গেণ্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর: প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি, ২০ টাকায় মিলছে সেবনের ‘নিরাপদ’ জায়গাও
স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদকসেবীদের কাছে এসব ঘর পরিচিত ‘গাপ্পা’ নামে। ঘরগুলোর আশপাশে লাঠি, চাপাতি ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র হাতে পাহারায় থাকে মাদক কারবারিদের লোকজন।
তিন দিন আগে ইশরাক হোসেনের ‘মাদকবিরোধী অভিযানের’ পর এখন আলোচনায় রাজধানীর পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া। সেখানকার একটি এলাকা ঘুণ্টিঘর; যেখানে দিনের বেলায় রেললাইনের দুই পাশে দেদারছে চলছে মাদকের বেচাকেনা।
শুধু তাই নয়; গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবার মত মাদক বিক্রির পাশাপাশি সেখানে সেবনের ব্যবস্থাও রেখেছে কারবারিরা।
টাকা দিলে গেণ্ডারিয়ার এ এলাকায় মিলছে মাদক; ২০ টাকায় সেবনের জায়গা। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত মাদক নিয়ে যাওয়া যায় নির্বিঘ্নেও।
ইশরাক হোসেনের প্রতিমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করা আর ‘অভিযানের’ খবর ঘিরে আলোচনায় গেণ্ডারিয়ার নাম থাকার মধ্যেই সোমবার দুপুর ২টা থেকে বিকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত দয়াগঞ্জ রেলগেট থেকে ঘুণ্টিঘর এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সেখানে ঘুরে ও স্থানীয়দের তথ্য মিলিয়ে দেখা গেছে, রেললাইনের দুই পাশে গড়ে ওঠা ছোট ছোট ঝুপড়িঘরে মাদকভেদে আলাদা টাকায় সেবনের ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদকসেবীদের কাছে এসব ঘর পরিচিত ‘গাপ্পা’ নামে। ঘরগুলোর আশপাশে লাঠি, চাপাতি ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র হাতে পাহারায় থাকে মাদক কারবারিদের লোকজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার ওপরও নজর রাখেন তারা।
সরেজমিন ঘুরে দেখার সময় পাওয়া যায় কয়েকজন মাদকসেবীকে। তাদের দেওয়া তথ্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য হল, এ এলাকায় মাদক বিক্রি ও সেবনের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
এদিন বিকালে দেখা যায়, ঘুণ্টিঘর এলাকায় রেললাইনের পশ্চিম পাশে একটি ফাঁকা জায়গায় ৫০ থেকে ৬০ জনের ভিড়। কেউ ছোট ছোট দলে বসে আছেন, কেউ দাঁড়িয়ে। সেখানে গাঁজার পুরিয়া বিক্রি করতে দেখা গেল কাউকে। কেউ বিক্রি করছেন ‘হেরোইন’। ইয়াবার দাম নিয়ে দর-কষাকষিও চলছিল।
ফাঁকা জায়গার পাশের দেয়াল ঘেঁষে তৈরি অস্থায়ী কাগজের ছাউনিতে মাদক সেবন করছিলেন কয়েকজন। এর কিছুটা দূরে সড়কের দুই প্রান্তে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে পাহারা দিচ্ছিলেন কয়েকজন। তাদের নজর ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলাচলে।
‘২৫০ টাকায় ইয়াবা, ২০ টাকা দিলে সেবনের জায়গা’
ঘুণ্টিঘর এলাকার এক বাসিন্দার সঙ্গে পরিচয় গোপন রেখে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। পরিবহন শ্রমিক ওই ব্যক্তি মাঝেমধ্যে মাদক নিয়ে থাকেন।
তার ভাষ্য, এখানে শুধু মাদক বিক্রি হয় না, সেবনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
“ভাই, এইহানেতো হুদা বেঁচে না। খাওনেরও ব্যবস্থা আছে। এই যে খাপ্পাগুলা দেখতাছেন না? এডিতে বইয়া খাওনও যায়। ২৫০ টেকায় একটা বিচি (ইয়াবা) কিনবেন। যদি খাপ্পায় বইসা খাইতে চান, তইলে প্রতি বিচি ২০ টেকা দিয়া খাইতে পারবেন। এ্যালা যদি আপনে দুইটা বিচি খান, তইলে ৪০ টেকা। আর যদি লইয়া যাইতেগা চান, তইলে মাল লইয়া যাইবেনগা। ওই রেলগেট (দয়াগঞ্জ রেলগেট) পর্যন্ত আপনের কোনো প্যারা নাইকা। পুলিশও ধরবো না।”
