এক/এগারোর সময় ‘চাঁদাবাজি’, জেনারেল মাসুদ উদ্দিন বললেন ‘ফালতু কথা’
দ্বিতীয় দফায় তাকে ছয় দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।
‘সিন্ডিকেট করে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানব পাচারের’ অভিযোগে দুদকের করা মামলায় দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষ যে বক্তব্য দিয়েছে, তা উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এক/এগারোর আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
সেনা নিয়ন্ত্রিত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার, চাঁদাবাজি, অর্থ আত্মসাতের’ অভিযোগ তোলা হলে এগুলোকে ‘ফালতু কথা’ বলে নাকচ করেন দেন তিনি।
সেনা নিয়ন্ত্রিত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আলোচিত সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে রোববার ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা আবার তার সাত দিনের রিমান্ড চান।
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “এ মামলার ১২ নম্বর আসামি এস এম রফিক গত বছরের ১ ডিসেম্বর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, নূর আলী, সাবেক অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, নিজাম হাজারী, হাসিনার পিএস আলাউদ্দিন নাসিম, গোলাম মোস্তফা অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতন।
“শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানাও সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগী এবং সম্পৃক্ত। মালয়েশিয়ায় প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা ছিলো সরকারের। কিন্তু তখনকার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহম্মেদ ও সাবেকক সচিব, মাসুদ উদ্দিন সিদ্দিকসহ কয়েকজন মিলে সিন্ডিকেট করলেন।”
সরকারি এই কৌঁসুলি অভিযোগ করেন, সকলে একত্রিত হয়ে ‘রেহানা ও জায়কে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ব্যবহার করে’ ২৪ হাজার কোটি টাকা নিয়েছেন।
এসময় আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “ফালতু কথা।”
ওমর ফারুক বলেন, “মালয়েশিয়া পাঠাতে কর্মীদের কাছ থেকে ৭৮ হাজার টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও তারা সিন্ডিকেট করে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা নিয়ে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। যার কারণে মালয়েশিয়া সরকার লোক নেওয়া বন্ধ করে দিল। এটা কিন্তু আমাদের জাতীয় স্বার্থ। লোক পাঠাতে পারলে কোটি কোটি টাকা আসতো।”
মানব পাচার ও অর্থ আত্মসাতের মামলায় গেল সোমবার গভীর রাতে ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন এ মামলায় তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়।
২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল মাসুদ এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর পদোন্নতি পেয়ে লেফটেনেন্ট জেনারেল হন। সে সময় আলোচিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক ছিলেন তিনি।
এক/এগারোর প্রসঙ্গ টেনে সরকারি কৌঁসুলি ওমর ফারুক বলেন, “ওই সময় তিনি টাস্কফোর্সের প্রধান ছিলেন। ব্যবসায়ীদের ডেকে এনে চাঁদা দাবি করতেন। রাজনৈতিক ব্যক্তি, ব্যবসায়ীদের জেলে ঢুকাতেন।”
এসময়ও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “ফালতু কথা।”
আসামিপক্ষের আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম সজীব রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন।
তিনি বলেন, “এই মামলায় আদালত সন্তুষ্ট হয়ে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন। মামলার এজাহারে আসামির নাম ছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। পাঁচ দিনের রিমান্ডে কী তথ্য উপাত্ত পাওয়া গেছে, সেটা আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি।”
আইনজীবী সজবী বলেন, “এই মামলায় প্রথমে চূড়ান্ত প্রতিবেদন এসেছিল। পরে মামলাটি ফের তদন্তে পাঠানো হয়৷ এই পর্যায়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডের আবেদনটি আইন অনুযায়ী হয়নি। মূলত তাকে অপমান, অপদস্ত করতে মামলায় নাম আনা হয়েছে। তার ৭২ বছর বয়স, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। রিমান্ডের অগ্রগতি নেই, পূর্বে চূড়ান্ত প্রতিবেদন এসেছিল এবং স্বাস্থ্যগত বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তার রিমান্ড বাতিলের প্রার্থনা করছি।”
চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, “চূড়ান্ত প্রতিবেদনটা ছিল ম্যানেজ গেম। ম্যানেজ গেম করে এটা দেওয়া হয়েছিল।”
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত থেকে মাসুদ উদ্দিনকে ফের ছয় দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেয়।
২০০৭-০৮ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির এমডি। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পার্টির টিকেটে ফেনী-৩ আসন থেকে এমপি হয়েছিলেন।
ওই কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও মানব পাচারের অভিযোগেই ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পল্টন থানায় এ মামলা দায়ের করেন আফিয়া ওভারসিজের প্রোপাইটর আলতাব খান।
আওয়ামী লীগ আমলের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন, আহমেদ ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর ও সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদ এবং ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর মো. রুহুল আমীন স্বপনসহ ১০৩ জন এ মামলার আসামি।
মামলার এজাহারে বাদী আলতাব খান অভিযোগ করেছেন, “জনশক্তি রপ্তানিতে দুই হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্ট থাকলেও মামলার আসামিরা সিন্ডিকেট করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করেছেন। মামলার আসামি সচিব আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন সরকারি চাকরিরত অবস্থায় নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনে তার ছেলেকে সিন্ডিকেট চক্রের সদস্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আর সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ তার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের ছেলেকে বিধিবর্হিভূতভাবে ‘প্রবাসী’ নামে একটি অ্যাপ চালু করার অনুমোদন দিয়ে ওই চক্রকে সহযোগিতা করেছেন।”
বাদীর অভিযোগ, মামলার আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ‘তার সরলতার সুযোগ নিয়ে’ ভয়ভীতি ও বলপ্রয়োগ করে মানবপাচারের উদ্দেশ্যে তার কাছ থেকে জোর করে অতিরিক্ত চাঁদা হিসেবে মাথাপিছু দেড় লাখ টাকা হারে ৮৪১ জনের কাছ থেকে ১২ কোটি ৫৬ লাখ এক হাজার টাকা আদায় করেছে। ওই চক্র অন্যান্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে ‘আত্মসাৎ’ করেছে।
আরও পড়ুন:
