Published : 22 Jul 2026, 08:00 PM
মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণসংক্রান্ত মামলায় সরকারের করা লিভ টু আপিলে বাদী হিসেবে রয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নাম। তবে সলিসিটর অনুবিভাগে পাঠানো পৃথক চিঠিতে দুই সরকারি সংস্থা জানিয়েছে, তারা এ আপিল দায়ের করেনি এবং বাদীর তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দিতে হবে।
পুরনো ওই মামলার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় স্থানীয় মসজিদ ও মাজারে নারীদের জন্য একটি বিশ্রামাগার ও অজুখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার পর।
রিটকারীপক্ষের আইনজীবী বলছেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দায়িত্ব নেওয়ার পর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে এর অনুমোদন চান। প্রথমে প্রস্তাবটি অনুমোদন না পেলেও পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় এবং মহাস্থানগড়ে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
গত ১৭ জুন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয় জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে কাজ বন্ধ করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়। এর পর নির্মাণকাজ আটকে যায়।
আর এই কাজ বন্ধ হওয়ার কিছুদিন পরই গত ২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টে ১৪ বছর আগের রায় হওয়া মামলায় তড়িঘড়ি লিভ টু আপিল করা হয়।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, বগুড়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি), বগুড়ার পুলিশ সুপার (এসপি), মহাস্থানগড়ের কাস্টোডিয়ান এবং শিবগঞ্জ থানার ওসিকে সেখানে আবেদনকারী হিসেবে দেখানো হয়।
আপিলে বাদী করা হলেও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে সলিসিটর অনুবিভাগে চিঠি দেয়।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাবিনা আলম স্বাক্ষরিত ১৮ জুলাইয়ের চিঠিতে বলা হয়, মহাস্থানগড় একটি সংরক্ষিত প্রত্নস্থল। লিভ টু আপিলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে বাদী করা হলেও তিনি এ বিষয়ে অবগত নন।
এ অবস্থায় বাদীর তালিকা থেকে তার নাম প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে চিঠিতে।
একইভাবে ২০ জুলাই সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদ ও আইন শাখা থেকে সলিসিটর অনুবিভাগে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, লিভ টু আপিলে সংস্কৃতি সচিবকে বাদী করা হলেও মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ে কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং সচিব আপিলটি দায়ের করেননি।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর উইংয়ের সলিসিটর সানা মো. মাহ্রুফ হোসাইন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "অনেক সময় দেখা যায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে জানানোর মত সময় থাকে না। রাষ্ট্র বা অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস যদি মনে করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এটা মূলত রাষ্ট্রের স্বার্থেই করা হয়।"
ওকালতনামার প্রক্রিয়াও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের নোট অনুযায়ী সম্পন্ন হয় জানিয়ে তিনি বলেন, "নাম প্রত্যাহারের আবেদনটি মামলার নথির সঙ্গে যুক্ত হবে। শেষ পর্যন্ত কাকে পক্ষ রাখা হবে, সে সিদ্ধান্ত আদালতই নেবেন।"
তবে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হকের কথায় মেলে ভিন্ন সুর। তিনি শুরুতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার বা নাম প্রত্যাহারের বিষয়টি মন্ত্রণালয় বা সলিসিটর অফিস থেকে আমাদের কাছে না এলে আমরা নিজেরা কিছু বলতে পারি না। অ্যাটর্নি জেনারেল দেশের বাইরে আছেন, তিনি এলেই বিস্তারিত বলতে পারবেন।"
তবে পরে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে জানা যায়, মহাস্থানগড়ের প্রত্নস্থানে মসজিদ ও শৌচাগার নির্মাণসংক্রান্ত ২০১০ সালের ৯৫৯২ নম্বর রিট আবেদনের আইনি বিষয়টি সলিসিটর কার্যালয় নয়, বরং সরাসরি অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকেই পরিচালিত হচ্ছে।
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক ও সংশ্লিষ্ট সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমেই গত ২ জুলাই আপিল বিভাগে সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং ২২৩৪/২০২৬ দায়ের করা হয়েছে।
মঙ্গলবার আপিল বিভাগে মামলাটির শুনানির দিন ধার্য থাকলেও তা হয়নি।
মামলার নথিতে দেখা যায়, ২০১০ সালের ডিসেম্বরে মহাস্থানগড়ে অবৈধ খনন ও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ সামনে এলে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী ও সরওয়ার আহাদ চৌধুরী জনস্বার্থে রিট আবেদন করেন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি হাই কোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে 'কন্টিনিউয়িং ম্যান্ডামাস' জারি করেন। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ রোধ করতে মামলাটি চলমান হিসেবে বিবেচিত হবে।