তার কথা শেষ হতে না হতেই পাশে দাঁড়ানো এক ব্যক্তি আলোচনায় যোগ দেন। তার দাবি, সেখানে যারা মাদক কেনাবেচা করেন তাদের সশস্ত্র পাহারার কারণে সেখানে পুলিশও বাধার মুখে পড়ে।
“পুলিশে ধরবো কই থাইকা? মাদকব্যবসায়ীরা লাঠি, ছ্যান (এক ধরনের ধারালো অস্ত্র), চাপাতি লইয়া বইয়া থাহে। এডি যদি নাও থাহে, তাইলে রেললাইনের পাথর দিয়া ঢিলাইয়া পুলিশরে ভাগায় দেয়। এই কয়দিন আগেও তিনজন পুলিশরে এইহানে মারতে মারতে কাপড় খুইলা ফালাইছিল।”
মাদক কারবারে নিয়ন্ত্রণে যাদের নাম
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হালনাগাদ একটি তালিকায় মহানগরীর ৫০ থানার ৩৬৩ জন মাদক কারবারির নাম রয়েছে। গত মার্চের দিকে তৈরি করা ওই তালিকায় ঘুণ্টিঘর এলাকার মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে রহিমা নামে এক নারীর নাম পাওয়া গেছে।
তালিকা অনুযায়ী, সেখানকার নামাপাড়া রেললাইন বস্তি এলাকার মাদক কারবার ও বিক্রির স্থানগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন রহিমা। তার স্বামী হযরত স্থানীয়ভাবে পরিচিত অপরাধী দল ‘বেলবাট্টি গ্রুপের’ প্রধান বলে তালিকার তথ্য।
পাশের ডিস্টিলারি রোডের মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন মনিরুল হক রবিন নামে একজন।
তবে এলাকায় তাদের নিয়মিত দেখা যায় না বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে রহিমা ও রবিনের ব্যবহৃত ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
অন্তত চারজন স্থানীয় বাসিন্দা এ দুজনের পাশাপাশি মিনু এবং আরও কয়েকজনের নাম বলেন।
ঘুণ্টিঘর এলাকায় একটি অটোরিকশা গ্যারেজে কাজ করা সাইদুল ইসলাম বলেন, “এলাকাটা নষ্ট কইরা ফেলেছে এরা। রবিন আর মিনু ওগো পোলাপান দিয়া এই এলাকায় মাদকের ব্যবসা করে। ৫ অগাস্টের পরে এই এলাকায় এতো ঝামেলা আছিল না। ঘুণ্টিঘররকে পরে স্পট বানাইছে।
“আমরা এলাকার পোলাপানও কিছু কইতে পারি না। আমাগো ছ্যান লইরা দৌড়ানি দেয়।”
মো. আসমত নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, “রেললাইনের দক্ষিণ পাশেই পুলিশ ফাঁড়ি। হেরা কিছু করতে পারে না। এইডা ভালা কইরা তুইলা ধরবেন।”
ঘুণ্টিঘর ও ডিস্টিলারি রোডের বাইরে গেণ্ডারিয়া এলাকার আরও কয়েকটি স্থানে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে বিভিন্ন ব্যক্তির নাম এসেছে।
আইজি গেট হিসেবে পরিচিত মেন্দিবাড়ী এলাকার কারবারের নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে রানা ওরফে পিচ্চি রানার নাম রয়েছে। ঢালকানগর এলাকার মাদক কারবার ও বিক্রির স্থান নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে সবিজুল ইসলাম ওরফে সজিব ওরফে সাজু এবং গোলাম মোস্তফা ওরফে বিকাশ ওরফে প্রকাশের বিরুদ্ধে। স্বামীবাগ এলাকার কারবারি হিসেবে আমীর হোসেন, পানির ট্যাংকি-মুরগিটোলা এলাকায় ইমরান এবং দয়াগঞ্জ এলাকায় মিলন ওরফে ল্যাংড়া মিলনের নাম এসেছে বিভিন্ন জনের দেওয়া তথ্যে।
অভিযান হয়, কারবারিরা থেকে যায় অধরা
তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে গেণ্ডারিয়া থানার ওসি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ঘুণ্টিঘর এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি রহিমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে কয়েক দিন পর জামিনে বেরিয়ে এসে তিনি আবার একই কাজ শুরু করেন।
এদিকে সোমবার বিকাল ৩টার দিকে ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী যৌথ অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ঢাকা দক্ষিণ বিভাগ ও এসআরবি-৩।
ছদ্মবেশে থাকা দুই ইউনিটের সদস্যরা অভিযান শুরু করলে সেখানে থাকা লোকজন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। অনেকে দেয়াল টপকে সটকে পড়েন। এসময় দুই নারীসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের প্রত্যেককে তিন মাসের কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে জুয়েল, তৌহিদ সাগর, মো. সুমন, আনাল, মো. নাসির, হিরা, মোতালেব মিয়া, আবদুল লতিফ, মো. সোহেল, নবী হোসেন, রুবেল ও আশরাফ উদ্দীনের নাম পাওয়া গেছে। বাকি তিনজনের নাম জানা যায়নি।
অভিযানের সময় দুই নারীর কাছে ইয়াবা ও হেরোইন সেবনের সরঞ্জাম পাওয়া যায়। অন্যদের অধিকাংশের কাছ থেকে গাঁজা ও হেরোইন উদ্ধার করতে দেখা যায়।
অভিযানের সময় স্থানীয় বাসিন্দা মো. দোলন হোসেন বলেন, “ভাই, এইহানে যাগো ধরছে তারা হইলো দিন হাজিরা কামলা। এরা দিনে হাজার-পনেরশ টাকায় মাল (মাদক) বেঁচে। কিন্তু যারা আসল অপরাধী, হেগো কোন দিন ধরতে দেহি না। এই যে এগো ধরছে, সর্বোচ্চ এক মাস পরে জামিনে বাইরাইয়া আবার বেচবো।”
অভিযানে উপস্থিত ডিএনসির ঢাকা দক্ষিণ বিভাগের উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এরা সবাই ভাসমান। এরা এখানে আসে, তারপর আবার চলে। আমরা অভিযান পরিচালনা করলে এরা চলে যায়। আবার আমরা যখন চলে যাই, তখন ওরা আবার আসে। এজন্য এদের নির্মূল করা যায় না। এখানে নিয়মিত কাউকে রাখতে পারলে তাইলে কোনো সুফল পাওয়া যেত।”
ধরতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা
মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান এলাকার অনেক বাসিন্দা। তাদের অভিযোগ, কারবারিদের লোকজন অস্ত্র নিয়ে পাহারা দেয়। কেউ বাধা দিলে তাদেরকেও হুমকি দেওয়া হয়।
অটোরিকশা গ্যারেজের কর্মী সাইদুল বলেন, “ভাই, এরা (মাদক কারবারি ও বিক্রেতারা) খুব ডেঞ্জারাস। এর আগে আমার সামনেই অন্তত তিনবার পুলিশরে পিডাইতে দেখছি। মারতে মারতে অবস্থা খারাপ কইরা দিছে ভাই।”
পুলিশের ওপর হামলার বিষয়ে গেণ্ডারিয়া থানার ওসি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, গত ডিসেম্বরে একবার পুলিশের ওপর হামলা হয়েছিল। কারবারিদের ছোড়া পাথরের আঘাতে দুই পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন।
অভিযান শেষ, ফিরল মাদকসেবীরা
বিকাল ৫টার দিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা ঘোষণার পর ডিএনসি ও এসআরবির সদস্যরা এলাকা ছাড়তে শুরু করেন। অভিযানকারী দল ঘুণ্টিঘর থেকে দয়াগঞ্জ রেলগেটের দিকে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার সেখানে মাদকসেবীদের ফিরতে দেখা যায়। রেললাইনের দুই পাশে বসে তাদের গাঁজা বানিয়ে টানতে দেখা যায়।
স্থানীয় তাসলিমা নামে এক নারী বললেন, “ওই দেখেন। পুলিশ যায়া সারতে পারে নাই, আবার আইসা বসছে খোরেরা। একটু পরে দেখবেন, যারা বেচে হেরাও আইসা ডাকাডাকি শুরু কইরা দিব।”
আরেক নারী বলেন, “আমরা আমাগো বাচ্চাকাচ্চার ভবিষ্যৎ নিয়া খুব চিন্তায় আছি। এহানে উঠতি মাইরাও এডি খায়। এই এলাকা ভালা করতে চাইলে টানা কয়েক মাস অভিযান চালাইতে হইবো আর স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প করতে হইবো।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, কারবারিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার, নিয়মিত নজরদারি এবং স্থায়ী পুলিশি উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ঘুণ্টিঘর এলাকাতেই এর আগে অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ওই ঘটনার পর তিনি পদ হারান।
গেণ্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর: দেয়ালের একপাশে অভিযান, অন্যপাশে চলছিল মাদক সেবন
