই নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্যের নীল প্যানেল ১৪টি পদের মধ্যে সভাপতি ও সম্পাদকসহ ১৩টিতে জয় পেয়েছে।
আর জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত সবুজ প্যানেল থেকে কেবল একজন সদস্য পদে বিজয়ী হয়েছেন।
সভাপতি পদে বিজয়ী হয়েছেন এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তার সঙ্গে সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন একই প্যানেলের মোহাম্মদ আলী।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন নির্বাচন সাব-কমিটির আহ্বায়ক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল থেকে দুই সহ-সভাপতি পদে মো. মাগফুর রহমান শেখ ও মো. শাহজাহান বিজয়ী হয়েছেন। কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হয়েছেন মো. জিয়াউর রহমান। আর দুটি সহ-সম্পাদক পদে মাকসুদ উল্লাহ ও মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম মুকুল বিজয়ী হয়েছেন।
সাতটি সদস্য পদের মধ্যে নীল প্যানেলের ছয়জন জয়ী হয়েছেন। তারা হলেন–এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী, এ কে এম আজাদ হোসেন, মো. কবির হোসেন, মো. টিপু সুলতান, মো. জিয়া উদ্দিন মিয়া ও ওয়াহিদ আফরোজ চৌধুরী।
সদস্য পদের বাকি একটিতে জয়ী হয়েছেন জামায়াত সমর্থিত সবুজ প্যানেলের প্রার্থী মো. আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী।
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার আইনজীবী সমিতির অডিটোরিয়ামে এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে।
১১ হাজার ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে দুই দিনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন ৪ হাজার ৪৮ জন, যা মোট ভোটারের ৩৬.৪৮ শতাংশ। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার ভোটার উপস্থিতির হার কম ছিল।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০-২০২১ মেয়াদে ৭ হাজার ৭৮১ ভোটারের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৯৪০টি ভোট পড়েছিল। তবে ২০২৩-২০২৪ মেয়াদে ভোটার সংখ্যা ৮ হাজার ৬০২ জন হলেও ভোট পড়ে মাত্র ৪ হাজার ১৩৭টি। এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়ে গেলেও ভোট পড়েছে অর্ধেকেরও কম।
ভোটের হার কম হওয়ার বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “আগে এই সিস্টেম ছিল না, এখন তো অন্য সিস্টেম হইছে। আগে হালকা ওয়াজ ছিল, আনন্দ ফুর্তি ছিল... কিন্তু এই মারামারি, হাউকাউ ছিল না।”
বিগত কয়েক বছরের নির্বাচনের বিশৃঙ্খল পরিবেশের সমালোচনা করলেও এবার তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এবারের নির্বাচনের আগে ৪০ জনের বেশি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ওই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
বাতিল হওয়া প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, কোনো প্রকার কারণ দর্শানোর নোটিস বা উন্মুক্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই 'উপর মহলের নির্দেশে' তাদের প্রার্থিতা ‘বেআইনিভাবে’ বাতিল করা হয়েছে। তারা একে ‘পেশাজীবী সংগঠনের গঠনতন্ত্র পরিপন্থি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে নির্বাচন সাব-কমিটির আহ্বায়ক বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী তখন বলেছিলেন, “স্ক্রুটিনির (যাচাই-বাছাই) দায়িত্বটা হচ্ছে বর্তমান সেক্রেটারির। এটা আমাদের সুপ্রিম কোর্ট বারের সংবিধান অনুযায়ী সেক্রেটারির দায়িত্ব... কারে কারে তারা বাদ দিছে, কাদের বাদ দেয়নি এটা আমি জানিও না, জানতে চাইও না।”
বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের দাবি, জুলাই যোদ্ধা ও সাধারণ আইনজীবীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিশেষ সাধারণ সভার (ইজিএম) মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
এবারের নির্বাচন ঘিরে দুই দফায় তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল। শুরুতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সমিতির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান মিলনের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ১১ ও ১২ মার্চ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সেই তফসিল অনুযায়ী ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া এবং ১ মার্চ যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলে।
তবে ১ মার্চ এক বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ১৩ ও ১৪ মে নির্বাচনের নতুন তারিখ চূড়ান্ত করা হয়। এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের সভাপতিত্বে ওই সভায় দুই দিনব্যাপী এই নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্ট বারের এর আগের নির্বাচন হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের মার্চে। ওই নির্বাচনে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা সভাপতি পদসহ মাত্র চারটি পদে জয়ী হয়েছিলেন। অন্যদিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীরা সম্পাদক পদসহ ১০টি পদে জয়ী হন।
সেবার নির্বাচনে সভাপতি হয়েছিলেন বিএনপি সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী মাহবুব উদ্দিন খোকন। আর সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেলের শাহ মঞ্জুরুল হক।