রায়ে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা সংরক্ষণে মুনতাসীর মামুন কমিটির সুপারিশ অনুসরণ করে মূল সাইট থেকে প্রায় ২০০ ফুট দূরে রাস্তার পূর্ব পাশে জমি অধিগ্রহণ করে নতুন মসজিদ নির্মাণ এবং মহাসড়কের ওপর একটি ওভারব্রিজ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরে ২০২০ সালে একই রিট মামলার ধারাবাহিকতায় করা সম্পূরক আবেদনের শুনানি নিয়ে হাই কোর্ট সংরক্ষিত এলাকায় খনন ও স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
ওই বছর মো. মোশাররফ হোসেন নামে এক ব্যক্তি মহাস্থানগড়ের ভেতরে ব্যক্তিগত জমিতে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি চেয়ে আরেকটি রিট আবেদন করেন। হাই কোর্ট ২০১২ সালের রায়ের কথা তুলে ধরে আবেদনটি খারিজ করে দেয়।
সরকারের এবারের লিভ টু আপিলে ২০১২ সালের ওই চূড়ান্ত রায় এবং ২০২০ সালের সম্পূরক আদেশ সংশোধন (মডিফাই) ও স্থগিত চাওয়া হয়েছে।
আপিলে বলা হয়েছে, শাহ সুলতান বলখী মাহীসাওয়ার (রহ.) মাজার ও মসজিদে প্রতি সপ্তাহে জুমার নামাজ ও ওরস উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী আসেন। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত শৌচাগার, অজুখানা, বিশ্রামাগারসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
তাই প্রত্নস্থলের মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখেই প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজের সুযোগ দিতে আগের রায় সংশোধন করার আবেদন জানানো হয়েছে আপিলে।
এদিকে রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ অভিযোগ করছেন, ১৪ বছর ধরে বহাল থাকা রায়ের বিরুদ্ধে হঠাৎ লিভ টু আপিল দায়েরের পেছনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, "এলজিইডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাহেব, উনার নির্দেশনায় (নির্মাণ) কাজগুলো হচ্ছিল। ডিসি যখন কাজটা বন্ধ করে দিয়েছেন, এই কাজটা যাতে আবার পুনরায় করা যায়, সেই প্রচেষ্টা তো অন্য কারো করার কথা না।
“মিডিয়ার বিভিন্ন তথ্য বা বিভিন্ন আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমার কাছে এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, এই আপিলের পিছনে নিশ্চয় তার নির্দেশনা আছে।"
এ বিষয়ে কথা বলতে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি। সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন লিখে এসএমএস করা হলেও সাড়া দেননি।
এ মামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মনজিল মোরসেদ বলেন, "মহাস্থানগড় আমাদের প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা। এই ঐতিহ্য রক্ষায় ২০১০ সাল থেকে আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে আসছি এবং এ পর্যন্ত চারবার আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। শুধু রেজিম পরিবর্তন হয়েছে, মানসিকতা আগের মতই আছে।"
মনজিল মোরসেদ দাবি করেন, আপিলে বাদী হিসেবে যাদের নাম দেখানো হয়েছে, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করেছিলেন।
“তারা বলেছেন, এ বিষয়ে তারা কিছুই জানতেন না এবং তাদের সম্মতিও নেওয়া হয়নি।”
১৪ বছর পর আপিলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “যেখানে সরকারি কর্মকর্তাদেরই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সংরক্ষণের দায়িত্ব এবং আদালতের নির্দেশনাও তাই, সেখানে আবার কীভাবে সরকার আপিল করে?
“এইজন্যই আমার কাছে প্রশ্নটা এসেছিল এবং এখন তো প্রমাণ হলো যে আসলে সরকারের সংশ্লিষ্ট যাদের দায়িত্ব তারা এটা করেননি। কেউ পিছন থেকে কলকাঠি নেড়ে এটা করেছেন।”
তিনি বলেন, “আমি আপিল বিভাগের শুনানিতে মহাস্থানগড়ের গুরুত্ব এবং এটা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাসহ বিভিন্ন বিষয় ধরব এবং আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবে তা আমাদের সবাইকে মানতে হবে।”
মহাস্থানগড়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরে এই আইনজীবী বলেন, “২০২৩ সালের ১৭ মে মহাস্থানগড় ইউনেসকোর টেন্টেটিভ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এখন প্রত্নতাত্ত্বিক অখণ্ডতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে বিশ্ব ঐতিহ্যের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
"আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই। তবে উন্নয়ন অবশ্যই আদালতের নির্দেশনা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের নীতিমালা মেনে হতে হবে। অন্যথায় কয়েক হাজার বছরের এই ঐতিহ্য স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।"